ইরানের রাজধানী তেহরানে অবস্থিত মিলাদ টাওয়ারের একটি দৃশ্য। ১৫ জুন ২০২৬ছবি: রয়টার্স। তেহরানে বিনিয়োগ উৎসাহিত করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান রূপরেখা চুক্তিতে ৩০ হাজার কোটি ডলারের একটি বেসরকারি তহবিল গঠনের পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। এরই মধ্যে ওই তহবিলের অর্ধেকের বেশি অর্থ সংগ্রহের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। চুক্তি সম্পর্কে সরাসরি অবগত একটি সূত্র রয়টার্সকে এমন তথ্য নিশ্চিত করেছে।
সূত্রটি বলেছে, উভয় পক্ষকে একটি স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য অর্থনৈতিক প্রণোদনা দেওয়াটা এ তহবিল গড়ার উদ্দেশ্য। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, পরিকল্পনাটি এখনো ঘোষণা করা হয়নি। কারণ, ওয়াশিংটন ও তেহরান আগামী শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনী ইরানে আকস্মিক আগ্রাসন চালানোর পর যুদ্ধ শুরু হয়। গত রোববার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তারা বলেছেন, তাঁরা যুদ্ধ অবসানের জন্য একটি চুক্তির রূপরেখায় সম্মত হয়েছেন। সমঝোতার আওতায় ইরানের বন্দরের ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ প্রত্যাহার এবং বিশ্বে তেল ও গ্যাস সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত আছে।
সূত্রটি আরও বলেছে, নতুন এ তহবিল কোনো পুনর্গঠন বা ক্ষতিপূরণ কর্মসূচির আওতায় গঠিত হচ্ছে না। এটি পুরোপুরিভাবে একটি বেসরকারি বিনিয়োগ তহবিল। এতে সরকারের কোনো অনুদান থাকবে না। বরং যুক্তরাষ্ট্র, উপসাগরীয় আরব দেশ, এশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকার বিভিন্ন কোম্পানি এ তহবিলে অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জ্যেষ্ঠ এক ইরানি সূত্র বলেছে, যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতির জন্য ইরান প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৪০ হাজার কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করেছিল। তবে ওয়াশিংটন স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয়, তারা এমন কোনো ক্ষতিপূরণ দেবে না।
ইরানের রাজধানী তেহরানে অনুষ্ঠিত এক সমাবেশে এক নারী ইরানের পতাকা হাতে ধরে আছেন। ২৯ এপ্রিল ২০২৬।ছবি: রয়টার্স। এরপরই ‘রিকনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফান্ড’ নামে নতুন একটি তহবিল গঠনের ধারণা সামনে আসে।
ইরানি সূত্রটি বলেছে, এ ব্যবস্থার আওতায় আঞ্চলিক দেশগুলো বিভিন্নভাবে অবদান রাখবে। এর মধ্যে আছে ঋণের নিশ্চয়তা দেওয়া, ঋণসুবিধার ব্যবস্থা করা অথবা যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর পুনর্গঠনে সরাসরি অর্থায়ন করা। ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর মধ্যে আছে মোবারাকেহ স্টিল কোম্পানির ইস্পাত কারখানা, তেল শোধনাগার, বিমানবন্দরসহ আরও কিছু অবকাঠামো।
মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বড় অর্থনীতির দেশ হওয়া সত্ত্বেও গত চার দশকে ইরানে বিদেশ থেকে সরাসরি বিনিয়োগ খুব কম এসেছে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ধারাবাহিক নিষেধাজ্ঞার ফলে দেশটি কার্যত বৈশ্বিক পুঁজিবাজার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুতের দিক থেকে ইরানের অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয়। আর তেলের মজুতের দিক থেকে দেশটির অবস্থান চতুর্থ। ইরানে ৯ কোটি ২০ লাখের বেশি তরুণ ও শিক্ষিত জনসংখ্যা আছে। এ ছাড়া পেট্রোকেমিক্যাল, খনিজ সম্পদ, পর্যটন, কৃষিসহ বিভিন্ন খাতে দেশটির উল্লেখজনক সম্ভাবনাও আছে।
বিনিয়োগ তহবিলটি যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বিদেশে জব্দ থাকা ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্পদ মুক্ত করার বিষয়ে চলমান সমান্তরাল আলোচনা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। সূত্রটি এটিকে দুটি পৃথক আর্থিক ব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করেছে, যেগুলোর উদ্দেশ্য ও সময়সূচি ভিন্ন।
সূত্র বলেছে, চূড়ান্ত ও সন্তোষজনক চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত এ তহবিল গঠন করা এবং কার্যকর হবে না। সূত্রটি আরও বলেছে, ‘চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরই এটি গঠন করা হবে। এই ৬০ দিনের মধ্যে তহবিলের প্রশাসকেরা ইরানি পক্ষ ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে কাজ করে প্রকল্পসংক্রান্ত পরিকল্পনা ও এর পরিধি নির্ধারণ করবেন।’
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিনিয়োগ তহবিল–সংক্রান্ত চুক্তিতে মধ্যস্থতা করেছে। এ ব্যাপারে এ দুই মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য জানার চেষ্টা করেছিল রয়টার্স। তবে তারা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো জবাব দেয়নি।
হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র গত সোমবার সিবিএসকে জেডি ভ্যান্সের দেওয়া এক সাক্ষাৎকারের কথা উল্লেখ করেছেন। ওই সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স বলেছেন, ইরান যদি ওয়াশিংটনের সঙ্গে চুক্তির শর্ত মানে, তাহলে তারা উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থায়নে গঠিত ৩০ হাজার কোটি ডলারের পুনর্গঠন তহবিলে প্রবেশাধিকার পেতে পারে। চুক্তির শর্তের মধ্যে আছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ধ্বংস করা এবং কঠোর পরিদর্শন ও বাস্তবায়নব্যবস্থায় সম্মত হওয়া।
সূত্রটি আরও বলেছে, এ তহবিল কীভাবে পরিচালিত হবে বা কারা এটি পরিচালনা করবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। কারণ, এখনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নির্ধারণ করা বাকি আছে।
সূত্র বলেছে, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি কোম্পানি এ তহবিলে বিনিয়োগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে এ–সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে সূত্র।
৬০ দিনের সমঝোতা স্মারকটি কোনো চূড়ান্ত চুক্তি নয়; বরং একটি রূপরেখা। এ সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচকেরা একাধিক বিষয় নিয়ে কাজ করবেন। এর মধ্যে আছে পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয়।



