হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কৌশল: ডেটা কেবলে ফি আরোপের হুমকি
হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কৌশল: ডেটা কেবলে ফি আরোপের হুমকি

যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি ও তার সীমাবদ্ধতা

বিশ্বের যেকোনো স্থানে সামরিক হামলা চালানো, ক্ষতিকর শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা, এবং মিত্রদের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নিজ সীমার বাইরেও প্রভাব বিস্তার করা—এসব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে রয়েছে বিশাল ক্ষমতা। শুধু রাষ্ট্রীয় পর্যায়েই নয়, বেসরকারি কোম্পানি, বিদেশি সরকার এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য নেটওয়ার্ককেও কাজে লাগিয়ে তারা প্রভাব বিস্তার করতে পারে। এমন ক্ষমতার সমাহার খুব কম দেশেরই রয়েছে। তবে এই শক্তি ধরে রাখা সহজ নয়, কারণ এটি একটি নির্দিষ্ট বৈশ্বিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। সামরিক শক্তি প্রয়োগের অর্থ রক্তপাত, বিপুল অর্থ ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা হ্রাস। শুল্ক ও আর্থিক নিষেধাজ্ঞা দিলে অন্য দেশগুলো বিকল্প বাণিজ্য ও লেনদেনের পথ খুঁজতে শুরু করে। অন্যদিকে মিত্রদের সঙ্গে জোট সবসময় মসৃণ থাকে না; দায়িত্ব ভাগাভাগি নিয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়। তাই যুক্তরাষ্ট্র ইচ্ছা করলে ইরানের ওপর আরও চাপ বাড়াতে পারে, কিন্তু এতে সেই বৈশ্বিক ব্যবস্থাই দুর্বল হতে পারে, যার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা টিকে আছে।

ইরানের ভিন্ন কৌশল

ইরানের অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি সীমিত, মিত্রও কম। তবে তাদের ভৌগোলিক অবস্থান এমন যে তারা অন্যদের ওপর খরচের বোঝা চাপিয়ে নিজে লাভবান হতে পারে। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর বা আইআরজিসি আগে থেকেই হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া জাহাজগুলোর কাছ থেকে টোল আদায়ের চেষ্টা করছে, যাতে এই পথ আয়ের উৎস হয়ে ওঠে। বর্তমানে ইরানের কর্মকর্তারা ও রাষ্ট্রঘনিষ্ঠ গণমাধ্যম একই অঞ্চলের সমুদ্রতলের ডেটা কেবল বা সাবমেরিন কেবলগুলোর ওপরও ফি বসানোর কথা বলছে। সাবমেরিন কেবলে ফি বসানোর বিষয়টি পুরোপুরি বাস্তবে রূপ নেবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়, তবে এটি ইরানের পরিকল্পনা সম্পর্কে ধারণা দেয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রযুক্তি খাতের দুর্বলতা

এটি শুধু ডেটার প্রবাহ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি নয়, বরং প্রযুক্তি খাতের একটি বড় দুর্বল জায়গায় আঘাত। অ্যামাজন, গুগল, মেটা, মাইক্রোসফট—এসব বড় মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানি রাষ্ট্রের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। তাদের ক্লাউড ও ডেটা সেন্টার সম্পূর্ণরূপে সাবমেরিন কেবল সংযোগের ওপর নির্ভরশীল। ইরান এখন ভূগোলকে শুধু একটি সংকীর্ণ পথ হিসেবে নয়, বরং আয়ের উৎস হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে। তাদের ভৌগোলিক অবস্থান ব্যবহার করে তেলবাহী জাহাজকে যেমন চাপে ফেলা যায়, তেমনি এখন কেবলের মালিক, ক্লাউড সেবাদাতা এবং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকেও চাপে ফেলতে চায় তারা।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সাবমেরিন কেবলের গুরুত্ব

সাবমেরিন কেবলগুলোর মানচিত্র দেখলে বিষয়টির গুরুত্ব বোঝা যায়। ইরানের কাছাকাছি থাকা ফ্যালকন, গালফ ব্রিজ ইন্টারন্যাশনাল-মধ্যপ্রাচ্য-উত্তর আফ্রিকা, কুয়েত-ইরান ও ইউএই-ইরান কেবলগুলো পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালি দিয়ে গেছে। ফলে এই ডিজিটাল অবকাঠামো এখন সেই একই উত্তেজনাপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত, যেখানে জাহাজ চলাচল ও নৌ টহল চলে। ডেটা যেখানে ব্যবহার করা হয়, সেখানে কর বসানো যায় না, কিন্তু যেখান দিয়ে ডেটা চলাচল করে, সেই পথ নিয়ন্ত্রণ করা গেলে চাপ তৈরি করা সম্ভব।

যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানির প্রকৃত দুর্বলতা

যুক্তরাষ্ট্রের বড় কোম্পানিগুলো ঝুঁকিতে থাকলেও তাদের অফিস বা শহর আসল দুর্বল জায়গা নয়। তাদের প্রকৃত দুর্বলতা হলো সমুদ্রের নিচের কেবল, যা বিভিন্ন দেশের জলসীমা ও সরু সমুদ্রপথে বিছানো। এই জায়গাগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে রাষ্ট্রগুলো অনুমতি দিয়ে বা আটকে রেখে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। ইরান ঠিক এই জায়গাটিকেই কাজে লাগাতে চাইছে। সহজভাবে বললে—লাভ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে, কিন্তু দুর্বল জায়গা নির্দিষ্ট কিছু স্থানে, আর সেই জায়গাগুলো ধরেই চাপ তৈরি করা সম্ভব।

ক্ষমতার নতুন ধারণা

এ ধরনের ক্ষমতা আগের যুগের থেকে আলাদা। পূর্বে শক্তি মানে ছিল তেল, খনিজ, জমি বা বন্দর নিজের দখলে রাখা। এখন ইরান দেখাচ্ছে, এসবের মালিক না হয়েও সুবিধা নেওয়া যায়। এর জন্য শুধু একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নিয়ন্ত্রণ বা হুমকি তৈরি করতে পারলেই যথেষ্ট। সমুদ্রতলের কেবল আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, ডিজিটাল দুনিয়াও আসলে খুব বাস্তব অবকাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে। 'ক্লাউড' কোনো ভাসমান জিনিস নয়; এর ভিত্তি সমুদ্রের নিচে। ডেটা চলাচল নির্ভর করে নির্দিষ্ট ল্যান্ডিং স্টেশন, মেরামতের জাহাজ, লাইসেন্স, মালিকানা এবং নিরাপত্তার ওপর। এ কারণে কেবলগুলো আধুনিক সংঘাতে সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। এর সামান্য ক্ষতিও বড় অর্থনৈতিক, সামরিক ও আর্থিক প্রভাব ফেলতে পারে।

হরমুজ প্রণালির বর্তমান পরিস্থিতি

হরমুজ প্রণালিকে এখন আর শুধু খোলা বা বন্ধ—এভাবে দেখা ঠিক হবে না। সেখানে কিছু জাহাজ চলাচল করছে, তবে অনেক সময় সেগুলো ইরানের সঙ্গে বোঝাপড়ার মাধ্যমে চলছে। অর্থাৎ চলাচল এখন আর স্বাভাবিক অধিকার নয়, বরং শর্তসাপেক্ষ সুবিধা। সাবমেরিন কেবল নিয়েও ইরান একই কৌশল প্রয়োগ করতে চাইছে। এর জন্য তাদের যুক্তরাষ্ট্রকে হারাতে হবে না বা বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও ডেটার প্রবাহ বন্ধ করতে হবে না। শুধু এতটাই দরকার—এই প্রবাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করা, যাতে নিরাপত্তারও একটি মূল্য দাঁড়িয়ে যায়।

ট্রাম্প প্রশাসনের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া

ট্রাম্প প্রশাসন সম্ভবত শুরুতেই এই ফি আরোপের দাবিকে চ্যালেঞ্জ করবে, যাতে এটি গ্রহণযোগ্যতা না পায়। তারা বিমা কোম্পানি ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে কাজ করে আগেই পরিস্থিতি সামলাতে চাইবে। একই সঙ্গে তারা নিশ্চিত করতে চাইবে, কেবল মেরামতের কাজ যেন কোনোভাবে আটকে না পড়ে। ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র নতুন কেবল রুট, নতুন ল্যান্ডিং পয়েন্ট এবং মেরামত ব্যবস্থার উন্নতি করে এই ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করতে পারে। উদ্দেশ্য শুধু হরমুজ খোলা রাখা নয়, বরং অনিরাপত্তা থেকে লাভ করার সুযোগ কমানো।

ইরানের চাপের কৌশল

সাধারণভাবে যখন কোনো দেশ চাপ দেয়, তখন তারও খরচ হয়। কিন্তু ইরান এমন একটি উপায় খুঁজছে, যেখানে সে অন্যদের ওপর চাপ দেবে, আবার সেখান থেকেই টাকা আয়ও করবে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় শক্তি না হয়েও নিজের ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে ইরান চাইছে, বিশ্ব যেন ঝামেলা এড়াতে বাধ্য হয়ে তার জন্য একটি 'মূল্য' দেয়।

কার্লা নরলফ, টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ