গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলায় নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্য। গুরুতর আহত হন তাঁর পুত্র ও বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। এর পর থেকে তাঁর আর দেখা পাওয়া যায়নি। এমনকি বাবা ও স্ত্রীর জানাজায়ও তিনি ছিলেন অনুপস্থিত।
লাখো মানুষের উপস্থিতি, একজনের অনুপস্থিতি
ইরানের নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় অংশ নিয়েছেন লাখ লাখ শোকাহত মানুষ। উপস্থিত ছিলেন বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, স্পিকারসহ কয়েক ডজন প্রতিনিধি। তবে ইরান এবং ইরাকে খামেনির প্রতি শেষশ্রদ্ধা ও তাঁর দাফনের আনুষ্ঠানিকতার সাত দিনব্যাপী আয়োজন নিয়ে তেহরানের বাসিন্দাদের একাংশ আল-জাজিরার কাছে এক ভিন্ন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, লাখো মানুষের উপস্থিতির চেয়ে একজনের অনুপস্থিতি বেশি মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। তিনি আর কেউ নন, ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি।
অনুপস্থিতির কারণ ও গুঞ্জন
ইরানি কর্মকর্তারা এ অনুপস্থিতির কারণ হিসেবে বলছেন, মোজতবা খামেনির ওপর এখনো হত্যার হুমকি আছে। তবে জানাজায় মোজতবা খামেনির তিন ভাই মোস্তফা, মাইসাম, মাসুদসহ ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও বিদেশি অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন। বর্তমান সর্বোচ্চ নেতার এ অনুপস্থিতি জনমনে আলাদাভাবে দাগ কেটেছে। হামলায় তিনি কতটা গুরুতর আহত হয়েছেন, তা নিয়ে আবার গুঞ্জন শুরু হয়েছে।
তেহরানে খামেনির জানাজায় অংশ নেওয়া ২৬ বছর বয়সী মাসুমেহ বলেন, ‘আমার দেশ আর আগের সেই ইরান নেই, যেখানে নেতাকে জনসমক্ষে দেখা যেত। মোজতবার অনুপস্থিতি কোনো বিষয় নয়। কিন্তু তাঁর উপস্থিতি দেশের নিরাপত্তার প্রতীক। এখন আমার মনে হচ্ছে, এ দেশে আর আগের মতো সেই নিরাপত্তা নেই। প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতাই ছিলেন ইরানের শক্তির মূল ভিত্তি।’
ইসরায়েলের হুমকি
গতকাল সোমবার যখন খামেনির মরদেহবাহী কফিন তেহরান অতিক্রম করছিল, তখন ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোজতবা খামেনিকে সরাসরি হুমকি দেন। হিব্রু ভাষায় দেওয়া এক বিবৃতিতে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ বলেন, ‘খামেনিকে ইসরায়েল হত্যা করেছে। কারণ, তিনি ইসরায়েলকে ধ্বংসের পরিকল্পনা করেছিলেন এবং এর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।’ কাৎজ আরও বলেন, ‘“খুনিকে” খুন করা হয়েছে। অন্য কোনো ইরানি নেতা আবার ইসরায়েলকে ধ্বংস করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে চাইলে, তাঁকেও একইভাবে প্রতিহত করা হবে।’
এ ছাড়া গত সপ্তাহে কাৎজ বলেছেন, মোজতবা খামেনি ইসরায়েলের নিশানায় আছেন। তাঁর এ বক্তব্য ইরানে তীব্র নিন্দার জন্ম দেয়।
যুদ্ধে শীর্ষ নেতৃত্বের ক্ষতি
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকেই দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বের বড় একটি অংশকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে ইসরায়েল। যুদ্ধে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির পাশাপাশি ইসরায়েলি হামলায় ইরানের তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী, সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান, ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) শীর্ষ কমান্ডার এবং গোয়েন্দা, সামরিক পরিকল্পনা ও পরমাণু-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা নিহত বা গুরুতর আহত হয়েছেন।
জনমতের প্রতিক্রিয়া
জানাজায় অংশ নেওয়া ৩৫ বছর বয়সী ফায়েজেহ বলেন, ‘আমি মনে করি নিরাপত্তার স্বার্থেই এখন তাঁর (মোজতবা খামেনি) জনসমক্ষে আসা উচিত নয়। আমাদের কিছুটা অপেক্ষা করা দরকার। নতুন নেতাকে এখনো দেখা যায়নি। এর মানে এই নয়, কোনো খারাপ কিছু ঘটেছে। কারণ, আমি জানি, শত্রু যেখানে সাবেক নেতার প্রতি কোনো দয়া দেখায়নি, সেখানে তারা মোজতবার প্রতিও কোনো করুণা দেখাবে না।’ মোজতবা খামেনির অনুপস্থিতি সরকারের কার্যকলাপে কোনো প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন না ফায়েজেহ।
তেহরান থেকে ৪৭ বছর বয়সী সোমায়েহ আল–জাজিরাকে বলেন, ‘সরকার বড় বড় কথা বলে। অথচ মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য নেতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না, যাতে তিনি এ গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারেন।’ সোমায়েহ আরও বলেন, ‘মনে হচ্ছে এর পেছনে কোনো গভীর চক্রান্ত বা ষড়যন্ত্র কাজ করছে। সরকার এখনো জনগণের সঙ্গে সৎ ও স্বচ্ছ আচরণ করছে না।’
বিশ্লেষকদের মতামত
ইরানি-মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক নেগার মোর্তাজাভি বলেন, যেকোনো নেতার ক্ষেত্রেই তাঁকে দেখতে পাওয়ার প্রত্যাশা অত্যন্ত স্বাভাবিক। প্রতিদিন না হলেও, বিগত দুজন সর্বোচ্চ নেতাকে অন্তত দেখা যেত। সেই হিসেবে মোজতবার প্রকাশ্য অনুপস্থিতি নিশ্চিতভাবে অস্বাভাবিক। তবে মোর্তাজাভি মনে করেন, খামেনির জীবনের ওপর যে হুমকি রয়েছে, তা বিবেচনা করলে এ পরিস্থিতি ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি করা হয়নি, পরিস্থিতির কারণেই তৈরি হয়েছে। এর পেছনে যৌক্তিক কারণও রয়েছে।
রয়টার্সের সঙ্গে আলাপকালে মোজতবা খামেনির ঘনিষ্ঠ কয়েকজন জানিয়েছেন, তিনি গুরুতর আহত হয়েছেন। তাঁর মুখমণ্ডল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উভয় পায়ে বড় ধরনের আঘাত লেগেছে। স্ত্রী ও বাবার জানাজায় তাঁর অনুপস্থিতি এবং শারীরিক জখমের খবর—সব মিলিয়ে অনেকে এখন ইরানের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন।



