ইরানের কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) নিয়ে আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিচ্ছে। তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যদি আবার হামলা শুরু করে, তাহলে আমিরাতের ওপর আরও কঠোর হামলা হতে পারে।
ইরানের পার্লামেন্টের বক্তব্য
ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের সদস্য আলি খেজরিয়ান রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে বলেছেন, ‘আমিরাতকে প্রতিবেশী হিসেবে বিবেচনা করার অবস্থান থেকে আমরা সরে এসেছি। এখন দেশটিকে শত্রুর ঘাঁটি হিসেবে বিবেচনা করছি আমরা।’
সশস্ত্র বাহিনীর বিবৃতি
চলতি মাসে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর কেন্দ্রীয় সদর দপ্তর খাতাম আল-আনবিয়ার বিবৃতিতেও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছে। যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা সত্ত্বেও হরমুজ প্রণালির কাছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনার পর এই বিবৃতি দেওয়া হয়।
ইসলামি বিপ্লবী গার্ডের সতর্কবার্তা
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ডের (আইআরজিসি) জেনারেলদের নেতৃত্বাধীন যৌথ কমান্ড এক সপ্তাহ আগে আমিরাতের নেতাদের উদ্দেশ করে বলেছে, তাঁরা যেন তাঁদের দেশকে ‘যুক্তরাষ্ট্র ও জায়নবাদী’ এবং তাদের সামরিক বাহিনী ও সরঞ্জামের ঘাঁটি হতে না দেয়। এটাকে ইসলাম ও মুসলিমদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা বলে উল্লেখ করেছে তারা।
ইরানের অভিযোগ
ইরানের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক, রাজনৈতিক এবং গোয়েন্দা সম্পর্ক আরও গভীর করছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। এতে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি হচ্ছে। তারা আরও সতর্ক করে বলেছে, ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের দ্বীপ ও বন্দরে আবার কোনো হামলা হলে কঠোর জবাব দেওয়া হবে।
আব্রাহাম চুক্তি
২০২০ সালে আমিরাত, বাহরাইন ও মরক্কো যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ‘আব্রাহাম চুক্তি’ স্বাক্ষর করে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে। ইরান এই পদক্ষেপকে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন হিসেবে দেখে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে এই চুক্তি করেন। তিনি আব্রাহাম চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশের সংখ্যা আরও বাড়াতে চান। বিশেষ করে সৌদি আরবকে এতে যুক্ত করতে চান। তবে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে এই প্রক্রিয়া আপাতত থমকে আছে।
ফুজাইরাহ বন্দর নিয়ে বিতর্ক
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ডের দাবি, আমিরাতের গুরুত্বপূর্ণ ফুজাইরাহ বন্দরটি হরমুজ প্রণালির এমন একটি এলাকায় অবস্থিত, যেটি ইরানের নিয়ন্ত্রণাধীন। তাই ওই বন্দর থেকে যাওয়া-আসা করা যেকোনো জাহাজ ইরানের আইনের আওতায় পড়ে। ফুজাইরাহ বন্দরে চলতি মাসের শুরুতে হামলা হয়। তবে ইরানের দাবি, তারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয়।
আমিরাতের পদক্ষেপ
সংযুক্ত আরব আমিরাত বরাবরই তাদের দেশে ইরানের হামলার নিন্দা জানিয়েছে। দেশটি বলেছে, তারা প্রয়োজনে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়াসহ নানাভাবে জবাব দেওয়ার অধিকার রাখে। আমিরাত কর্তৃপক্ষ দেশটিতে বহু বছর ধরে বসবাস করা অনেক ইরানি নাগরিকের ভিসাও বাতিল করেছে। পাশাপাশি ইরানি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বাণিজ্য পথ, অর্থ লেনদেনের নেটওয়ার্ক এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছে।
ইরানের সমস্যা
দুই দেশের সম্পর্ক খারাপ হওয়ায় ইরানও বড় ধরনের সমস্যায় পড়েছে। কারণ, চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ইরান যে পণ্য আমদানি করত, তার অনেকটাই আমিরাতের বন্দর দিয়ে আসত। যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের কারণে সমুদ্রপথে বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হওয়ায় এবং খাদ্যের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় ইরান এখন পাকিস্তান, ইরাক, তুরস্ক ও অন্যান্য প্রতিবেশী দেশের স্থলপথ ব্যবহারের চেষ্টা করছে।
ইরান কেন আমিরাতের ওপর বেশি নজর দিচ্ছে
যুক্তরাষ্ট্রের সেনা সদস্যরা অনেক বছর ধরে সংযুক্ত আরব আমিরাতে শক্তপোক্তভাবে অবস্থান করছে। আবুধাবির কাছে আল-ধাফরা বিমানঘাঁটিতে হাজার হাজার মার্কিন সেনা এবং উন্নত রাডার ও গোয়েন্দা প্রযুক্তি রয়েছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড (আইআরজিসি) দাবি করেছে, যুদ্ধের সময় তারা এসব লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।
ট্রাম্প সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল–নাহিয়ানকে একজন ‘চতুর নেতা’ হিসেবে উল্লেখ করে প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেছেন, আমিরাত হয়তো ‘নিজস্ব পথে যেতে’ চাইতে পারে, বিশেষ করে গত মাসে আমিরাত ওপেক থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও বিশ্লেষকেরা বারবার ইঙ্গিত দিচ্ছে যে যুদ্ধের সময় ইরানের ভূখণ্ডে কিছু হামলার ঘটনায় আমিরাতের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে। বিশেষ করে ইরানের দক্ষিণের দ্বীপগুলোয় থাকা তেল স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হচ্ছে।
ইসরায়েল-আমিরাত সামরিক সহযোগিতা
আব্রাহাম চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে ইসরায়েল ও আমিরাত খুব দ্রুত সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতা বাড়িয়েছে। ইসরায়েলের অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এলবিট সিস্টেমসও আমিরাতে একটি শাখা স্থাপন করেছে। ইরানে চলমান যুদ্ধেও ইসরায়েল আমিরাতে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ‘আয়রন ডোম’ পাঠিয়েছে। সেটি চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় কয়েক ডজন সেনাও সেখানে গেছেন বলে জানা গেছে। আরব বিশ্বের অন্য কোনো দেশে এমন ব্যবস্থা আগে নেওয়া হয়নি।
তেল আবিবে গত মঙ্গলবার এক অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি বলেছেন, আমিরাত ও ইসরায়েলের মধ্যে অসাধারণ সম্পর্কের কারণে উন্নত রাডার ও ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা মোতায়েন করা হয়েছে। আব্রাহাম চুক্তির ভিত্তিতে এ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।
আমিরাতের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ গত ১৭ মার্চ বলেন, ইরান যদি আরব প্রতিবেশী দেশগুলোতে হামলা চালায়, তাহলে ইসরায়েল এবং এর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকা দেশগুলোর মধ্যকার বন্ধন আরও মজবুত হবে।
আমিরাতের প্রতিক্রিয়া
আমিরাত অভিযোগ তুলে দাবি করেছে, তাদের পররাষ্ট্রনীতি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সম্পূর্ণভাবে সার্বভৌম একটি বিষয়। তাদের অভিযোগ, ইরান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। আরব দেশের ভূখণ্ড ও আকাশপথ ব্যবহার করে ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালানো হচ্ছে—এমন অভিযোগ তুলে নিজেদের হামলাকে বৈধতা দিচ্ছে তেহরান।
তিনটি দ্বীপ নিয়ে বিরোধ
তিনটি দ্বীপ নিয়ে আমিরাত ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। এই তিনটি দ্বীপ হলো—গ্রেটার টাম্ব, লেসার টাম্ব এবং আবু মুসা। ১৯৭১ সাল থেকে এসব দ্বীপ ইরানের নিয়ন্ত্রণে আছে। হরমুজ প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার ক্ষেত্রে এগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
আমিরাতের আন্তর্জাতিক সহযোগিতাবিষয়ক মন্ত্রী রিম আল-হাশিমি মনে করেন, যুদ্ধ চলাকালে তাঁর দেশের ওপর ইরানের হামলা হয়েছে। কেন তিনি এমনটা মনে করছেন, সেটাও গত মাসে ব্যাখ্যা করেছেন হাশিমি। আল–হাশিমি বলেন, ‘আমরা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রতীক। আমরা ২০০টির বেশি দেশের মানুষকে স্বাগত জানাই এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে গ্রহণ করি।’
আমিরাতের আন্তর্জাতিক সহযোগিতাবিষয়ক মন্ত্রী আরও বলেন, ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি চালাতে গিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী আঞ্চলিক জোটকে সমর্থন দিতে গিয়ে এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প চালাতে গিয়ে নিজেদের সম্পদ নষ্ট করেছে।
আমিরাত কি সরাসরি ইরানে হামলা করছে
বিপুল সম্পদের মালিকানা এবং পশ্চিমা মিত্রদের সঙ্গে সামরিক চুক্তির বদৌলতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিমানবাহিনীতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির যুদ্ধবিমান রয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর এক সপ্তাহ পর ইসরায়েলি গণমাধ্যম দাবি করেছিল, আমিরাতের যুদ্ধবিমান ইরানের কিশম দ্বীপে একটি পানি বিশুদ্ধকরণ স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। তবে আমিরাতের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আলি আল-নুয়াইমি এই দাবি অস্বীকার করে বলেছেন, ‘আমরা কিছু করলে তা প্রকাশ্যে ঘোষণা করার মতো সাহস রাখি।’
এদিকে ইরান এই হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল জোটকে দায়ী করেছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) বলেছে, তারা এ ঘটনার জবাবে বাহরাইনের জুফাইর ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। কারণ, তারা মনে করেছিল সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি ব্যবহার করা হয়েছে।
এ ছাড়া এপ্রিলের শুরুতে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন আইআরআইবি ধ্বংস হয়ে যাওয়া একটি ড্রোনের ছবি প্রকাশ করেছিল। এটিকে চীনের তৈরি উইং লুং ড্রোন বলে দাবি করেছিল তারা। আগে ইয়েমেনে ইরান–সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীসহ বিভিন্ন জায়গায় হামলা চালাতে আমিরাত এই মডেলের ড্রোন ব্যবহার করেছিল।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও বিশ্লেষকেরা বারবার ইঙ্গিত দিচ্ছেন, যুদ্ধের সময় ইরানের ভূখণ্ডে কিছু হামলার ঘটনায় আমিরাতের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে। বিশেষ করে ইরানের দক্ষিণের দ্বীপগুলোতে থাকা তেল স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হচ্ছে।
ইরানের কোনো সামরিক কমান্ডার বা শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে আমিরাতকে এসব হামলার জন্য সরাসরি দায়ী করেননি। তবে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও আলোচনায় আমিরাতের দিকেই আঙুল তোলা হচ্ছে।
গত ৮ এপ্রিল সকালে ট্রাম্প যখন যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন, তখন ইরানের গণমাধ্যম লাভান তেল শোধনাগার এবং সিরি এলাকায় বিস্ফোরণ ও হামলার খবর প্রকাশ করেছিল। তবে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র—দুপক্ষই বলেছে, তারা এসব হামলার ঘটনায় জড়িত নয়।
কিছুক্ষণ পরই আইআরজিসি সংশ্লিষ্ট টেলিগ্রাম চ্যানেল ও অনলাইন মাধ্যমে একটি ছবি ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে দাবি করা হয়, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ব্যবহৃত ফরাসি যুদ্ধবিমান মিরাজ ২০০০-৯ ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের আকাশে উড়ছে। সরকার সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমগুলোও খবর প্রকাশ করে যে আমিরাতের মিরাজ যুদ্ধবিমান থেকে হামলা হয়েছে। তবে এ ব্যাপারে নিশ্চিত প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি তারা।
গত মাসের শেষ দিকে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। ওই ভিডিওতে দেখা যায়, আমিরাতের যুদ্ধবিমান তাঁকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ওই ভিডিওর প্রসঙ্গ টেনে ইরানের সরকারঘেঁষা বিশ্লেষকেরা বলেছেন, সেখানে যে এফ–১৬–ই যুদ্ধবিমানগুলো দেখা যাচ্ছে, সেগুলোর জাতীয় চিহ্ন ও নম্বর মুছে ফেলা ছিল। এর ভিত্তিতে তাঁরা ধারণা করছেন, আমিরাত সম্ভবত এসব যুদ্ধবিমানকে ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে। ধরা পড়লে ঝুঁকি কমাতে তারা চিহ্ন ও নম্বর মুছে ফেলেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরান দ্রুত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। পাল্টা হামলাগুলোর বেশির ভাগেরই নিশানা ছিল আমিরাত। এর পরপরই আছে বাহরাইন, কুয়েত, কাতার ও সৌদি আরবের নাম। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরায়েলের বাইরে সবচেয়ে বেশি ইরানি হামলার মুখে পড়া দেশগুলোর একটি হলো সংযুক্ত আরব আমিরাত। ইরানের ভূখণ্ডে কথিত হামলার বিষয়ে আমিরাত সরকার এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।



