যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পথে, ট্রাম্পের দ্বিমুখী অবস্থান
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পথে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ভঙ্গুর শান্তি আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার কাছাকাছি পৌঁছেছে। বুধবার প্রথম দিনের পর দ্বিতীয় দফায় ইরানের ওপর আরও বড় ধরনের বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। বৃহস্পতিবার ভোরে ইরানের রাজধানী তেহরানের বেশ কয়েকটি এলাকায় এ হামলা চালানো হয়। এর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে, বুধবার দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় বেশ কয়েকটি শহরে আঘাত হেনেছিল মার্কিন বাহিনী।

হামলায় হতাহত ও ধারাবাহিকতা

গত দুই দিনের এই ধারাবাহিক হামলায় অন্তত ১৪ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ইরানের ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) একজন সদস্যও রয়েছেন। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ইরানও প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম ও অবকাঠামো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে।

চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলার জেরেই এই পাল্টাপাল্টি রক্তক্ষয়ী সংঘাত শুরু হলো। এমন এক সময়ে এই মার্কিন হামলা চালানো হলো, যখন ইরানে সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির কয়েক দিনব্যাপী রাষ্ট্রীয় জানাজা ও দাফন প্রক্রিয়া চলছিল। গত ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধের শুরুর দিকেই মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলায় খামেনি নিহত হন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ট্রাম্পের দ্বিমুখী অবস্থান

বুধবার তুরস্কের আঙ্কারায় ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ইরানের সঙ্গে হওয়া সমঝোতা স্মারক তার দৃষ্টিতে ‘শেষ’। তবে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে শান্তি আলোচনা আপাতত চলতে পারে। ট্রাম্পের এমন দ্বিমুখী অবস্থানের কারণে পুরো শান্তিপ্রক্রিয়া এখন এক গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই হামলাগুলোকে ‘দীর্ঘমেয়াদি সামরিক পদক্ষেপ’ নয় বলে দাবি করলেও, পর্যবেক্ষকেরা এ নিয়ে বেশ সংশয়ে আছেন। ইউনিভার্সিটি অব ব্রাডফোর্ডের রাজনীতির অধ্যাপক আলম সালেহ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে একটি কানাগলিতে এসে ঠেকেছে এবং তাদের কৌশল পরিবর্তন করা দরকার। কারণ বোমা মেরে কোনও কাজ হচ্ছে না।

কেন দ্বিতীয় রাতেও হামলা চালালো যুক্তরাষ্ট্র?

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ এবং নিরপরাধ বেসামরিক নাবিকদের ওপর ইরানের হামলা চালানোর সক্ষমতা আরও গুঁড়িয়ে দিতে বৃহস্পতিবার ইরানজুড়ে প্রায় ৯০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে। গত জুনে দুপক্ষের সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর এটিই সবচেয়ে বড় উত্তেজনা।

এর আগে বুধবার সেন্টকম জানিয়েছিল, হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার সময় তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানি হামলার প্রতিক্রিয়ায় তারা আগের রাতে প্রায় ৮০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। হামলার পাশাপাশি ওয়াশিংটন ইরানি তেলের ওপর দেওয়া নিষেধাজ্ঞা মওকুফের সুবিধাও বাতিল করেছে, যা সমঝোতা স্মারকের একটি অংশ ছিল।

তেহরানভিত্তিক বিশ্লেষক হোসেন রয়ভারান জানান, খনি বা মাইন অপসারণের কাজে নিয়োজিত ইরানি বাহিনীর এলাকায় ভুলবশত ঢুকে পড়ার কারণে হয়তো ট্যাংকারগুলোর ওপর হামলার ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। বর্তমানে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌযান চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।

আইআরজিসি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, নৌযান চলাচল যুদ্ধপূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় মাত্র ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে এবং এই অচলাবস্থার জন্য তারা ওয়াশিংটনের ‘দুঃসাহসিকতা ও রুটের বিষয়ে হস্তক্ষেপকে’ দায়ী করেছে। তারা আরও বলেছে, হরমুজ প্রণালিতে বিদেশিদের কোনও অংশীদারত্ব নেই।

আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার প্রধান আর্সেনিও ডোমিঙ্গুয়েজ জানিয়েছেন, বর্তমানে প্রায় ৬ হাজার নাবিক হরমুজ প্রণালির আশপাশে আটকা পড়ে আছেন। এনবিসি নিউজকে তিনি বলেন, এই অবিবেচকের মতো হামলাগুলো আবারও নিরপরাধ নাবিকদের মারাত্মক বিপদের মুখে ফেলেছে।

কোথায় কোথায় হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র?

বৃহস্পতিবার সকালে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর নগরী বন্দর আব্বাস, সিরিক, কুহেস্তাক, চাবাহার, জাস্ক, আবু মুসা দ্বীপ এবং কোনারকে আঘাত হানে। পরে ইরানের বুশেহর প্রদেশেও বেশ কয়েকটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা মেহের জানিয়েছে। বুশেহর প্রদেশেই ইরানের একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি অবস্থিত। এ ছাড়া সিরিক শহরে মার্কিন হামলায় একটি মাছ ধরার ঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ৩ জন নিহত ও ১৫ জন আহত হয়েছেন।

সেন্টকম সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার দাবি করলেও, ইরানি গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী বৃহস্পতিবারের হামলায় বেসামরিক অবকাঠামো এবং সম্ভবত একটি হাসপাতালও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাকিস্তানের সীমান্তঘেঁষা ইরানশাহরের বিমানবন্দর অবকাঠামোয় হামলায় অন্তত ১ জন নিহত হয়েছেন।

আইআরজিসি জানিয়েছে, মাশহাদ যাওয়ার সড়কের দুটি সেতুতে আঘাত হানা হয়েছে, যেখানে বৃহস্পতিবার সাবেক সর্বোচ্চ নেতা খামেনির দাফন সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। এ কারণে তেহরান-মাশহাদ রেলপথের যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল মেরামতের জন্য সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। এ ছাড়া উত্তর গোলিস্তান প্রদেশের আক তাকেহ খান রেলসেতুতেও আঘাত হানা হয়েছে, যা তেহরান থেকে তুর্কমেনিস্তান ও কাজাখস্তান হয়ে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যের প্রধান রুট এবং মার্কিন অবরোধের সময় রাশিয়ার পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত হতো।

যুক্তরাষ্ট্রের এই ডজন খানেক হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একে ‘মিথ্যা অজুহাত’ এবং ‘গুরুতর যুদ্ধাপরাধ’ বলে আখ্যা দিয়েছে।

ইরানের পাল্টা আঘাত কোথায়?

মার্কিন হামলার জবাবে আইআরজিসি বাহরাইন, কুয়েত এবং কাতারে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। বৃহস্পতিবার এই তিন দেশেই একযোগে সাইরেন বেজে ওঠে।

তেহরান থেকে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিনিধি রেসুল সেরদার আতাস জানান, কুয়েতের আরিফজান ও আলি আল সালেম এবং বাহরাইনের জুফায়ার ও শেখ ঈসা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। আইআরজিসির দাবি, তারা কুয়েতের প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, কাতারের স্যাটেলাইট অ্যান্টেনা এবং বাহরাইনে মার্কিন বাহিনীর জ্বালানি ডিপো সফলভাবে ধ্বংস করেছে। কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, মার্কিন হামলা অব্যাহত থাকলে এই অঞ্চলের অন্যান্য মার্কিন ঘাঁটিতেও হামলা বিস্তার করা হবে। কুয়েতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মেজর জেনারেল সৌদ আবদুল আজিজ আল-ওতাইবি জানিয়েছেন, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১০টি ড্রোন প্রতিহত করেছে। অন্যদিকে জর্ডানের সশস্ত্র বাহিনীও তাদের আকাশসীমায় আটটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার দাবি করেছে।

শান্তি আলোচনা নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য

ন্যাটো সম্মেলনে ট্রাম্প সমঝোতা স্মারক ‘শেষ’ বলে মন্তব্য করলেও, পরে এয়ার ফোর্স ওয়ানে সুর কিছুটা নরম করে বলেন, ইরানের সঙ্গে পুরোদমে যুদ্ধে জড়ানোর পথ খোলা থাকলেও তেহরান এখন ‘খুব করে একটি চুক্তি করতে চায়’। ট্রাম্পের এই ক্ষুব্ধ মন্তব্যের জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এক্সে লিখেছেন, ইরান অসভ্যতার জবাব অসভ্যতায় দেবে না।

ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎ ও পানি শোধনাগারের মতো বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করা এবং খার্গ দ্বীপের তেল উৎপাদন কেন্দ্রটি দখলে নেওয়ার নতুন হুমকি দিয়েছেন। হামলার পর নিজের ট্রুথ সোশ্যাল অ্যাকাউন্টে হামলার ভিডিও পোস্ট করে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘এটি জাহাজে হামলার প্রতিশোধ। আবার এমনটা হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে!’

ইরানের প্রতিক্রিয়া

ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এই নতুন সিরিজ হামলাকে ‘যুদ্ধাপরাধ’ বলে নিন্দা করেছে এবং ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছে। তেহরান ইতোমধ্যে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এবং জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেছে।

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও প্রধান আলোচক মুহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এক্সে লিখেছেন, আমেরিকা এখনও শেখেনি যে দাদাগিরি ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের দিন শেষ। আমি স্পষ্ট করে বলছি: আঘাত করলে, পাল্টা আঘাত পাবেন। হরমুজ প্রণালি কেবল ‘ইরানি ব্যবস্থাপনায়’ খুলবে, আমেরিকার হুমকিতে নয়।

শান্তি আলোচনার ভবিষ্যৎ ও চুক্তি লঙ্ঘন

গত ১৬ জুন পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই দেশ ৬০ দিনের একটি শান্তিপ্রক্রিয়া ও যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সই করেছিল, যার মেয়াদ আগামী ২১ আগস্ট শেষ হওয়ার কথা। এই চুক্তির আওতায় সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ রাখা, হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করা এবং মার্কিন নৌ অবরোধ তুলে নেওয়াসহ ইরানি অর্থ ছাড়ের কথা ছিল। তবে পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, চুক্তির ভাষা অস্পষ্ট হওয়ায় এর ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দাঁড় করাচ্ছে দুই পক্ষই।

উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলছে। ইরান বলছে, যুক্তরাষ্ট্র হামলা পুনরায় শুরু করে এবং লেবাননে ইসরায়েলি দখলদারত্ব না থামিয়ে চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটনের অভিযোগ, ইরান জাহাজ চলাচলের নিরাপদ পথ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চুক্তির ৫ নম্বর ধারা, যা হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ-সংক্রান্ত, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় বিরোধের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই রুট দিয়ে পরিবাহিত হয়। গত ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া মার্কিন-ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধের পর থেকে তেহরান এই প্রণালিকে আলোচনার টেবিলে কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে। তবে ওয়াশিংটন যদি এই শান্তিপ্রক্রিয়া টিকিয়ে রাখতে চায়, তবে তাদের ‘একতরফা জয়’ এর মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সূত্র: আল জাজিরা