যুক্তরাষ্ট্র কি ইসরাইলকে ছুড়ে ফেলছে? সম্পর্কের টানাপোড়েনের নেপথ্য
যুক্তরাষ্ট্র কি ইসরাইলকে ছুড়ে ফেলছে? সম্পর্কের টানাপোড়েন

ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান টানাপোড়েন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অনেকেই ‘বিশেষ সম্পর্ক’ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ‘পাগল’ বলে ভর্ৎসনা করেছেন এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করতে লেবাননে হামলা বন্ধে অস্বীকৃতি জানানোর জেরে ফোন কলের অডিও ফাঁস হয়েছে, যা হোয়াইট হাউস অস্বীকার করেনি।

ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর সম্পর্কের অবনতি

গত মাসে ফাঁস হওয়া ফোন কলের অডিওতে শোনা যায়, ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে কড়া ভাষায় ভর্ৎসনা করে বলেছেন, ‘সবাই এখন তোমাকে ঘৃণা করে। এর কারণে সবাই ইসরাইলকেও ঘৃণা করে।’ ট্রাম্প আরও অভিযোগ করেন, তার হস্তক্ষেপ না থাকলে নেতানিয়াহুকে এত দিনে জেলেই থাকতে হতো। অ্যাক্সিওসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, নেতানিয়াহু ‘জানেন যে বস কে’।

২০২৫ সালের জুনে ইরানের সঙ্গে পূর্ববর্তী যুদ্ধের সময় ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। তেহরানকে কীভাবে মোকাবিলা করা হবে তা নিয়ে মতবিরোধের জেরে এক বছর পর সম্পর্ক আরও অবনতির দিকে গেছে। ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চূড়ান্ত শান্তি চুক্তির আলোচনায় দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি যুদ্ধের অবসানকে প্রধান শর্ত হিসেবে দাঁড় করিয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ম্যাগা শিবিরে ইসরাইল বিরোধিতা

সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, শুধু সাধারণ জনগণ নয়, ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (ম্যাগা) আন্দোলনের একাংশের মধ্যেও ইসরাইল নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। মার্জোরি টেইলর গ্রিনের মতো কট্টর ম্যাগা-সমর্থকেরা ইসরাইলের প্রতি মার্কিন সমর্থনের কঠোর সমালোচনা করেছেন। সাবেক টেলিভিশন উপস্থাপক টাকার কার্লসন গত জুনের শেষ দিকে নিজের পডকাস্টে বলেন, ট্রাম্প বুঝতে পেরেছেন যে ইসরাইলই তার প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। কার্লসন অভিযোগ করেন, ইসরাইল লেবাননে আরেকটি যুদ্ধ শুরুর অজুহাত হিসেবে ইরানে হামলা চালাতে ট্রাম্পকে ‘তোষামোদ, প্ররোচিত ও হুমকি’ দিয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মার্কিন সহায়তার গুরুত্ব

২০১৬ সাল থেকে এক সমঝোতা স্মারকের আওতায় ইসরাইল ১০ বছরে ৩ হাজার ৮০০ কোটি (৩৮ বিলিয়ন) ডলারের সামরিক সহায়তা পাচ্ছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্য কোনো দেশের সর্ববৃহৎ চুক্তি। গাজায় ইসরাইলের বিশ্বব্যাপী নিন্দিত ‘গণহত্যামূলক’ যুদ্ধের সময়ও মার্কিন কূটনৈতিক সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে গাজায় অন্তত ৭২ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এ ইস্যুতে জাতিসংঘের বিতর্কে ওয়াশিংটন অন্তত ছয়বার ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করেছে।

জুনে এক সংবাদ সম্মেলনে জেডি ভ্যান্স দাবি করেন, ট্রাম্পই বিশ্বের একমাত্র নেতা যিনি ইসরাইলের প্রতি সহানুভূতিশীল। তিনি ইসরাইলি মন্ত্রীদের সতর্ক করে বলেন, ‘যেসব প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্র আপনাদের মাতৃভূমিকে রক্ষা করেছে, তার দুই-তৃতীয়াংশই আমেরিকানদের হাতে তৈরি এবং আমেরিকান করদাতাদের অর্থে কেনা।’

বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ

ওয়াশিংটনের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এবং সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) বিশ্লেষক ড্যানিয়েল বাইম্যান আল জাজিরাকে বলেন, ট্রাম্প ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকান দলের নেতৃত্ব দিলেও ইসরাইলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তার হাতে অন্যান্য বিকল্প রয়েছে। বাইম্যান বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আনার যথেষ্ট নমনীয়তা রয়েছে। অনেক ডেমোক্র্যাটও তার সঙ্গে যোগ দিতে পারেন, কারণ দলটি ক্রমেই ইসরাইলের কঠোর সমালোচক হয়ে উঠছে।’

ইসরাইলি রাজনৈতিক বিশ্লেষক নিম্রোদ ফ্লাশেনবার্গ বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রই সেই মূল খুঁটি যা বিশ্বে ইসরাইলের অবস্থান নিশ্চিত করে। ইসরাইলের কাছে যুক্তরাষ্ট্রই সব—তারা ইসরাইলকে প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, কূটনৈতিক অবস্থান—সবকিছুই দেয়।’

নেতানিয়াহুর অভ্যন্তরীণ চাপ

চলতি বছরের শেষ দিকে ইসরাইলের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নেতানিয়াহু দুর্নীতির অভিযোগে কারাবাসের ঝুঁকিতে রয়েছেন এবং ক্ষমতা হারানোর শঙ্কায়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়ার লাপিদ এক্সে লেখেন, ‘আমরা যদি দ্রুত এই সরকার পরিবর্তন না করি, তবে ইসরাইলের বৈদেশিক সম্পর্ক পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।’ সাবেক চিফ অব স্টাফ গাদি আইজেনকোট নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে পরিস্থিতি খারাপভাবে পরিচালনার অভিযোগ এনে বলেন, এটি ট্রাম্পকে একা চলতে এবং ইরানের সঙ্গে চুক্তির পথ খুঁজতে বাধ্য করেছে।

সম্পূর্ণ বিচ্ছেদের সম্ভাবনা

মার্কিন লেখক ও সাবেক কূটনীতিক অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, ট্রাম্প ইসরাইলের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়ানো প্রথম প্রেসিডেন্ট নন, তবে খুব কম প্রেসিডেন্টই এত প্রকাশ্যে এমনটা করেছেন। তিনি বলেন, ‘কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট বা ভাইস প্রেসিডেন্ট বর্তমান প্রশাসনের মতো ভাষায় কথা বলেননি বা ইসরাইলি সমকক্ষের সঙ্গে আলোচনার তথ্য ফাঁস করেননি, যেখানে তাদের হেয় করা হয়েছে। ইসরাইল এর আগে কখনোই কংগ্রেস বা জনগণের কাছে এতটা অজনপ্রিয় ছিল না।’ তবে মিলার মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসন ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করার কথা ভাবছে—এমন কোনো ইঙ্গিত এখনো পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, ‘ট্রাম্প যদি ইসরাইলের ওপর জোরালো চাপ প্রয়োগ করেন, তবে তা এমন কোনো বড় অর্জনের লক্ষ্যেই করবেন যা তাকে ভালো ইমেজ এনে দেবে।’