মানব সভ্যতার সূচনা থেকেই সংস্কৃতি ও সমাজ গঠনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখে আসছে ধর্ম। তবে বিশ্বের ধর্মীয় মানচিত্র কখনোই এক জায়গায় স্থির থাকে না। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, স্থানান্তর এবং মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস পরিবর্তনের কারণে এই মানচিত্রে প্রতিনিয়ত বড় ধরনের বদল ঘটছে।
ধর্মীয় জনমিতিতে অভূতপূর্ব রূপান্তর
আগামী কয়েক দশকে বিশ্বের ধর্মীয় জনমিতিতে এক অভূতপূর্ব রূপান্তর ঘটতে যাচ্ছে। কিছু ধর্মের জনসংখ্যা যেখানে উল্কার গতিতে বাড়বে, সেখানে কিছু ধর্ম স্থবির হয়ে পড়বে কিংবা অনুসারীর সংখ্যা হ্রাস পাবে। এই পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি হলো জনমিতি। জন্ম হার, বয়সের বণ্টন এবং ভৌগোলিক ঘনত্বের ওপর ভিত্তি করেই নির্ধারিত হচ্ছে বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীর উত্থান-পতন।
বর্তমানে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যা যেখানে ৮২০ কোটি (৮.২ বিলিয়ন), ২০৫০ সালের মধ্যে তা প্রায় ১৪ শতাংশ বেড়ে ৯৩০ কোটিতে (৯.৩ বিলিয়ন) পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই বর্ধিত জনসংখ্যার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বজুড়ে ধর্মীয় সম্প্রদায়ের গঠনেও আসবে এক বিশাল পরিবর্তন।
শীর্ষেই থাকছে খ্রিষ্টধর্ম
ইসলাম ধর্মের ব্যাপক অগ্রগতি সত্ত্বেও ২০৫০ সাল নাগাদ খ্রিষ্টধর্মই বিশ্বের বৃহত্তম ধর্ম হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রাখবে। তখন বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩১ শতাংশ হবে খ্রিষ্টান, যা মুসলিম জনসংখ্যার চেয়ে সামান্য বেশি। তবে খ্রিষ্টধর্মের এই বৃদ্ধি মূলত দেখা যাবে সাব-সাহারান আফ্রিকায়। বিপরীতে ইউরোপের মতো ঐতিহ্যবাহী খ্রিষ্টানপ্রধান অঞ্চলে এই ধর্মের অনুসারীর সংখ্যা ক্রমাগত কমতে থাকবে।
ইসলামের উল্কাগতিতে উত্থান
আগামী ২০২৫ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে মুসলিম জনসংখ্যা এক অবিশ্বাস্য গতিতে বৃদ্ধি পাবে, যার হার প্রায় ৪১ শতাংশ। উচ্চ জন্ম হার এবং তরুণ জনগোষ্ঠীর আধিক্যের কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্ব জনসংখ্যার ৩০ শতাংশই হবে মুসলিম। এর ফলে তারা খ্রিষ্টানদের প্রায় কাছাকাছি অবস্থানে চলে আসবে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০৫০ সালের পর এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৭০ সাল নাগাদ খ্রিষ্টান ও মুসলিম জনসংখ্যা সমান পর্যায়ে (উভয় ধর্মই বৈশ্বিক জনসংখ্যার ৩২.৩ শতাংশ) চলে আসবে। এমনকি ২১০০ সাল নাগাদ মুসলিমরা বিশ্ব জনসংখ্যার ৩৪.৯ শতাংশ নিয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করবে এবং খ্রিষ্টানরা ৩৩.৮ শতাংশ নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে চলে যাবে।
ধর্মহীন বা নাস্তিকদের সংখ্যা কমবে
পাশ্চাত্যের কিছু দেশে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের প্রতি উদাসীনতা বা নাস্তিকতা বাড়লেও, বিশ্বজুড়ে নাস্তিক, অজ্ঞেয়বাদী এবং কোনও ধর্মে বিশ্বাসী নন এমন মানুষের সামগ্রিক অনুপাত কমে যাবে। ২০২৫ সালে বিশ্ব জনসংখ্যায় ধর্মহীনদের অনুপাত যেখানে ১৬ শতাংশ, ২০৫০ সালে তা কমে ১৩ শতাংশে দাঁড়াবে। অবশ্য সংখ্যার বিচারে তাদের মোট জনসংখ্যা কিছুটা বাড়তে পারে।
বৌদ্ধ ও হিন্দুধর্মের ভবিষ্যৎ
অন্যান্য প্রধান ধর্মের মতো বৌদ্ধধর্মে কোনও প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। চীন, জাপান ও থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলোতে কম জন্মহার এবং প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে বিশ্বজুড়ে বৌদ্ধদের জনসংখ্যা ২০২৫ সালের মতোই প্রায় অপরিবর্তিত থাকবে।
অন্যদিকে হিন্দুধর্মের অনুসারীরা বৈশ্বিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রবণতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে মাঝারি ধরনের প্রবৃদ্ধি বজায় রাখবে। ২০১০ সালে হিন্দু জনসংখ্যা যেখানে ১০০ কোটির কিছু বেশি ছিল, ২০৫০ সালের মধ্যে তা ৩৪ শতাংশ বেড়ে প্রায় ১৪০ কোটিতে পৌঁছাবে।
ইহুদি, লোকজ ও অন্যান্য ছোট ধর্ম
বিশ্বের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় গোষ্ঠী হলেও ইহুদিদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতি হবে বেশ ধীর। মাত্র ১৬ শতাংশ বৃদ্ধির মাধ্যমে ২০৫০ সাল নাগাদ ইহুদি জনসংখ্যা ১ কোটি ৬১ লাখে পৌঁছাবে।
আফ্রিকান ঐতিহ্যবাহী ধর্ম, চীনা লোকজ বিশ্বাস এবং আদিবাসীদের নিজস্ব আধ্যাত্মিক ধারাগুলোর অনুসারী ২০৫০ সালের মধ্যে ১১ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৪৫ কোটিতে পৌঁছাবে। তবে সামগ্রিক বিশ্ব জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায় বৈশ্বিক অনুপাতে তাদের উপস্থিতি কমে যাবে। একইভাবে শিখ, জৈন ও তাও ধর্মের অনুসারীদের সংখ্যা ২০১০ সালের ৫ কোটি ৮০ লাখ থেকে বেড়ে ২০৫০ সালে ৬ কোটি ১০ লাখের কিছু বেশি হবে, যা বৈশ্বিক শতকরা হারে হ্রাসের ইঙ্গিত দেয়।
ইউরোপের পরিবর্তিত চেহারা
২০৫০ সালের মধ্যে ইউরোপের মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশ হবে মুসলিম, যা ২০২৫ সালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। একই সময়ে সেখানে খ্রিষ্টানদের অনুপাত কমবে এবং ধর্মহীনতার উত্থান অব্যাহত থাকবে। ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডসের মতো ঐতিহাসিকভাবে খ্রিষ্টানপ্রধান দেশগুলোতে ২০৫০ সালের মধ্যে ধর্মহীন মানুষেরাই সংখ্যাগরিষ্ঠতায় রূপ নেবে। যুক্তরাজ্যে খ্রিষ্টানদের সংখ্যা ৫০ শতাংশের নিচে নেমে আসবে, যার ফলে ঐতিহ্যবাহী এই খ্রিষ্টান দেশটি ধর্মীয় বৈচিত্র্যময় অথবা ধর্মনিরপেক্ষ এক সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রে পরিণত হবে।
ভারতের দ্বিমুখী পরিচয়
ভৌগোলিক ও ধর্মীয় দিক থেকে ভারত তার হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় রাখবে ঠিকই, তবে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে দেশটি ইন্দোনেশিয়াকে ছাড়িয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মুসলিম জনগোষ্ঠীর দেশে পরিণত হবে। হিন্দুধর্ম প্রধান থাকলেও ক্রমবর্ধমান মুসলিম উপস্থিতি আগামী দশকগুলোতে ভারতের ধর্মীয় গতিশীলতাকে নতুন রূপ দেবে।
যুক্তরাষ্ট্রে ধর্মীয় সমীকরণ বদল
২০১০ সালেও আমেরিকার তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি মানুষ খ্রিষ্টান হিসেবে পরিচয় দিতেন। ২০৫০ সালের মধ্যে তা কমে দুই-তৃতীয়াংশে নেমে আসবে। খ্রিষ্টধর্ম প্রধান থাকলেও সেখানে ধর্মনিরপেক্ষতা এবং খ্রিষ্টান বহির্ভূত অন্যান্য ধর্মের উল্লেখযোগ্য উত্থান ঘটবে। ২০৫০ সাল নাগাদ মুসলিমরা ইহুদিদের পেছনে ফেলে আমেরিকার দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় গোষ্ঠী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। উচ্চ জন্মহার এবং অভিবাসনের কারণেই মূলত যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামের এই দ্রুত বিকাশ ঘটছে।
আফ্রিকা হবে ধর্মের মূল যুদ্ধক্ষেত্র
২০৫০ সাল নাগাদ সাব-সাহারান আফ্রিকা হয়ে উঠবে বৈশ্বিক খ্রিষ্টধর্মের মূল কেন্দ্রবিন্দু। তখন বিশ্বের প্রতি ১০ জন খ্রিষ্টানের মধ্যে ৪ জনই এই অঞ্চলে বসবাস করবেন। একই সঙ্গে এই অঞ্চলে ইসলামের প্রবৃদ্ধিও হবে সবচেয়ে শক্তিশালী। ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্ব জনসংখ্যার ১৮ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০ শতাংশ মানুষ এই সাব-সাহারান আফ্রিকায় বসবাস করবে, যা এই মহাদেশটিকে ধর্মের মূল প্রচার ও প্রসারের একটি বড় ক্ষেত্রে পরিণত করবে।
নাইজেরিয়া ২০৫০ সালের মধ্যে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এরপরও যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রাজিলের পর নাইজেরিয়াতেই থাকবে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম খ্রিষ্টান জনসংখ্যা। এছাড়া মেসিডোনিয়াও ২০৫০ সালের মধ্যে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে পরিণত হবে এবং সব মিলিয়ে বিশ্বের ৫১টি দেশে মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ (৫০ শতাংশের বেশি) হবে।
অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকা যথারীতি মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবেই থাকবে এবং সেখানে ধর্মীয় বৈচিত্র্য থাকবে খুবই কম। তবে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোতে খ্রিষ্টান অভিবাসনের কারণে ওই অঞ্চল থেকে খ্রিষ্টানদের চলে যাওয়ার ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে যাবে এবং তাদের জনসংখ্যা ৩ শতাংশের সামান্য ওপরে স্থিতিশীল থাকবে।
সূত্র: পিউ রিসার্চ সেন্টার, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ও এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা



