ইলন মাস্কের শেয়ার করা চীনের রোবট নির্মিত বিশ্বের বৃহত্তম রেলস্টেশনের গল্প
ইলন মাস্কের শেয়ার করা চীনের রোবট নির্মিত বিশ্বের বৃহত্তম রেলস্টেশন

সদ্য সমাপ্ত সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উচ্চ-প্রোফাইল সফরসঙ্গী দলের অংশ হিসেবে চীন সফর করেন ইলন মাস্ক। সফরকালে তিনি তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ চীনের চংকিং ইস্ট রেলওয়ে স্টেশন নির্মাণের একটি ভিডিও শেয়ার করেন, যা বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম রেলওয়ে স্টেশন।

ইলন মাস্কের ভিডিও শেয়ারিং নিয়ে কৌতূহল

পাবলিক ট্রান্সপোর্ট বা গণপরিবহন নিয়ে অতীতে সবসময়ই সংশয় প্রকাশ করে এসেছেন ইলন মাস্ক। ফলে এই ভিডিওটি শেয়ার করার পর তিনি নিজে কিছু না লিখলেও, মাস্ক কেন এটি পোস্ট করলেন তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে তৈরি হয়েছে ব্যাপক কৌতূহল। তবে এই কৌতূহলের চেয়েও বেশি আকর্ষণীয় হলো চংকিং ইস্ট রেলওয়ে স্টেশনের ভেতরের আসল গল্প। আর তা হলো মানুষের পাশাপাশি এক দল রোবট বাহিনী ব্যবহার করে মাত্র ৩৮ মাসে এই বিশাল স্টেশনটি নির্মাণ করেছে চীন।

চংকিং ইস্ট রেলওয়ে স্টেশন: বিশ্বের বৃহত্তম রেলস্টেশন

চংকিং ইস্ট রেলওয়ে স্টেশনটি মূলত একটি বিশাল বহুমুখী ট্রানজিট কমপ্লেক্স। মেঝের আয়তনের (ফ্লোর এরিয়া) দিক থেকে এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় রেলওয়ে স্টেশন, যা ২০২৫ সালের মে মাসে সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

চংকিং শহরের পটভূমি

দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের মূল ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে অবস্থিত এই চংকিং শহরটি জনসংখ্যা এবং প্রশাসনিক এলাকা উভয় দিক থেকেই দেশটির বৃহত্তম শহর। চংকিং আজ চীনের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি। ১৯৬০-এর দশকে মাও সেতুং-এর ‘থার্ড ফ্রন্ট ক্যাম্পেইন’-এর অধীনে এই শহরের নাটকীয় রূপান্তর শুরু হয়। এটি ছিল চীনের অবহেলিত অভ্যন্তরীণ অঞ্চলগুলোকে দ্রুত শিল্পায়নের লক্ষ্যে একটি বিশাল জাতীয় প্রচেষ্টা। এর ফলে শিল্পকারখানাগুলো প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূল থেকে পশ্চিম দিকে দেশের অভ্যন্তরে ছড়িয়ে পড়ে। আজ চংকিং শহর এবং তার এই নতুন স্টেশনটি চীনের অবিশ্বাস্য প্রকৌশল দক্ষতা এবং বিশাল অর্থনৈতিক শক্তির এক অনন্য নিদর্শন। এটি সেই শহর, যেখানে বহুতল আবাসিক অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের ভেতর দিয়ে মেট্রোরেল চলাচল করতে দেখা যায়।

নির্মাণের সময় ও আকার

যেখানে বিশ্বের অনেক দেশ বড় বড় প্রকল্প শেষ করতে কয়েক দশক ধরে লড়াই করে, সেখানে চীন ১.২২ মিলিয়ন বর্গমিটারের এই বিশাল স্টেশনটি তৈরি করেছে মাত্র ৩৮ মাসে। চংকিং-এর দ্রুত বর্ধনশীল যোগাযোগ চাহিদা মেটাতে এবং উত্তর স্টেশনের ওপর চাপ কমাতে এই নতুন স্টেশনটি তৈরি করা হয়েছে। ১.২২ মিলিয়ন বর্গমিটার আয়তনের এই স্টেশনে রয়েছে ১৫টি প্ল্যাটফর্ম এবং ২৯টি ট্র্যাক, যা তিনটি রেল ইয়ার্ডে বিভক্ত। পিক আওয়ারে এটি প্রতি ঘণ্টায় ১৬,০০০ যাত্রী পরিচালনা করতে সক্ষম। ৮ তলা পর্যন্ত বিস্তৃত এই বহুতল কমপ্লেক্সে হাই-স্পিড রেল, সাধারণ রেল, মনোরেল, বাস ও ট্যাক্সির সমন্বিত সুবিধা রয়েছে।

রোবট বিপ্লব: নির্মাণের মূল চাবিকাঠি

চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিনহুয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালের মে মাসে নকশা চূড়ান্ত করার পর ২০২৫ সালের মে মাসের মধ্যে মাত্র ৩৮ মাসে এই প্রকল্পের সমাপ্তি সম্ভব হয়েছে একটি ‘রোবট বিপ্লব’-এর কারণে। গ্রীষ্মকালে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি চরম তাপমাত্রার মধ্যে রুক্ষ পাহাড়ি ভূখণ্ডে এই প্রকল্পটি পুরোপুরি রোবট বাহিনীর ওপর নির্ভর করে পরিচালিত হয়েছে।

নির্মাণে ব্যবহৃত রোবট প্রযুক্তি

এই নির্মাণকাজে লেজার-গাইডেড ফোর-হুইল স্ক্রিড রোবট (যাতে লিডার, এআই এবং ফাইভ-জি প্রযুক্তি ছিল) মানুষের চেয়ে তিন গুণ দ্রুত এবং মিলিমিটার নিখুঁতভাবে কংক্রিট লেভেলিংয়ের কাজ করেছে, যা শ্রমিকের খরচ কমিয়েছে ৪০ শতাংশ। এছাড়া ৮০০ কেজি ওজনের কাঁচের প্যানেলগুলো অত্যন্ত নিরাপদে এবং নিখুঁতভাবে স্থাপন করেছে গ্লাস ইনস্টলেশন রোবট, যা সাধারণের চেয়ে তিন গুণ দ্রুত এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি ৯০% কমিয়ে এনেছে। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল অমনিডাইরেকশনাল ওয়েল্ডিং রোবট এবং ২৪ ঘণ্টা টহল দেওয়া পাহারাদার রোবট।

রোবট ব্যবহারের ফলাফল

চায়না রেলওয়ে ব্যুরোর কর্মকর্তারা সিনহুয়াকে জানিয়েছেন, রোবোটিক্স ব্যবহারের ফলে শ্রমিকের খরচ প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছে, কাজের গড় দক্ষতা বেড়েছে তিন গুণ এবং নিরাপত্তা জনিত দুর্ঘটনা কমেছে ৯০ শতাংশ।

হাই-স্পিড রেল নেটওয়ার্কে সংযোগ

এই স্টেশনটি চীনের বিশাল হাই-স্পিড রেল নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে দক্ষিণ-পশ্চিম চীনকে দেশের ১৪টি প্রধান শহরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। চংকিং থেকে এখন মাত্র ১ ঘণ্টায় চেংদু, ২-৩ ঘণ্টায় ঝাংজিয়াজি এবং মাত্র ৬ ঘণ্টায় বেইজিং, সাংহাই বা গুয়াংঝুতে পৌঁছানো সম্ভব। সম্ভবত এই অভাবনীয় গতির কারণেই ইলন মাস্ক ভিডিওটি শেয়ার করতে বাধ্য হয়েছেন। কারণ চংকিং ইস্ট স্টেশন কেবল রোবটের ব্যবহার নয়, বরং শিল্পক্ষেত্রের যেকোনও বড় উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে চীনের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতারই বহিঃপ্রকাশ।

সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে