যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) পূর্ণ বিবরণ প্রকাশ করেছে মার্কিন প্রশাসন। বুধবার এক উচ্চপদস্থ মার্কিন কর্মকর্তা ১৪ দফার এই নথি সাংবাদিকদের সামনে পড়ে শোনান। এই চুক্তির মূল লক্ষ্য হলো লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ করা এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা।
সমঝোতা স্মারকের মূল বিষয়
সমঝোতা স্মারকের শিরোনাম ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের মধ্যকার ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’। এর আগে চুক্তিটি প্রকাশ না করায় সমালোচনা বাড়লে যুক্তরাষ্ট্র এটি প্রকাশ করতে বাধ্য হয়।
মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ‘এটি এমন একটি চুক্তি যা আমাদের তাৎক্ষণিকভাবে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে। পাশাপাশি ইরানিদের পারমাণবিক বর্জ্য ধ্বংস করার প্রতিশ্রুতি থাকছে। ইরান ভালো আচরণ করলে আমরাও ইতিবাচক সাড়া দেব এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিল করব।’
১৪ দফার বিস্তারিত
- অনুচ্ছেদ ১: যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও তাদের মিত্ররা অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান বন্ধ করবে এবং একে অপরের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ বা হুমকি থেকে বিরত থাকবে।
- অনুচ্ছেদ ২: উভয় পক্ষ একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান জানাবে এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না।
- অনুচ্ছেদ ৩: সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে আলোচনা করে চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর অঙ্গীকার, যা উভয় পক্ষের সম্মতিতে বাড়ানো যেতে পারে।
- অনুচ্ছেদ ৪: এমওইউ সইয়ের পর যুক্তরাষ্ট্র তার নৌ অবরোধ তুলে নিতে শুরু করবে এবং ৩০ দিনের মধ্যে সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহার করবে। ইরান হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধ-পূর্ববর্তী অবস্থা ফিরিয়ে আনবে। চূড়ান্ত চুক্তির পর যুক্তরাষ্ট্র ৩০ দিনের মধ্যে ইরানের নিকটবর্তী এলাকা থেকে সামরিক বাহিনী সরিয়ে নেবে।
- অনুচ্ছেদ ৫: ইরান বিনা মূল্যে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ব্যবস্থা করবে এবং ৩০ দিনের মধ্যে মাইন অপসারণ করবে। ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালি ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওমান ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের সঙ্গে আলোচনা করবে।
- অনুচ্ছেদ ৬: যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক অংশীদারদের নিয়ে ইরানের পুনর্গঠনে কমপক্ষে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনা তৈরি করবে, যা ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত হবে।
- অনুচ্ছেদ ৭: চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে, যার মধ্যে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবও অন্তর্ভুক্ত।
- অনুচ্ছেদ ৮: ইরান পুনরায় নিশ্চিত করেছে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিষ্পত্তি আইএইএ তত্ত্বাবধানে ডাউন ব্লেন্ডিংয়ের মাধ্যমে করা হবে।
- অনুচ্ছেদ ৯: চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান পরিস্থিতি (স্ট্যাটাস কো) বজায় থাকবে। ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচির বর্তমান অবস্থা ধরে রাখবে এবং যুক্তরাষ্ট্র নতুন নিষেধাজ্ঞা বা অতিরিক্ত সামরিক বাহিনী মোতায়েন করবে না।
- অনুচ্ছেদ ১০: এমওইউ সইয়ের পর মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় ইরানের অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য রপ্তানিতে ছাড় দেবে, যার মধ্যে ব্যাংকিং, বীমা ও পরিবহন সেবা অন্তর্ভুক্ত।
- অনুচ্ছেদ ১১: যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জব্দ থাকা তহবিল ও সম্পদ ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দেবে এবং প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ও অনুমোদন দেবে।
- অনুচ্ছেদ ১২: এমওইউ বাস্তবায়ন ও চূড়ান্ত চুক্তির শর্তাবলী তদারকির জন্য একটি নির্বাহী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হবে।
- অনুচ্ছেদ ১৩: স্বাক্ষরের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ১, ৪, ৫, ১০ ও ১১ নম্বর অনুচ্ছেদ বাস্তবায়ন শুরু করবে এবং চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনা চালিয়ে যাবে।
- অনুচ্ছেদ ১৪: চূড়ান্ত চুক্তিটি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদিত হবে।
শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে এই সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে আলোচনার জন্য ৬০ দিনের সময়সীমা শুরু হবে।



