মার্কিন মুলুকে গণছাঁটাই: ৬০ দিনে চাকরি না পেলে দেশ ছাড়তে হবে ভারতীয়দের
মার্কিন মুলুকে গণছাঁটাই: ৬০ দিনে চাকরি না পেলে দেশ ছাড়তে হবে

বছরের পর বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করে আমেরিকার নামী-দামী সব প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ভিত গড়ে তুলেছিলেন তারা। কোডিং, টিম লিডিং, গাড়ি-বাড়ি কেনা, সন্তানদের নিয়ে স্থায়ীভাবে থিতু হওয়া—সব মিলিয়ে এক সুনিশ্চিত জীবনের স্বপ্ন বুনেছিলেন হাজারো ভারতীয় প্রকৌশলী ও সফটওয়্যার ডেভেলপার। কিন্তু আচমকা আসা একটি মাত্র ইমেইল এখন ওলটপালট করে দিচ্ছে সবকিছু।

গণছাঁটাইয়ের নতুন দফা

মার্কিন সিলিকন ভ্যালিতে শুরু হওয়া নতুন দফার গণছাঁটাই শুধু চাকরি কেড়ে নিচ্ছে না, বরং একটি পুরনো আতঙ্ককে নতুন করে তাজা করে তুলেছে। চাকরি হারানোর অর্থ এখন নিজের তল্পিতল্পা গুটিয়ে আমেরিকা ছেড়ে চলে যাওয়া। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিলিকন ভ্যালির টেক জায়ান্টরা আবারও বিপুল অংকে খরচ কমানোর পথে হাঁটছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির দিকে পুরো মনোযোগ ও অর্থ ঢালতে গিয়ে মেটা সম্প্রতি প্রায় ৮ হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছে। আমাজনও দফায় দফায় কর্মী সংখ্যা কমিয়ে আনছে। পিছিয়ে নেই পেশাদারদের যোগাযোগের মাধ্যম লিঙ্কডইনও।

৬০ দিনের কাউন্টডাউন

যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত অধিকাংশ ভারতীয় আইটি পেশাজীবীই 'এইচ-১বি' ভিসার ওপর নির্ভরশীল, যা সরাসরি তাদের নিয়োগকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। চাকরি চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের ওপর নেমে আসে কঠোর বাস্তবতা। মার্কিন অভিবাসন আইন অনুযায়ী, চাকরি হারানোর পর নতুন স্পন্সর বা নিয়োগকর্তা খুঁজে পেতে তারা সময় পান মাত্র ৬০ দিন। এই দুই মাসের মধ্যে নতুন কোনো প্রতিষ্ঠান যদি তাদের ভিসার দায়িত্ব না নেয়, তবে তাদের আমেরিকা ছাড়তে হবে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

হঠাৎ ছাঁটাইয়ের পর এই ৬০ দিনের গ্রেস পিরিয়ড বা বাড়তি সময়টুকু দেওয়া হয়েছিল কিছুটা হাফ ছাড়ার সুযোগ হিসেবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। পুরো প্রযুক্তিখাতে যেখানে নিয়োগ প্রায় থমকে গেছে, সেখানে এই ৬০ দিন যেন চোখের পলকে ফুরিয়ে যায়। আর এই ৬০ দিনের হিসাব শুরু হয় শেষ কর্মদিবস থেকে, ব্যাংক অ্যাকাউন্টে শেষ বেতন ঢোকার দিন থেকে নয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অসম্ভব লড়াই

ঋণের কিস্তি, বাড়িভাড়া, সন্তানদের স্কুলের পড়াশোনা আর চিকিৎসাবিমার দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়ে এ অল্প সময়ে নতুন চাকরি জোগাড় করা একপ্রকার অসম্ভব লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই নিরুপায় হয়ে সাময়িকভাবে ভিজিটর ভিসা (B-1/B-2)-তে পরিবর্তনের জন্য আবেদন করছেন, যাতে আরও কয়েকটা মাস অন্তত আমেরিকায় থেকে চাকরির চেষ্টা চালানো যায়। আইনগতভাবে এ সুযোগ থাকলেও, সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন অভিবাসন কর্তৃপক্ষ এই আবেদনগুলোকে কঠোর নজরদারিতে রাখছে। অভিবাসন আইনজীবীরা জানাচ্ছেন, কাগজের খুঁটিনাটি যাচাই ও নানামুখী প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে আবেদনকারীদের। ফলে এই বিকল্প পথটুকুও এখন বড় ভরসা দিতে পারছে না।

বিশ্বজুড়ে প্রভাব

তথ্য বলছে, চলতি বছরেই বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি খাতের ১ লাখ ১০ হাজারেরও বেশি কর্মী চাকরি হারিয়েছেন, যার একটি বড় অংশই ভারতীয়। বছরের পর বছর গ্রিন কার্ডের ব্যাকলগে আটকে থাকা এ পেশাজীবীদের অনেকেই এখন বিকল্প ভাবছেন। একটি সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, চাকরি হারালে প্রায় অর্ধেক ভারতীয় পেশাজীবীই এখন নিজের দেশ ভারতে ফিরে যাওয়ার কথা গুরুত্ব দিয়ে ভাবছেন। বাকিদের চোখ এখন কানাডা কিংবা ইউরোপের দিকে।

মানসিক ও সামাজিক বিপর্যয়

মেটার মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ১৬ সপ্তাহের মূল বেতনসহ আকর্ষণীয় সেভারেন্স প্যাকেজ দিলেও, মানসিক ও সামাজিক যে বিপর্যয় তৈরি হয়েছে, তা টাকা দিয়ে ঘোচানো সম্ভব নয়। প্রযুক্তি দুনিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জয়জয়কার সাধারণ ইঞ্জিনিয়ারিং ও প্রথাগত আইটি পদগুলোকে চিরতরে সংকুচিত করে ফেলছে কিনা—সেই আতঙ্ক এখন সবার মনে। ভারতীয় কর্মীদের জন্য এখন লড়াইটা শুধু নতুন চাকরি খোঁজার নয়, চোখের সামনে তিল তিল করে গড়ে তোলা পুরো জীবনটাকে ভেঙে চুরমার হওয়া থেকে বাঁচানোর।