গাজা ইস্যুতে যুক্তরাজ্যের ইসরাইলপন্থী নীতিতে ফাটল: বার্নহামের ক্ষমা
গাজায় যুক্তরাজ্যের নীতিতে ফাটল: বার্নহামের ক্ষমা

যুক্তরাজ্যের হবু প্রধানমন্ত্রী ও লেবার পার্টির নেতা অ্যান্ডি বার্নহাম গাজা যুদ্ধে তার দলের পূর্ববর্তী অবস্থানের জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়েছেন এবং ইসরাইলের ওপর চাপ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে বিশ্লেষকরা এই আকস্মিক নীতিগত পরিবর্তনের আভাসকে সতর্কতার সাথে দেখছেন।

বার্নহামের ক্ষমা প্রার্থনা ও প্রতিশ্রুতি

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় ৫৬ বছর বয়সি বার্নহাম গাজায় দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা ইসরাইলি বোমাবর্ষণকে 'সম্মিলিত বিবেকের ক্ষত' হিসেবে আখ্যা দেন। তিনি স্বীকার করেন যে যুদ্ধের শুরুতে লেবার পার্টি সঠিক অবস্থান নিতে পারেনি এবং যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানাতে যুক্তরাজ্যের অনেক দেরি হয়েছে। তবে তিনি ইসরাইলের এই সামরিক অভিযানকে সরাসরি 'গণহত্যা' বলতে অস্বীকৃতি জানান।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও নেতৃত্ব পরিবর্তন

সম্প্রতি মে মাসের শোচনীয় নির্বাচনী ফলাফল ও জনপ্রিয়তা হ্রাসের মুখে প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার পদত্যাগ করায় লেবার পার্টিতে নতুন নেতৃত্বের প্রক্রিয়া শুরু হয়। বার্নহামের বিপরীতে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় চলতি জুলাই মাসের শেষ নাগাদ তিনি যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন বলে নিশ্চিত ধারণা করা হচ্ছে। সাবেক এই ম্যানচেস্টার মেয়র গত জুনে মেকারফিল্ড উপ-নির্বাচনে জিতে পুনরায় পার্লামেন্টে ফিরেছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

হতাহতের পরিসংখ্যান ও দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলি হামলায় গাজায় এ পর্যন্ত ৭৩,০০০-এরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে তথাকথিত যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও মারা গেছেন ১,০০০-এর বেশি মানুষ। অন্যদিকে ৭ অক্টোবরের হামলায় ইসরাইলেও ১,১০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। বার্নহাম গাজায় ত্রাণ পৌঁছাতে বাধা ও ইসরাইলি দখলদারিত্বের সমালোচনা করেছেন, পাশাপাশি হামাসের হামলার তীব্র নিন্দা এবং যুক্তরাজ্যে ইহুদি-বিদ্বেষ বৃদ্ধির ঘটনাকেও প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার পরিকল্পিতভাবে দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করছে।

গার্হস্থ্য রাজনীতিতে গাজা ইস্যু

যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে গাজা ইস্যু এখন অত্যন্ত সংবেদনশীল। সাম্প্রতিক এক জরিপ বলছে, দেশটির ৫০ শতাংশ মানুষ মনে করে ইসরাইল গাজায় গণহত্যা চালাচ্ছে। কিয়ার স্টারমারের অতিমাত্রায় ইসরাইলপন্থী অবস্থানের কারণে লেবার পার্টি তাদের বামপন্থী ও প্রগতিশীল ভোটারদের বড় একটি অংশ হারিয়েছে, যারা পরবর্তীতে গ্রিন পার্টিতে যোগ দিয়েছেন। লেবার সরকারের সাবেক নীতি উপদেষ্টা প্যাট্রিক ডায়মন্ডের মতে, বার্নহামের এই ক্ষমা প্রার্থনা মূলত ক্ষুব্ধ ভোটারদের ক্ষোভ প্রশমনের একটি রাজনৈতিক চেষ্টা।

নীতি পরিবর্তনের বাস্তব সম্ভাবনা

প্রশ্ন উঠেছে, বার্নহামের এই কড়া বক্তব্য কি বাস্তবে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রনীতিতে বড় কোনো পরিবর্তন আনবে? কুইন মেরি ইউনিভার্সিটির রাজনীতির অধ্যাপক টিম বেল মনে করেন, এই বক্তব্য বাস্তবসম্মত পরিবর্তনের চেয়ে প্রতীকী বেশি। কারণ যুক্তরাজ্য ইতোমধ্যেই ইসরাইল ইস্যুতে তাদের সর্বোচ্চ সীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে।

এছাড়া করবিন আমলের ইহুদি-বিদ্বেষের তকমা থেকে বের হওয়া লেবার পার্টি চাইবে না নেতানিয়াহু সরকারের সমালোচনা করতে গিয়ে ইসরাইলের অস্তিত্বের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠুক। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিশালী মিত্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার চাপও রয়েছে লন্ডনের ওপর।

অস্ত্র সরবরাহ ও নিষেধাজ্ঞা

কিয়ার স্টারমারের আমলে ফিলিস্তিনপন্থী অ্যাকশন গ্রুপ 'প্যালেস্টাইন অ্যাকশন'-কে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল এবং প্রায় ৩,০০০ কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। একই সাথে ইসরাইলের কাছে যুক্তরাজ্যের অস্ত্র বিক্রি পুরোপুরি বন্ধ করা হয়নি। অক্সফাম জানায়, ইসরাইলের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের প্রায় ১৫ শতাংশ যন্ত্রাংশ সরবরাহ করে যুক্তরাজ্য। স্টারমার সরকার কিছু লাইসেন্স স্থগিত করলেও মূল সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রেখেছে। বার্নহাম অবশ্য ব্রিটিশ কোনো অস্ত্র যাতে ইসরাইলি বাহিনী ব্যবহার করতে না পারে, তা নিশ্চিত করার কথা বলেছেন।

বিশ্লেষকদের ভিন্ন মত

চ্যাথাম হাউজের বিশ্লেষক ইয়োসি মেকেলবার্গ অবশ্য ভিন্ন মত পোষণ করেন। তার মতে, ব্রিটিশ ভোটারদের কাছে গাজা ইস্যুর চেয়ে মুদ্রাস্ফীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা ও অভিবাসনের মতো বিষয়গুলো অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের ভিজিটিং ফেলো তাহানি মুস্তফা মনে করেন, বার্নহামের এই অবস্থানকে সতর্কতার সাথে ইতিবাচক হিসেবে দেখা যেতে পারে, তবে নির্বাচনের আগে একে কেবল রাজনৈতিক কৌশল বা ফাঁকা বুলি হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

যতক্ষণ না এই বক্তব্য বাস্তব নীতিতে রূপান্তরিত হচ্ছে, ততক্ষণ যুক্তরাজ্যের দীর্ঘদিনের ইসরাইলপন্থী নীতিতে বড় কোনো পরিবর্তনের আশা করা কঠিন। তবে বার্নহাম যদি সত্যিই ইসরাইলকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে পারেন, তবে তা হবে আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি বড় মাইলফলক।