উপসাগরীয় দেশগুলোর ইরানে হামলা: যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলে নতুন মোড়
উপসাগরীয় দেশগুলোর ইরানে হামলা: কৌশলে নতুন মোড়

গত তিন দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা উপসাগরীয় অঞ্চলের তেলসমৃদ্ধ রাজতন্ত্রগুলোকে নিজেদের সামরিক শক্তি বাড়াতে উৎসাহিত করে আসছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল, শক্তিশালী প্রতিবেশীদের (প্রথমে ইরাক, পরে ইরান) উসকানির জবাব যেন তারা নিজেরাই দিতে পারে। ওবামা প্রশাসনের সময় এই নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় এবং পরবর্তীতে ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা কৌশলেও তা বজায় রাখা হয়। ওয়াশিংটন মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের প্রধান রক্ষকের ভূমিকা কমিয়ে সহায়ক ভূমিকায় আসতে চেয়েছিল, যাতে তাদের মনোযোগ এশিয়ার দিকে ঘোরানো যায়। এতদিন এই পরিকল্পনায় খুব একটা গতি না এলেও সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি দৃশ্যপট বদলে দিচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।

কী ঘটেছে

চলতি সপ্তাহে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের বিমানবাহিনী ইরানি ভূখণ্ডে পৃথকভাবে বিমান হামলা চালিয়েছে। ইরান থেকে ছোঁড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার প্রতিশোধ নিতেই এই পদক্ষেপ। বছরের পর বছর ধরে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড ও তাদের প্রক্সিদের হামলা সহ্য করার পর, এবারই প্রথম উপসাগরীয় দেশ দুটি সরাসরি এবং প্রকাশ্যভাবে ইরানকে লক্ষ্যবস্তু বানালো। এছাড়া সৌদি আরব প্রথমবারের মতো ইরাকের মাটিতে ইরান-সমর্থিত শিয়া মিলিশিয়াদের ওপরও হামলা চালিয়েছে।

কেন হামলা করে সৌদি-আমিরাত

ইরানে হামলার আগে যুক্তরাষ্ট্র ও এই দেশ দুটির মধ্যে সমন্বয় কতটুকু ছিল, তা এখনও স্পষ্ট নয়। সংঘাতের শুরুতে সৌদি আরব ও আমিরাত জানিয়েছিল, ইরানের ওপর হামলার জন্য তারা নিজেদের ভূখণ্ড বা আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেবে না। কিন্তু সাবেক ও বর্তমান পশ্চিমা কর্মকর্তাদের মতে, তেহরান যখন জিসিসিভুক্ত ছয়টি দেশের সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনায় হামলা শুরু করে, তখন এই অবস্থান বদলে যায়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পর্দার আড়ালে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) উপসাগরীয় সামরিক নেতাদের পাল্টা আঘাত করার জন্য উৎসাহিত করে, যাতে একটি শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, কুয়েত গত মার্চ মাসেই ইরাকের অভ্যন্তরে হামলা চালিয়ে এই প্রক্রিয়ায় শামিল হয়েছে।

ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির সিনিয়র ফেলো এপ্রিল অ্যালি বলেন, উপসাগরীয় কোনও রাষ্ট্রই এই যুদ্ধ চায়নি। তবে এই পাল্টা হামলা ইঙ্গিত দেয় যে, ইরানের রেড লাইন অতিক্রম করা হয়েছে। তারা তেহরানকে বার্তা দিতে চায় যে, আমেরিকার সাহায্য ছাড়াও তারা পাল্টা আঘাত হানতে সক্ষম।

ইরানি কৌশলে উল্টো ফল?

অতীতে যখনই উপসাগরীয় অঞ্চলে হামলা হয়েছে, তখন পাল্টা জবাব কে দেবে, যুক্তরাষ্ট্র নাকি স্থানীয় দেশগুলো; তা নিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হতো। তেহরান সবসময় এই সুযোগটিই নিতে চেয়েছে। ২০১৯ সালে সৌদি আরমের আরামকো শোধনাগারে ইরানের বড় ধরনের হামলার পর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সরাসরি সামরিক ব্যবস্থা না নিয়ে দায় রিয়াদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছিলেন, যা সৌদি কর্মকর্তাদের ক্ষুব্ধ করেছিল। একইভাবে ২০২২ সালে আবুধাবিতে হুথিদের হামলার পর সেন্টকমের ধীরগতির প্রতিক্রিয়া নিয়ে আমিরাত অসন্তুষ্ট ছিল।

তবে পেন্টাগন মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে ফাটল ধরানোর ইরানের এই কৌশল এবার হিতে বিপরীত হয়েছে। সাবেক এক ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তার মতে, হামলার মাধ্যমে ইরান এই দেশগুলোকে উল্টো বর্তমান শাসনের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থানে ঠেলে দিয়েছে।

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলে ইরানে সৌদি আরবের বিমান হামলার পর দেশটিতে ইরানি ড্রোন হামলার হার নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। এর মাধ্যমে রিয়াদের প্রতিশোধমূলক হামলার কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলো অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ইরানের কৌশল এই দেশগুলোকে আমাদের কক্ষপথের আরও কাছাকাছি নিয়ে এসেছে।

নতুন কোনও সমীকরণ?

উপসাগরীয় দেশগুলো কি পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে? এখনই তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। কারণ, ড্রোন হামলার জেরে ইরানি কূটনীতিকদের বহিষ্কার করলেও রিয়াদ তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করেনি। বরং তেহরানের সঙ্গে উত্তেজনা প্রশমনে রিয়াদ কিছুটা আগ্রহ দেখাচ্ছে, যা আমিরাতের আক্রমণাত্মক অবস্থানের চেয়ে ভিন্ন।

এমনকি গত সপ্তাহে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে নিজেদের আকাশসীমা ব্যবহারের ওপর সৌদি আরব নিষেধাজ্ঞা দিলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ওমান উপসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ রক্ষার একটি নৌ-মিশন বাতিল করতে বাধ্য হন। রিয়াদ মনে করছে, আরও উত্তেজনা বাড়ানো তাদের স্বার্থের অনুকূলে নয়।

এপ্রিল অ্যালি বলেন, রিয়াদ ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোর মূল ক্ষোভ হলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রচারণায় স্বচ্ছতা ও পূর্ব-পরিকল্পনার অভাব।

এদিকে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছে, সৌদি আরব এখন ইরানের সঙ্গে একটি অনাক্রমণ চুক্তি করার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে। ১৯৭৫ সালের হেলসিংকি চুক্তির আদলে তৈরি এই প্রস্তাবের উদ্দেশ্য হলো শক্তিশালী শত্রুর সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে না গিয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্কের মাধ্যমে উত্তেজনা কমিয়ে আনা। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, ট্রাম্প প্রশাসনের 'সর্বোচ্চ চাপ' নীতির সঙ্গে পা না মিলিয়ে রিয়াদ নিজের স্বার্থে তেহরানের সঙ্গে একটি স্থিতিশীল সম্পর্ক খুঁজছে। বেশ কিছু ইউরোপীয় দেশ এই প্রস্তাবকে সমর্থন দিলেও যুক্তরাষ্ট্র এ বিষয়ে এখনও মুখ খোলেনি।