এক দশকে যুক্তরাজ্যে ছয় প্রধানমন্ত্রী: ক্যামেরন থেকে স্টারমারের বিদায়ের কারণ
এক দশকে যুক্তরাজ্যে ছয় প্রধানমন্ত্রী: ক্যামেরন থেকে স্টারমার

গত এক দশকে যুক্তরাজ্যের রাজনীতি অভূতপূর্ব অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গেছে। ২০১৬ সালে ব্রেক্সিট গণভোটের পর থেকে দেশটি ছয়জন প্রধানমন্ত্রী দেখেছে। দীর্ঘ সময় ধরে স্থিতিশীল নেতৃত্বের জন্য পরিচিত ব্রিটিশ রাজনীতিতে এত ঘন ঘন নেতৃত্ব পরিবর্তন বিরল ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ২০১৬ সালে ডেভিড ক্যামেরনের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই ধারাবাহিকতায় ক্ষমতায় এসেছেন থেরেসা মে, বরিস জনসন, লিজ ট্রাস, ঋষি সুনাক এবং কিয়ার স্টারমার।

ডেভিড ক্যামেরনের পদত্যাগ ও ব্রেক্সিটের প্রভাব

২০১০ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ২০১৬ সালে ব্রেক্সিট গণভোটে ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছিলেন। কিন্তু গণভোটে ব্রিটিশ জনগণ ইইউ ত্যাগের পক্ষে রায় দিলে রাজনৈতিক দায় স্বীকার করে তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দেন। তার মতে, ব্রেক্সিট বাস্তবায়নের জন্য নতুন নেতৃত্ব প্রয়োজন ছিল।

থেরেসা মে ও বরিস জনসনের সময়কাল

ক্যামেরনের উত্তরসূরি হন থেরেসা মে। তিনি ব্রেক্সিট কার্যকর করার দায়িত্ব নিলেও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে করা তার চুক্তি বারবার ব্রিটিশ পার্লামেন্টে প্রত্যাখ্যাত হয়। দীর্ঘ রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং নিজ দলের ভেতর থেকে ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে ২০১৯ সালে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এরপর প্রধানমন্ত্রী হন বরিস জনসন। ‘গেট ব্রেক্সিট ডান’ স্লোগানে তিনি বিপুল জনসমর্থন পান এবং ব্রেক্সিট বাস্তবায়ন করেন। তবে কোভিড-১৯ মহামারির সময় সরকারি কার্যালয়ে লকডাউন ভঙ্গ করে পার্টি আয়োজনের অভিযোগ, যা ‘পার্টিগেট’ নামে পরিচিত, এবং একের পর এক মন্ত্রী ও সহযোগীর পদত্যাগ তার সরকারের ভিত্তি নড়িয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত নিজ দলের আস্থা হারিয়ে ২০২২ সালে পদত্যাগ করেন জনসন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

লিজ ট্রাসের সংক্ষিপ্ত মেয়াদ

জনসনের পর ক্ষমতায় আসেন লিজ ট্রাস। কিন্তু তার মেয়াদ ছিল ব্রিটিশ ইতিহাসের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত প্রধানমন্ত্রিত্বগুলোর একটি। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি কর কমানো ও ব্যাপক ঋণনির্ভর অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ঘোষণা করেন, যা বাজারে তীব্র অস্থিরতা সৃষ্টি করে। পাউন্ডের দর পড়ে যায় এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট হয়। নিজ দলের সমর্থন হারিয়ে মাত্র ৪৫ দিনের মাথায় তিনি পদত্যাগ করেন।

ঋষি সুনাক ও কিয়ার স্টারমারের বিদায়

ট্রাসের বিদায়ের পর কনজারভেটিভ পার্টির নেতা হয়ে প্রধানমন্ত্রী হন ঋষি সুনাক। তিনি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করলেও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, অভিবাসন সংকট, স্বাস্থ্যসেবা খাতের চাপ এবং কনজারভেটিভ সরকারের প্রতি জনঅসন্তোষ কাটিয়ে উঠতে পারেননি। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে তার দল বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়ে এবং নির্বাচনে হেরে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়েন।

সেই নির্বাচনে ভূমিধস জয় পেয়ে ক্ষমতায় আসেন লেবার পার্টির নেতা কিয়ার স্টারমার। কিন্তু দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে তাকেও বিদায়ের ঘোষণা দিতে হয়েছে। সাম্প্রতিক স্থানীয় নির্বাচনে লেবারের খারাপ ফল, দলের অভ্যন্তরে নেতৃত্ব নিয়ে অসন্তোষ, জনসমর্থন হ্রাস, নীতিগত ইউ-টার্ন এবং নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন রিফর্ম ইউকের উত্থানের ফলে স্টারমারের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত দলীয় সমর্থন হারিয়ে তিনি আজ সোমবার (২২ জুন) পদত্যাগের ঘোষণা দেন এবং নেতৃত্ব পরিবর্তনের পথ উন্মুক্ত করেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতামত

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ব্রেক্সিট-পরবর্তী বিভাজন, কনজারভেটিভ ও লেবার—উভয় দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, অর্থনৈতিক সংকট এবং ভোটারদের দ্রুত পরিবর্তিত প্রত্যাশা যুক্তরাজ্যে নেতৃত্বের এই ঘন ঘন পরিবর্তনের অন্যতম কারণ। ২০১৬ সালে ডেভিড ক্যামেরনের বিদায়ের পর থেকে ২০২৬ সালে কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগ পর্যন্ত মাত্র এক দশকে ছয়জন প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তনের ঘটনা ব্রিটিশ রাজনীতির অস্থির এক অধ্যায়ের প্রতীক হয়ে উঠেছে। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, বিবিসি।