কেবল বিমান হামলায় যুদ্ধ জয় অসম্ভব: ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন ব্যর্থতার ইতিহাস
কেবল বিমান হামলায় যুদ্ধ জয় অসম্ভব: ইরানে মার্কিন ব্যর্থতা

গত ফেব্রুয়ারিতে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিল, তখন তাদের পরিকল্পনা ছিল অত্যন্ত সহজ: ইরানের ওপর এমনভাবে বোমাবর্ষণ করা যেন দেশটির জনগণ ক্ষুব্ধ হয়ে সরকারের পতন ঘটায় অথবা বর্তমান সরকার আমেরিকার সব দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু খুব দ্রুতই এটি স্পষ্ট হয়ে যায় যে, এর কোনোটিই ঘটছে না। ইরানের জনগণ তাদের শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেনি; বরং দেশটির সরকার উল্টো হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়ে এই বাজি ধরেছিল যে, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো কোনো স্থল আক্রমণ বা তাদের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে আঘাত হানবে না। এর মধ্য দিয়ে মার্কিন যুদ্ধ পরিকল্পনাকারীরা একটি অত্যন্ত স্পষ্ট এবং সাধারণ ভুল করে বসেছেন: তারা ধরে নিয়েছিলেন যে, কেবল আকাশপথের বা বিমান হামলা দিয়েই একটি যুদ্ধে জয়লাভ করা সম্ভব।

কেবল বিমান হামলায় যুদ্ধ জয়ের ঐতিহাসিক ভুল

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি ও যুক্তরাজ্যের সামরিক তাত্ত্বিকেরা এই ধারণার পক্ষে ছিলেন যে, বিমান শক্তি সেনাবাহিনী বা নৌবাহিনীর প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দেয় বা পুরোপুরি দূর করে। তাদের মূল তত্ত্ব ছিল, একচেটিয়াভাবে কেবল বোমারু বিমান এবং বোমাবর্ষণ অভিযানের মাধ্যমেই যুদ্ধ জেতা সম্ভব। ১৯২১ সালে প্রকাশিত 'ইল দোমিনিও দেল আরিয়া' বইয়ে ইতালীয় জেনারেল গিউলিও দুহেত যুক্তি দিয়েছিলেন, যে দেশ প্রথমে আকাশে আধিপত্য বিস্তার করতে পারবে, তারা শত্রুর শহরগুলোকে পুড়িয়ে ছাই করে দিয়ে তাদের আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করতে পারবে। রয়্যাল এয়ার ফোর্সের জনক হিসেবে পরিচিত মার্শাল হিউ ট্রেনচার্ডও মনে করতেন, বিমান শক্তি পদাতিক বাহিনীকে কেবল কৌশলগত সহায়তা দেওয়ার চেয়ে শত্রুর লড়াই করার মানসিক ইচ্ছাকেই ভেঙে দিতে পারে। একইভাবে মার্কিন স্ট্র্যাটেজিক বোম্বিংয়ের প্রবক্তা জেনারেল কার্টিস লেমে বিশ্বাস করতেন, পর্যায়ক্রমে আক্রমণের তীব্রতা না বাড়িয়ে শুরুতেই চরম ও কেন্দ্রীভূত শক্তি প্রয়োগ করে ধ্বংসাত্মক আঘাত হানাই যুদ্ধ জয়ের সর্বোত্তম উপায়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তবে ইতিহাস বলছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বা তার পরবর্তী সময়ে বোমাবর্ষণের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ জয়ের এই তত্ত্বগুলো মারাত্মকভাবে ব্যর্থ হয়েছে। লন্ডনে জার্মানির ব্লিৎজ হামলা ব্রিটিশ জনগণকে আত্মসমর্পণ করাতে পারেনি। জার্মানিতে মিত্রবাহিনীর ব্যাপক বোমাবর্ষণও নাৎসিদের লড়াইয়ের ইচ্ছা ভাঙতে পারেনি; বরং জার্মানির চূড়ান্ত পতনের পেছনে রেড আর্মির হাতে বন্দি হওয়ার ভয় এবং আমেরিকানদের কাছে আত্মসমর্পণের সুযোগ বেশি কাজ করেছিল। জাপানের ক্ষেত্রেও নৌ অবরোধ এবং শহরগুলোতে ক্রমাগত অগ্নিকুণ্ড তৈরি করার পরও তারা আত্মসমর্পণ করেনি; বরং হিরোশিমা-নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা হামলা এবং মাঞ্চুরিয়াতে সোভিয়েত আগ্রাসনের পরই তারা নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ভিয়েতনাম ও উপসাগরীয় যুদ্ধের শিক্ষা

ভিয়েতনামের ক্ষেত্রেও মার্কিন স্ট্র্যাটেজিক বোম্বিং ব্যর্থ হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপ ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ফেলা মোট ২৭ লাখ টন বোমার বিপরীতে ভিয়েতনামে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৭৬ লাখ টন বোমা ফেলেছিল। কিন্তু ১৯৭২ সালের 'ক্রিসমাস বোম্বিং' উত্তর ভিয়েতনামকে আমেরিকার অনুকূলে চুক্তি করতে রাজি করাতে পারেনি; বরং ১৯৭৩ সালের প্যারিস শান্তি চুক্তি ছিল মূলত যুদ্ধ নিয়ে আমেরিকার নিজস্ব ক্লান্তির ফসল, যা পরবর্তীতে ১৯৭৪-৭৫ সালে উত্তর ভিয়েতনামের দক্ষিণ অংশ দখলের পথ সুগম করে।

১৯৯০-এর দশকে গণহারে নিখুঁত বোমাবর্ষণের যুগে অনেক বিশ্লেষক ভেবেছিলেন যুদ্ধের নিয়ম বদলে গেছে এবং কেবল বিমান শক্তিই জয়ের জন্য যথেষ্ট। কিন্তু বাস্তবে তা ছিল না। প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধ শেষ হয়েছিল মার্কিন স্থল সেনারা কুয়েতে ১০০ ঘণ্টার একটি সফল অভিযান চালানোর পর। ১৯৯৯ সালে সার্বিয়ায় স্লোবোদান মিলোশেভিচের ন্যাটো বাহিনীর দাবি মেনে নেওয়ার পেছনে ছিল তার শাসন টিকিয়ে রাখার ভয় এবং স্থল আক্রমণের একটি বিশ্বাসযোগ্য হুমকি। আফগানিস্তানেও মার্কিন বিমান অভিযান সফল হয়েছিল কারণ মাটিতে নর্দার্ন অ্যালায়েন্স-এর মতো মিত্র বাহিনী জমি দখল ও তা ধরে রাখার জন্য লড়াই করছিল। অর্থাৎ, প্রতিটি ক্ষেত্রেই মাটিতে সেনা উপস্থিতি বা তার বিশ্বাসযোগ্য হুমকি ছিল।

র‍্যান্ড কর্পোরেশনের সতর্কতা

১৯৯৬ সালে মার্কিন বিমান অভিযানের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে র‍্যান্ড কর্পোরেশন-এর একটি গবেষণায় নেতাদের সতর্ক করে বলা হয়েছিল, অন্যান্য বাহ্যিক উপাদান অনুকূলে না থাকলে কেবল বিমান শক্তির পক্ষে শত্রুকে অনুকূল শর্তে আত্মসমর্পণ করানো অসম্ভব। সেই বাহ্যিক উপাদানগুলোর মধ্যে রয়েছে: শত্রুর মনে এই বিশ্বাস জন্মানো যে তারা যুদ্ধক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবে পরাজিত হবে, লড়াই চালিয়ে গেলেও পরিস্থিতির উন্নতি হবে না, বোমার ক্ষয়ক্ষতির চেয়ে ছাড় দেওয়া ভালো এবং কোনো কার্যকর পাল্টা আক্রমণ বা প্রতিরোধ গড়ে তোলার আশা না থাকা।

ইরানের ক্ষেত্রে কেন ব্যর্থ হলো মার্কিন কৌশল?

ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকার যুদ্ধ পরিকল্পনা শুরু থেকেই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে বাধ্য ছিল, কারণ এটি এমন এক বিমান অভিযানের ওপর নির্ভর করেছিল যার পেছনে কোনো বাহ্যিক অনুকূল উপাদান ছিল না। ইরানি সরকারকে উৎখাত করার মতো কোনো বৃহৎ স্থল অভিযানের বিশ্বাসযোগ্য হুমকি যুক্তরাষ্ট্রের ছিল না। ফলে অভ্যন্তরীণ বিপ্লব ছাড়া তাদের আর কোনো পথ খোলা ছিল না। যুক্তরাষ্ট্র এমন কোনো ব্যাপক প্রাণহানি বা মানবিক বিপর্যয় তৈরি করতেও রাজি ছিল না, যা দেখে ইরানিরা মনে করত যে প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়ার চেয়ে আত্মসমর্পণ করা শ্রেয়। ট্রাম্প প্রশাসন সাধারণত ইরানের পানি ও বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং যোগাযোগের স্থলপথের (সেতু ও রেলপথ) মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা এড়িয়ে গেছে। এমনকি ইরানের অধিকাংশ অবকাঠামো স্থায়ীভাবে অচল করে দিতে একটি পারমাণবিক তড়িৎ-চৌম্বকীয় পালস অস্ত্রের মতো চরম কোনো পদক্ষেপ নিতেও তারা রাজি ছিল না।

সার্বিয়া বা আফগানিস্তানের মতো না হয়ে ইরানের পাল্টা আঘাত করার এবং যুক্তরাষ্ট্রকে বড় ধরনের বেদনাদায়ক পরিস্থিতির মুখোমুখি করার সক্ষমতা ছিল। ইরান শুরু থেকেই বুঝতে পেরেছিল যে, হরমুজ প্রণালি বন্ধের ধকল কে কতটা সহ্য করতে পারছে, তার ওপরই যুদ্ধের ফলাফল নির্ভর করবে। ফলে শুরু থেকেই তাদের জয়ের একটি সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট তত্ত্ব ছিল এবং পুরো সংঘাতজুড়ে তারা যৌক্তিকভাবে ও ধারাবাহিকভাবে তা অনুসরণ করেছে।

মার্কিন নেতৃত্বের ভুল মূল্যায়ন

মার্কিন সামরিক বাহিনীর জ্যেষ্ঠ নেতারা দশকের পর দশক ধরে যুদ্ধের প্রতিটি দিক নিয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং তারা অবশ্যই একটি দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকি বুঝতে পেরেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে, জেনারেল ড্যান কেইন ট্রাম্প প্রশাসনকে ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণ না করার জন্য সতর্ক করেছিলেন বলে জানা গেছে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এই সতর্কতার প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করতে পারেননি। হেগসেথ মূলত একজন জুনিয়র অফিসার হিসেবে মাঠপর্যায়ে কাজ করায় তার অভিজ্ঞতা ছিল কেবল কৌশলগত স্তরে। তিনি মনে করেন, সুচিন্তিত কৌশলের চেয়ে প্রযুক্তিগত ক্ষমতা এবং শারীরিক শক্তিই যুদ্ধ জয় নিশ্চিত করে। মাঠপর্যায়ের একজন আর্মি ক্যাপ্টেনের কাছে একটি বাড়ির ওপর ২,০০০ পাউন্ডের বোমা ফেলাকে সাময়িক সংকটের সমাধান মনে হতে পারে; কিন্তু একজন উচ্চপদস্থ ফ্ল্যাগ অফিসার ভালো করেই জানেন যে, এই এক বোমা আগামী সপ্তাহে আরও ১০০ জন নতুন শত্রু তৈরি করার ঝুঁকি রাখে।

এই ত্রুটিপূর্ণ যুদ্ধ প্রচেষ্টার পরিণতি আমেরিকার জন্য বিপর্যয়কর হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রাগার ফুরিয়ে গেছে, তাদের সামরিক সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে, বৈদেশিক সম্পর্কগুলো ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে এবং অন্যদিকে ইরানি নেতৃত্ব ইতিহাসের সবচেয়ে সেরা কৌশলগত অবস্থানে পৌঁছে গেছে। 'কেবল বিমান শক্তি দিয়ে যুদ্ধ জেতা যায় না', ইতিহাসের এই পুরোনো পাঠটি নতুন করে শেখার জন্য এটি ছিল একটি অত্যন্ত কঠিন ও চড়া মাশুল।

বিপর্যয়কর ক্ষতি নাকি পয়েন্টে জয়?

তবে এই যুদ্ধ নিয়ে একটি ভিন্ন ও বিপরীত মন্তব্যও রয়েছে। ফরেন পলিসি'র কলামিস্ট এবং আটলান্টিক কাউন্সিলের স্কোক্রফট সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড সিকিউরিটির সিনিয়র ডিরেক্টর ম্যাথু ক্রোয়েনিগ বলেন, একটি উদীয়মান প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী মনে করা হচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধে একটি বিপর্যয়কর পরাজয়ের শিকার হয়েছে এবং ইরানের সঙ্গে তাদের সমঝোতা স্মারকটি ভিয়েতনামের চেয়েও খারাপ এবং ১৯৫৬ সালে সুয়েজ সংকটে যুক্তরাজ্যের লজ্জাজনক পরাজয়ের সমতুল্য। ক্রোয়েনিগের মতে, এই ধারণাটি একটি ভুল ও অতিরঞ্জিত বিষয়।

ক্রোয়েনিগ যুক্তি দেন, এটা ঠিক যে যুক্তরাষ্ট্র ইসলামিক রিপাবলিকের বিরুদ্ধে কোনো চূড়ান্ত আঘাত হানতে পারেনি, কিন্তু বক্সিংয়ের রূপক ব্যবহার করে বলা যায়, আমেরিকা মূলত 'পয়েন্টে জিতেছে'। তিনি উল্লেখ করেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু করে বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর একের পর এক ভারী আঘাত হেনেছে। তাদের পরিচালিত 'অপারেশন এপিক ফিউরি' ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, প্রচলিত সামরিক বাহিনী, প্রতিরক্ষা শিল্প ঘাঁটি এবং নেতৃত্বকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত অধিকাংশ লক্ষ্যই সফলভাবে অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।

সূত্র: ফরেন পলিসি, দ্য আটলান্টিক