মেক্সিকোর অভ্যন্তরে মাদক চোরাচালানকারী গোষ্ঠী বা কার্টেলগুলোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ তাদের গোপন যুদ্ধের তীব্রতা নজিরবিহীনভাবে বাড়িয়েছে। সিএনএন-এর এক বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, সিআইএ-র এলিট এবং অত্যন্ত গোপনীয় শাখা ‘গ্রাউন্ড ব্রাঞ্চ’ বর্তমানে মেক্সিকোর মাটিতে সরাসরি প্রাণঘাতী অভিযানে অংশ নিচ্ছে।
সিনালোয়া কার্টেলের নেতা নিহত
গত ২৮ মার্চ মেক্সিকো সিটির উপকূলে একটি ব্যস্ত মহাসড়কে সিনালোয়া কার্টেলের মাঝারি সারির নেতা ফ্রান্সিসকো বেলট্রান ওরফে ‘এল পায়িন’ এবং তার চালক একটি রহস্যময় গাড়ি বিস্ফোরণে নিহত হন। মেক্সিকান কর্তৃপক্ষ এই ঘটনা নিয়ে গোপনীয়তা বজায় রাখলেও একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, এটি ছিল সিআইএ কর্মকর্তাদের সহায়তায় চালানো একটি সুনির্দিষ্ট হত্যাকাণ্ড।
ট্রাম্পের নীতি ও সিআইএ-র বর্ধিত ক্ষমতা
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতেই মেক্সিকান কার্টেলগুলোকে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছেন এবং তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য সিআইএ-কে বর্ধিত ক্ষমতা প্রদান করেছেন। আগে যেখানে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মূলত তথ্য আদান-প্রদান এবং সাধারণ সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত, সেখানে এখন তারা সরাসরি গুপ্তহত্যার মতো অভিযানে লিপ্ত হচ্ছে।
মধ্যম সারির নেতাদের টার্গেট
সিআইএ-র এই অভিযানগুলোর মূল লক্ষ্য হলো কেবল শীর্ষ নেতাদের নির্মূল করা নয়, বরং পুরো কার্টেল নেটওয়ার্কটিকে ভেঙে ফেলা। এর জন্য তারা মধ্যম সারির গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের লক্ষ্যবস্তু করছে যারা চোরাচালান বা অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। এই ধরনের কৌশল সাধারণত মধ্যপ্রাচ্যে সন্ত্রাসবাদ দমনে ব্যবহৃত হলেও এখন মেক্সিকোতে এর প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে।
মেক্সিকোর সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন
সিআইএ-র এই গোপন তৎপরতা মেক্সিকোর সার্বভৌমত্ব ও আইনের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে। মেক্সিকোর সংবিধান অনুযায়ী, দেশটির সরকারের স্পষ্ট অনুমতি ছাড়া কোনো বিদেশি সংস্থা দেশটিতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বা সামরিক অভিযানে অংশ নিতে পারে না। তবে মেক্সিকোর বর্তমান প্রেসিডেন্ট ক্লডিয়া শিনবাউম এই বিষয়ে একটি নাজুক কূটনৈতিক অবস্থানে রয়েছেন।
কূটনৈতিক টানাপোড়েন
একদিকে ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন যে মেক্সিকো সরকার কার্টেল নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিক শক্তি প্রয়োগ করবে, অন্যদিকে সিআইএ-র এই গোপন অভিযানগুলো ট্রাম্পকে সন্তুষ্ট রাখার একটি অলিখিত পথ হতে পারে। চিলির মেথ ল্যাব রেইড এবং অন্যান্য অভিযানে সিআইএ-র সম্পৃক্ততা ফাঁস হওয়ার পর শিনবাউম প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করলেও পর্দার আড়ালে সহযোগিতার বিষয়টি রয়েই গেছে।
মেক্সিকান নিরাপত্তা বাহিনীতে অনাস্থা
যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের মতে, মেক্সিকান নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে কার্টেলদের ব্যাপক অনুপ্রবেশের কারণে তারা এখন আর কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর পুরোপুরি ভরসা করতে পারছেন না। ফলে সিআইএ এখন বাছাইকৃত আঞ্চলিক ও স্থানীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি কাজ করছে। সম্প্রতি সিনালোয়ার গভর্নরসহ বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ মেক্সিকান কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কার্টেলের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ এনেছে মার্কিন বিচার বিভাগ।
প্রতিশোধমূলক সহিংসতার আশঙ্কা
এই গভীর অনাস্থা এবং কার্টেলদের ক্রমবর্ধমান সহিংসতার প্রেক্ষাপটে সিআইএ তাদের ‘গ্রাউন্ড ব্রাঞ্চ’ সম্পদের পুরো ব্যবহার শুরু করেছে। তবে এই ধরনের আক্রমণাত্মক অভিযান শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও কার্টেলদের পক্ষ থেকে প্রতিশোধমূলক সহিংসতার ঢেউ তুলে আনতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেক সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা। সূত্র: সিএনএন



