সৌদি আরব ও কানাডা দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি এবং দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ উন্নয়ন ও সুরক্ষা চুক্তি সম্পাদনের লক্ষ্যে আলোচনা শুরু করতে সম্মত হয়েছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সৌদি আরবে সরকারি সফর শেষে প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে এই তথ্য জানানো হয়।
দ্বৈত কর পরিহার ও বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তি
বিবৃতিতে বলা হয়, দুই দেশ দ্বৈত কর পরিহার চুক্তির বিষয়ে আলোচনা শুরু করতে সম্মত হয়েছে। পাশাপাশি, ২০২৭ সালের শুরুর দিকে দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ উন্নয়ন ও সুরক্ষা চুক্তি সম্পাদনের দিকে অগ্রগতির বিষয়টিকেও স্বাগত জানানো হয়েছে। বড় ধরনের কৌশলগত প্রকল্পগুলোতে অর্থায়নের জন্য নিজেদের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করতেও দুপক্ষ সম্মত হয়েছে।
বিনিয়োগ সম্মেলন ও কানাডীয় বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ
সৌদি আরবে নতুন সুযোগ সন্ধানে কানাডীয় বিনিয়োগকারীদের প্রবল আগ্রহকে স্বাগত জানিয়েছে রিয়াদ। অন্যদিকে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে টরন্টোতে অনুষ্ঠেয় কানাডার প্রথম 'ইনভেস্টমেন্ট সামিট'-এ সৌদি বিনিয়োগকারীদের অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছে অটোয়া।
সৌদি-কানাডীয় সমন্বয় পরিষদ গঠন
৮ থেকে ১০ জুলাই কানাডীয় প্রধানমন্ত্রীর সরকারি সফরকালে সৌদি আরবের যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান এবং প্রধানমন্ত্রী কার্নির মধ্যকার বৈঠকের পর এই যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। দুই নেতা দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তোলার প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। রাজনীতি, প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা, অর্থনীতি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সংস্কৃতি, শিক্ষা, বিজ্ঞান ও কনস্যুলার বিষয়ে সহযোগিতা এগিয়ে নিতে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের যৌথ সভাপতিত্বে ‘সৌদি-কানাডীয় সমন্বয় পরিষদ’ গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়। কৌশলগত খাতগুলোতে সহযোগিতা সম্প্রসারণে একটি 'যৌথ কর্মপরিকল্পনা দলিল' উন্মোচন করা হয়েছে, যা ওই পরিষদের রূপরেখা হিসেবে কাজ করবে।
বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তি
২০২০ সাল থেকে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ২ হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়েছে বলে উল্লেখ করে দুপক্ষই পারস্পরিক বিনিয়োগকে আরও উৎসাহিত করা, তেলবহির্ভূত বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে সহায়তা করার বিষয়ে একমত হয়েছে। নেতৃবৃন্দ 'সৌদি-কানাডীয় ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম'-কে স্বাগত জানিয়েছেন, যেখানে খনিজ, প্রকৌশল, অবকাঠামো, উন্নত শিল্প, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, আর্থিক পরিষেবা এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি খাতে বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক ও বিনিয়োগ চুক্তির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি ও খনিজ খাতে সহযোগিতা
জ্বালানি খাতে সহযোগিতা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগের বিষয়ে সমঝোতা স্মারক সই হওয়াকেও স্বাগত জানানো হয়। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), নবায়নযোগ্য জ্বালানি, হাইড্রোজেন, কার্বন ব্যবস্থাপনা, সাইবার নিরাপত্তা, উদ্ভাবন এবং সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখার বিষয়ে সহযোগিতার সুযোগ তুলে ধরা হয়। বিবৃতিতে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে স্বাক্ষর হওয়া এক সমঝোতা স্মারকের ওপর ভিত্তি করে খনিজ ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের পরিকল্পনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ করা হয়, সৌদি আরবের শিল্প ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দেওয়া অনুসন্ধান লাইসেন্সগুলোর সবচেয়ে বড় অংশটি কানাডীয় কোম্পানিগুলোর হাতে রয়েছে।
প্রতিরক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় সহযোগিতা
দুই দেশ প্রতিরক্ষা, সাইবার নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ দমন এবং আন্তর্জাতিক সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে সহযোগিতা আরও গভীর করার অঙ্গীকার করেছে। স্বাস্থ্যসেবা, জৈবপ্রযুক্তি, ডিজিটাল স্বাস্থ্য, ওষুধ, চিকিৎসা প্রযুক্তি, গবেষণা ও জনশক্তি উন্নয়নে সহযোগিতা বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।
বিমান চলাচল চুক্তি সম্প্রসারণ
নেতৃবৃন্দ ২০২৫ সালের নভেম্বরে স্বাক্ষরিত দ্বিপক্ষীয় বিমান চলাচল চুক্তির সম্প্রসারণের বিষয়টি তুলে ধরেন, যার মাধ্যমে প্রতিটি দেশের জন্য সপ্তাহে সর্বোচ্চ ১৪টি যাত্রীবাহী ফ্লাইট এবং সীমাহীন কার্গো পরিষেবার অনুমোদন দেওয়া হয়। আকাশপথে এই যোগাযোগ আরও বাড়ানোর বিষয়েও তারা একমত হয়েছেন।
আন্তর্জাতিক ইস্যুতে অবস্থান
আন্তর্জাতিক বিষয়ে, ৭ জুলাই হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলার নিন্দা জানিয়েছে সৌদি আরব ও কানাডা। তারা একে আন্তর্জাতিক আইন, অবাধ নৌ চলাচলের স্বাধীনতা এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২৮১৭ নম্বর প্রস্তাবের গুরুতর লঙ্ঘন বলে আখ্যায়িত করেছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ ও বাধামুক্ত নৌ চলাচল পুনরুদ্ধারের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে দুই পক্ষ। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টার প্রশংসা করেছে তারা।
ফিলিস্তিন ইস্যুতে দুই দেশই নিরাপদ, দ্রুত ও বাধামুক্ত মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া, বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা এবং স্থায়ী শান্তি অর্জনে নতুন করে প্রচেষ্টা চালানোর আহ্বান জানিয়েছে। তারা দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে কানাডার স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে সৌদি আরব।
ইয়েমেনে রাজনৈতিক সমাধানের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে তারা প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলকে সমর্থন জুগিয়েছে এবং লোহিত সাগরে নিরাপত্তা বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। সুদানের সার্বভৌমত্ব, ঐক্য ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান রক্ষা করে সেখানকার সংঘাত অবসানে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছে।
ভবিষ্যৎ আয়োজনে সহযোগিতা
২০৩০ সালে জি-২০ শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনে সৌদি আরবের প্রতি কানাডা নিজেদের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। রিয়াদে এক্সপো-২০৩০ আয়োজনে সফল হওয়ার জন্য সৌদি আরবকে অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি এই বৈশ্বিক আয়োজনে কানাডার অংশগ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন প্রধানমন্ত্রী কার্নি। এ ছাড়া, ২০৩৪ সালের ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজনের আগে সৌদি আরবের সঙ্গে সহযোগিতার সুযোগ তুলে ধরেন তিনি।



