ইরান যুদ্ধে শক্তির ভারসাম্য বদলে দিয়েছে, নতুন যুগের সূচনা
ইরান যুদ্ধ শক্তির ভারসাম্য বদলে দিয়েছে, নতুন যুগের সূচনা

ইরানের পতাকা হাতে এক নারীর ছবি: রয়টার্স। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পাঠ্যবইয়ে স্থান পেতে পারে। এটি কেবল ক্ষমতা সম্পর্কে ধারণাকে উল্টে দেয়নি, বরং বিশ্ব ময়দানে শক্তি ব্যবহারের ধরন পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। বিশ্বে রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্ক নিয়ে প্রচলিত তত্ত্বগুলো এখনো প্রাসঙ্গিক, এবং ক্ষমতার ভারসাম্য পুরোপুরি অদৃশ্য হয়নি। সামরিক শক্তিতে এগিয়ে থাকা এখনো বড় সুবিধা, তবে শক্তি প্রয়োগের ফল আগের তুলনায় অনেক বেশি অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। জোর করে চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে সহজে ও সরাসরি ফল পাওয়া যায় না—তা ইরানের মতো সামরিক হস্তক্ষেপ হোক বা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও অন্যান্য চাপের ক্ষেত্রেও। সব পক্ষ নিজেদের প্রয়োজনে নানা রাজনৈতিক বয়ান দেয়, কিন্তু সেগুলো বাদ দিলে বাস্তব চিত্র খুব পরিষ্কার।

যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থতা

যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর শক্তিশালী জোট তুলনামূলকভাবে দুর্বল ইরান ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করেছিল। তবে তারা নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। ইরান ও তার মিত্রদের পাশে রাশিয়া ও চীনের সমর্থন সীমিত ছিল বলে ধারণা করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দ্রুত ও বিধ্বংসী হামলা চালিয়ে ইরানি শাসনব্যবস্থাকে পরাজিত করতে চেয়েছিল; তাদের ধারণা ছিল, তেহরান চাপের মুখে দ্রুত নতি স্বীকার করবে। কিন্তু বাস্তবে উল্টো ঘটে। আক্রমণকারী পক্ষের শক্তিশালী বাহিনীর মুখোমুখি হয়ে ইরান অপ্রত্যাশিতভাবে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলে। শুরুতে বড় ধরনের আঘাত লাগলেও ইরান ভেঙে পড়েনি; বরং তারা সংগঠিত হয়েছে, শক্তি সঞ্চয় করেছে এবং আগের সীমাবদ্ধতাগুলো কাটিয়ে উঠেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অসম শক্তিতে পাল্টা আক্রমণ

এটাই নতুন যুগের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য: অসম শক্তি নিয়ে পাল্টা আক্রমণ। প্রচলিত সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমকক্ষ হতে পারেনি ইরান, তবে তাদের তা প্রয়োজনও হয়নি। তারা বিকল্প উপায়গুলো এমনভাবে ব্যবহার করেছে, যা প্রতিপক্ষের অনেক সক্ষমতাকে ভারসাম্যহীন করে দিয়েছে। প্রথমত, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার মতো পদক্ষেপ নেয় ইরান, যা আগে কখনো বাস্তবায়ন করেনি। দ্বিতীয়ত, তারা শুধু ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ মিত্রদের সম্পদও নিশানা করে। তৃতীয়ত, তারা বড় অস্ত্রভান্ডারের ওপর নির্ভর করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের তুলনায় কম সমৃদ্ধ হলেও গুরুতর ক্ষতি করার জন্য যথেষ্ট ছিল। চতুর্থত, ইরান প্রতিপক্ষের তুলনায় অনেক বেশি ক্ষতি সয়ে নেওয়ার সক্ষমতা দেখায়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বর্তমান পরিস্থিতির বার্তা

বর্তমান পরিস্থিতি নিজেই একটি বার্তা দিয়েছে: যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যেসব বিষয়কে কেন্দ্র করে যুদ্ধ শুরু করেছিল, তার কোনো সমাধান হয়নি। সবকিছু ভবিষ্যৎ আলোচনার জন্য স্থগিত করা হয়েছে। পারস্য কূটনৈতিক ঐতিহ্যে আলোচনার অর্থ হলো অধ্যবসায় ও ধৈর্য। যুদ্ধ শুরুর আগে যে স্থিতাবস্থা ভেঙে গিয়েছিল, তা কার্যত আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসছে। হরমুজ প্রণালি আবার জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে, যদিও শর্তাবলি এখনো স্পষ্ট নয়। দুই পক্ষ ভিন্নভাবে এর ব্যাখ্যা দিয়েছে।

সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতা

সাম্প্রতিক বছরের অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, সামরিক শক্তির মাধ্যমে রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। দুর্বল পক্ষের প্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়ছে, আর শক্তিশালী পক্ষের মধ্যে নিজ দেশের স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকিতে ফেলার প্রবণতা কমছে। অনেক সংঘাতেই এমনটা হচ্ছে, তবে মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষভাবে দৃশ্যমান। বড় পরিসরে এর রাজনৈতিক প্রভাব হলো বিশ্বের আধিপত্যবাদী শক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের দুর্বলতা প্রকাশ পাওয়া। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দেখিয়েছেন, তিনি আরেকটি পূর্ণমাত্রার সামরিক সংঘাতে জড়াতে অনাগ্রহী। তিনি নিজে যে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, তাতে ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেননি।

যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের পরিবর্তন

এক দিক থেকে এটি বাস্তবসম্মত চিন্তাভাবনা, কারণ ট্রাম্প বোঝেন যে আরেক দফা সংঘাত শুরু হলে ফল সম্ভবত আগের মতোই অচলাবস্থায় গিয়ে ঠেকবে। তবে আরেক দিক থেকে এটি বিশ্বের অন্য দেশগুলোকে বার্তা দিচ্ছে: শুধু নিজের মর্যাদা ও প্রভাব বজায় রাখার জন্য যুক্তরাষ্ট্র আর অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি নিতে আগ্রহী নয়। মিত্রদেশগুলোকে এখনো যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির কথা বিবেচনায় রাখতে হবে, তবে তারা আর নিশ্চিতভাবে ধরে নিতে পারবে না যে কোনো সংকট দেখা দিলে যুক্তরাষ্ট্র সব সময় বড় ধরনের ঝুঁকি নেবে। এটি শুধু মধ্যপ্রাচ্যের প্রবণতা নয়, বিশ্বজুড়েই দেখা যাচ্ছে।

নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থা ধাক্কা খেয়েছে

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থা বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। এই কাঠামো গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়েছিল ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে, যার মূল ভিত্তি ছিল ইসরায়েল ও তার আরব প্রতিবেশী দেশগুলো—বিশেষ করে ধনী উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা। এটি আর্থিক পারস্পরিক নির্ভরতা, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং ইরান ও তার মিত্রদের কোণঠাসা করার ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। এই কৌশল ২০২৩ সালে গাজা যুদ্ধে বড় ধাক্কা খেয়েছিল, তবে তা পুরো পরিকল্পনাকে ভেস্তে দিতে পারেনি; বরং অগ্রযাত্রা কিছুটা পিছিয়ে দিয়েছিল। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের উদ্দেশ্য ছিল বিষয়টি আরও চূড়ান্তভাবে সমাধান করা এবং ইসরায়েলের সামরিক আধিপত্যের অধীন স্থায়ীভাবে অঞ্চলটিকে পুনর্গঠন করা। তবে ইরানকে আঞ্চলিক সমীকরণ থেকে সরিয়ে দিতে ব্যর্থ হওয়ায় সে পরিকল্পনায় বড় বাধা তৈরি হয়েছে।

ভবিষ্যতের সম্ভাবনা

বর্তমান সংঘাতের এ পর্যায়ে কোনো সমস্যারই সমাধান হয়নি, তাই ভবিষ্যতে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা হতে পারে। তবে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র আগের তুলনায় কম সুবিধা পাবে। ওয়াশিংটনের তুলনামূলক ব্যর্থতা এবং তেহরানের তুলনামূলক সাফল্য—সব মিলিয়ে শক্তির ভারসাম্য ইরানের দিকে কিছুটা ঝুঁকছে। ইরানের নতুন ও তরুণ নেতৃত্বের ওপর এখন অনেক কিছু নির্ভর করছে। তারা এ সুযোগ কীভাবে কাজে লাগায়, তার ওপর নির্ভর করছে ভবিষ্যৎ। যেহেতু কোনো সমঝোতা হয়নি এবং কোনো স্থিতিশীল আঞ্চলিক শৃঙ্খলা গড়ে ওঠেনি, তাই নতুন অস্থিরতার ঝুঁকি এখনো থেকে গেছে। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার: যে যুগে সামরিক শক্তির শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে নিশ্চিতভাবে রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করা যেত, সেই যুগ ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ এখন আরও জটিল হয়ে উঠছে, এবং ফলাফল আগের তুলনায় কম নিয়ন্ত্রণযোগ্য। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হাতে এখনো বিপুল সামরিক শক্তি; তবে ইরান দেখিয়ে দিয়েছে, এই শক্তি দিয়ে বিজয় নিশ্চিত করা যাবে না।

প্রতিবেদনটির লেখক ফিওদর লুকিয়ানভ রাশিয়া ইন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের এডিটর ইন চিফ এবং রাশিয়ার ফরেন অ্যান্ড ডিফেন্স কাউন্সিলের প্রেসিডিয়ামের চেয়ারম্যান। তিনি ভালদাই ইন্টারন্যাশনাল ডিসকাশন ক্লাবের গবেষণা পরিচালক হিসেবে নিযুক্ত আছেন।