হরমুজ প্রণালি দিয়ে আবার নৌযান চলাচল শুরু হচ্ছে। তবে জাহাজে হামলা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি এবং সার্ভিস চার্জ বা সম্ভাব্য পরিষেবা শুল্ক নিয়ে একটি নতুন বিতর্কিত ইস্যু সামনে এসেছে। এতে ইঙ্গিত মিলছে, যুদ্ধপূর্ব সময়ের তুলনায় ভবিষ্যতে এই প্রণালি দিয়ে যাতায়াত আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্ববাণিজ্যে হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব
বিশ্ববাণিজ্যের জন্য হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। সাম্প্রতিক যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগের সপ্তাহেও বিশ্বের মোট সমুদ্রবাহিত অপরিশোধিত তেল বাণিজ্যের ৩৮ শতাংশ এই প্রণালি দিয়েই সম্পন্ন হয়েছিল। এর পাশাপাশি ২৯ শতাংশ এলপিজি, এলএনজি ও পরিশোধিত তেল পণ্যের প্রতিটির ১৯ শতাংশ এবং সারসহ রাসায়নিক বাণিজ্যের ১৩ শতাংশ এই রুট দিয়েই পরিবাহিত হতো। কিন্তু হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এর মধ্য দিয়ে নৌ চলাচল ৯০ শতাংশের বেশি কমে যায়।
এই প্রণালি এড়ানোর জন্য সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুটি প্রধান বিকল্প রুট রয়েছে। তবে এই রুট দুটি হরমুজ দিয়ে পরিবাহিত দৈনিক সমুদ্রবাহিত তেলের পরিমাণের অর্ধেকও বহন করতে পারেনি; কেবল কিছু সার, কনটেইনার এবং ড্রাই বাল্ক বাণিজ্যের সংকুলান করতে পেরেছিল।
ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণ
ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, সাম্প্রতিক এই সংকটকে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার মূল কাঠামোগত দ্বন্দ্ব এখনো বিদ্যমান।
এই পরিস্থিতির মধ্যে উপসাগরীয় জ্বালানি ও বাণিজ্য রুটের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুটি প্রধান ধারণা সামনে এসেছে। প্রথমত, জ্বালানি আমদানির জন্য নির্ভরশীল দেশগুলো যেহেতু বিকল্প উৎসের সন্ধান করবে, তাই এই রুটগুলোর গুরুত্ব অনেকটাই কমে যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালিতে আবারও অচলাবস্থা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকায় মধ্য মেয়াদে একটি নতুন বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে, যা সংকটের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করবে।
তবে গভীর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই ধারণাগুলো পুরোপুরি বাস্তবসম্মত না–ও হতে পারে। এই সংকট প্রমাণ করেছে, বিশ্ববাজারে প্রধান প্রধান পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পর বিকল্প সরবরাহকারীরা, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, আংশিকভাবে সরবরাহ বাড়াতে সক্ষম হয়েছিল। এটি সাময়িকভাবে ঘাটতি কমাতে কিছুটা সাহায্য করেছে। কিন্তু উপসাগরীয় অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য বিকল্প অঞ্চলের সরবরাহ কখনোই পূর্ণাঙ্গ বিকল্প হতে পারেনি।
তেল শোধনাগারের সমস্যা
অপরিশোধিত তেলের কথাই ধরা যাক। মে মাসের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র তার সমুদ্রবাহিত নেট রপ্তানি প্রতিদিন প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল বাড়িয়েছিল। কিন্তু এশিয়ার অনেক শোধনাগার এমনভাবে তৈরি, যা কেবল উপসাগরীয় অঞ্চলে উৎপাদিত মিডিয়াম থেকে হেভি-সোয়ার গ্রেডের অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের লাইটার ও সুইটার গ্রেডের তেল ব্যবহার করায় শোধনাগারগুলোর উৎপাদন কমে যায় এবং লাভের মার্জিনও সংকুচিত হয়। এমনকি কোনো শোধনাগার যদি ভিন্ন গ্রেডের তেল পরিশোধন করতে সক্ষমও হয়, তবু দূরবর্তী বাজার থেকে তেল আনার অর্থ হলো—উচ্চ পরিবহনভাড়া, দীর্ঘ সময় এবং অতিরিক্ত বিমা খরচ।
জুনের মধ্যে এশিয়াসহ বিশ্বের শোধনাগারগুলোয় দৈনিক প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল কম পরিশোধিত হচ্ছিল, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে পরিশোধিত পণ্য ও পেট্রোকেমিক্যাল বাজারেও। কারণ, একটি শোধনাগারের পুরো কাঠামো পুনর্বিন্যাস করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ বিষয়।
এলপিজি বাণিজ্যের চিত্র
এলপিজির ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। এশিয়ার আমদানিকারকেরা মার্কিন এলপিজির দিকে ঝুঁকেছিল, কিন্তু মে মাসের শেষের দিকে অতিরিক্ত শিপিং খরচের কারণে তারা বেশ কিছু কার্গো অর্ডার বাতিল করতে বাধ্য হয়। তা ছাড়া ভারতের মতো দেশগুলো, যারা উপসাগরীয় এলপিজির অন্যতম বড় আমদানিকারক, তাদের আবাসিক খাতের জন্য বিউটেন-প্রোপেনের মিশ্রণ প্রয়োজন। কিন্তু মার্কিন এলপিজি ছিল মূলত প্রোপেনপ্রধান, যা রূপান্তর ছাড়া ব্যবহারের অনুপযোগী ছিল। সংক্ষেপে বলা যায়, বিকল্প উৎসের সন্ধান কিছুটা বাড়লেও অদূর ভবিষ্যতে উপসাগরীয় অঞ্চলের ওপর থেকে নির্ভরশীলতা বড় পরিসরে কমিয়ে আনা যতটা সহজ ভাবা হচ্ছে, বাস্তবে তা অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং।
পাইপলাইন প্রকল্প
হরমুজ সংকটের প্রতিক্রিয়া হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাত ইতিমধ্যে তাদের দ্বিতীয় অপরিশোধিত তেল পাইপলাইনের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে নিচ্ছে। আগামী বছরের মধ্যেই এটি সম্পন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর দৈনিক ক্ষমতা হবে ১৫ থেকে ২০ লাখ ব্যারেল। দেশটি একটি মাল্টিফুয়েল পাইপলাইন তৈরিরও পরিকল্পনা করছে, যা পেট্রল, ডিজেল ও জেট ফুয়েল পরিবহনে সক্ষম হবে।
এদিকে সৌদি আরব তাদের দৈনিক ১ কোটি ২ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানির জন্য পাইপলাইনের ক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্পগুলো খতিয়ে দেখছে। একই সঙ্গে সৌদি আরামকো বিশ্বজুড়ে তাদের তেল মজুত রাখার ক্ষমতা বৃদ্ধির কথা ভাবছে। কুয়েতও দেশের বাইরে তেল মজুতের ক্ষমতা বাড়ানোর কথা চিন্তা করছে এবং সৌদি ও ইউএইয়ের সঙ্গে যৌথ অংশীদারত্বের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে। ইরাক ইতিমধ্যে দেশের অভ্যন্তরে বসরা ও হাদিসাকে যুক্ত করে একটি তেল পাইপলাইনের কাজ শুরু করেছে, যা ভবিষ্যতে জর্ডান, সিরিয়া ও তুরস্কের সঙ্গে যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে।
যদিও এই প্রকল্পগুলো অত্যন্ত ব্যয়বহুল, তবু বিশ্লেষকেরা বলছেন, এখন আর এগুলো কেবল ‘কাগজে-কলমে’ নেই, বরং ‘বাস্তবে রূপ নিতে’ শুরু করেছে। স্বল্প থেকে মধ্য মেয়াদে বিদ্যমান পাইপলাইন নেটওয়ার্কগুলোর সম্প্রসারণ বাস্তব রূপ পেতে পারে; পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশগুলো বিদেশে তাদের তেল মজুতের ক্ষমতাও বৃদ্ধি করতে পারে। এর সঙ্গে ২০২৭ সালের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের নতুন পাইপলাইনটি চালু হওয়ার সম্ভাবনা তো রয়েছেই।
বিকল্প ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা
তেলের বাইরে ২০৩০ সালের মধ্যে জিসিসিভুক্ত ছয়টি দেশকে যুক্তকারী রেলওয়ে প্রকল্পটি পুরোপুরি চালু হওয়ার কথা রয়েছে। তবে কিছু রুট এর আগেই চালু হতে পারে, যা উপসাগরীয় দেশগুলোয় আমদানি এবং তেলবহির্ভূত পণ্য রপ্তানিতে সুবিধা দেবে। এই সংকটকালে উপসাগরীয় দেশগুলোয় পণ্য আমদানির জন্য লোহিত সাগরের বন্দরগুলোর সঙ্গে যুক্ত ট্রাক পরিবহনব্যবস্থার কার্যকারিতাও প্রমাণিত হয়েছে। ফলে এ ধরনের ব্যবস্থার জন্য সহায়ক অবকাঠামো আরও উন্নত করা যেতে পারে।
তবে এই উদীয়মান বিকল্প ব্যবস্থারও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা সব দেশ বা সব ধরনের বাণিজ্যকে সমানভাবে সুরক্ষা দেবে না। যেমন কাতার এলএনজি নিয়ে নতুন কোনো পরিকল্পনা ঘোষণা করেনি। যদিও বেশ কিছু আন্তদেশীয় গ্যাস পাইপলাইনের প্রস্তাব পুনরুজ্জীবিত হয়েছে, তবে বহুজাতিক প্রক্রিয়ার জটিলতার কারণে এগুলো বাস্তবায়ন করতে বেশ কয়েক বছর সময় লেগে যাবে। আর্থিক খাতের বাইরেও এসব প্রকল্পে পাইপলাইন পরিচালনা ও গ্যাস সরবরাহের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রাজনৈতিক জটিলতা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। ফলে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে গেলে এসব জটিল প্রকল্প বাস্তবায়নের আগ্রহ কমে যেতে পারে। দ্বিতীয়ত এবং সবচেয়ে বড় কথা—এ যুদ্ধ প্রমাণ করেছে, বিকল্প রুটগুলোও পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়।
পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণ
পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন না আনলে অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণের উদ্যোগগুলোও ঝুঁকির মুখে পড়বে। কারণ, সাম্প্রতিক যুদ্ধ দেখিয়েছে, ডেটা সেন্টার, বিমানবন্দর কিংবা পর্যটন ও আতিথেয়তা খাতের মতো বেসামরিক স্থাপনাগুলোকেও এখন কৌশলগত লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য মূল শিক্ষা হলো অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়ানো এবং বিকল্প জ্বালানিতে বিনিয়োগ করা। কারণ, সংকটের সামান্য আশঙ্কাতেই জ্বালানির দাম চড়ে যেতে পারে, যা সীমিত সম্পদের দেশগুলোর আমদানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দেয়। সর্বোপরি ভবিষ্যতে অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বা চোকপয়েন্টও যে যুদ্ধের অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে, সে আশঙ্কাকে কোনোভাবেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
লেখক: জাহরা নিয়াজি, ইসলামাবাদকেন্দ্রিক গবেষক। মিডলইস্ট মনিটর থেকে অনূদিত।



