ট্রাম্প-শি বৈঠকের আগে ইরানে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
ট্রাম্প-শি বৈঠকের আগে ইরানে উদ্বেগ ও আশা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন, তখন ইরানে উদ্বেগ ও সতর্ক আশাবাদের মিশ্র বাতাস বইছে। ইরানের কাছে চীন এখন কেবল একটি বড় জ্বালানি ক্রেতা বা ভূ-রাজনৈতিক অংশীদার নয়; বরং এই মুহূর্তে চীনই একমাত্র বৈশ্বিক শক্তি, যার হাতে ওয়াশিংটনকে সংযত করার এবং ইরানকে বিচ্ছিন্ন হওয়া থেকে ঠেকানোর ক্ষমতা রয়েছে বলে মনে করা হয়।

চীনের ওপর ইরানের নির্ভরতা ও শঙ্কা

কিন্তু বেইজিংয়ের ওপর তেহরান পুরোপুরি ভরসাও রাখতে পারছে না। তেহরানের কর্মকর্তারা স্বীকার করছেন যে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কঠোর অবস্থান বা সংঘাতের কৌশলের সঙ্গে চীনের স্বার্থ পুরোপুরি মিলছে না। কারণ, চীন কোনোভাবেই বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় দীর্ঘমেয়াদি বিঘ্ন দেখতে চায় না।

ইরানি রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য

চীনে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আবদুর রেজা রহমানি-ফাজলি মঙ্গলবার ইরানি বার্তা সংস্থা ইরনাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বেইজিংয়ের প্রতি তেহরানের প্রত্যাশা ও আশঙ্কার কথা তুলে ধরেন। ১৩ থেকে ১৫ মে পর্যন্ত ট্রাম্পের বেইজিং সফরকে কেন্দ্র করে তার এই বক্তব্য ছিল বেশ নমনীয় কিন্তু ইঙ্গিতপূর্ণ। রাষ্ট্রদূত প্রকাশ্যে চীন-ইরান সম্পর্কের শক্তির কথা বললেও তার কথায় এটি স্পষ্ট যে, ইরান শঙ্কিত যে, যুক্তরাষ্ট্রের চাপে চীন হয়তো ইরান থেকে তেল আমদানি বা সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে ওয়াশিংটনের কোনো কৌশলের 'মাধ্যম' হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। রাষ্ট্রদূত রহমানি-ফাজলি বলেন, ইরানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কেবল হুমকি ও চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের পাল্টা জবাব; এটি কোনোভাবেই বৈধ বাণিজ্য বা কৌশলগত অংশীদারদের স্বার্থের বিরুদ্ধে নয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব

বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই পথে যেকোনো ধরনের অস্থিরতা সরাসরি চীনের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য হুমকি। ইরানি কর্মকর্তারা এই বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন। তেহরান চীনকে কৌশলগত অংশীদার বললেও বেইজিং যে আদর্শের চেয়ে স্থিতিশীলতাকেই বেশি গুরুত্ব দেয়, তা এখন ইরানের কট্টরপন্থি বিশ্লেষকরাও স্বীকার করছেন।

বিশ্লেষকদের সতর্কতা

ইরানি বিশ্লেষক আলী গোলহাকি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, যুদ্ধের শেষ গন্তব্য কিন্তু বেইজিংয়ে। অর্থাৎ, এই সংঘাত থামাতে চীনের ভূমিকা হবে নির্ণায়ক। চীনের ধৈর্য যদি শেষ হয়ে যায় এবং তারা যদি হরমুজ ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের কাছাকাছি চলে আসে, তবে তেহরান বড় ধরনের বিপদে পড়বে।

তেহরানের ভয় ও মধ্যস্থতার আশা

তেহরানের বড় ভয় হলো, ট্রাম্প-শি বৈঠকের পর বেইজিং হয়তো ওয়াশিংটনের শর্ত অনুযায়ী ইরানকে নমনীয় হতে চাপ দেবে। যদিও ইরান এই সংকট নিরসনে চীনের মধ্যস্থতাকে স্বাগত জানাচ্ছে। কিন্তু রাষ্ট্রদূত সতর্ক করে দিয়েছেন যে, এই মধ্যস্থতা যেন ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টির হাতিয়ারে পরিণত না হয়।

চীনের ভূমিকা ইতিহাসে

ইতিহাস বলছে, পাকিস্তান ও কাতারের মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি বা ২০২৩ সালে সৌদি আরবের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার নেপথ্যে চীন বড় ভূমিকা পালন করেছিল। চীন এখন কেবল অংশীদার নয়, বরং উপসাগরীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান অংশীদার। চীনের প্রস্তাবিত চার দফা নিরাপত্তা উদ্যোগ তেহরানের কাছে আকর্ষণীয়, কারণ এটি পশ্চিমাদের চাপিয়ে দেওয়া নিরাপত্তার বিপরীতে সংলাপ ও সার্বভৌমত্বের কথা বলে।

চীনের ভারসাম্য নীতি

বর্তমান সংঘাতের শুরু থেকেই চীন একটি ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করে যাচ্ছে। তারা ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের বিরোধিতা করছে এবং তেহরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচির অধিকারকে সমর্থন দিচ্ছে। একই সঙ্গে তারা হরমুজ প্রণালিতে 'স্বাভাবিক ও নিরাপদ নৌ-চলাচল' পুনঃপ্রতিষ্ঠারও তাগিদ দিয়ে আসছে।

ইরানের জন্য সীমাবদ্ধতা

বিশ্লেষকদের মতে, চীনের জন্য প্রধান স্বার্থ হলো 'স্থিতিশীলতা'। তেহরানের জন্য এটি একদিকে যেমন নিরাপত্তার ঢাল, অন্যদিকে এক বড় সীমাবদ্ধতাও বটে। ইরান এখন চীনের দিকে চেয়ে আছে এই আশায় যে বেইজিং ওয়াশিংটনকে সংযত করবে। কিন্তু ইরান একই সঙ্গে উদ্বিগ্ন যে, বেইজিংয়ের এই সমর্থনের শর্ত হলো উপসাগরীয় সংকটকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে না দেওয়া। অর্থাৎ, ইরান সংঘাতের নীতিতে কতটুকু এগোতে পারবে, সেটির রাশ এখন অনেকটা চীনের হাতেই।

সূত্র: আল-মনিটর