ব্রেক্সিটের এক দশক: যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সপ্তম প্রধানমন্ত্রীর অভ্যুদয়
ব্রেক্সিটের এক দশক: যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা

২০১৬ সালের ২৩ জুন ব্রেক্সিট গণভোটের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যে জনতুষ্টিবাদের (পপুলিজম) এক জোয়ার তৈরি হয়েছিল, যা পশ্চিমা রাজনীতির চেনা নিয়মকানুন বদলে দেয়। আজ সেই ঐতিহাসিক ঘটনার ঠিক ১০ বছর পর, এক ক্ষয়িষ্ণু ও খণ্ডিত যুক্তরাজ্য তাদের সপ্তম প্রধানমন্ত্রীকে বরণ করে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অথচ এক দশক আগের সেই প্রতিশ্রুত ভবিষ্যতের ভূত এখনও দেশটিকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে।

লেবার পার্টির ঐতিহাসিক জয় ও পতন

কনজারভেটিভ পার্টির দীর্ঘ ১৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে লেবার পার্টির নেতা কিয়ার স্টারমার নির্বাচিত হয়েছিলেন। কনজারভেটিভদের পুরো সময়টা মূলত ব্যয় হয়েছিল কৃচ্ছ্রসাধন, আদর্শিক লড়াই আর ব্রেক্সিটের চরম বিশৃঙ্খলার পেছনে। কিন্তু লেবার পার্টির ঐতিহাসিক ভূমিধস জয়ের দুই বছর পার হতে না হতেই গত সোমবার (২২ জুন) স্টারমার পদত্যাগের ঘোষণা দেন। তার এই বিদায় প্রমাণ করে যে, ব্রিটেনের দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিরতা এখন আর কেবল দলীয় ব্যাখ্যা দিয়ে মেলানো সম্ভব নয়।

ব্রেক্সিটের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতা

ব্রেক্সিটের শুরুতে এক 'উন্মুক্ত বৈশ্বিক ব্রিটেন'-এর অবাস্তব স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, যা অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ করবে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাবে এবং নিজেদের সীমান্ত ও বাজেটের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনবে। বাস্তবে দেখা গেল উল্টো চিত্র। একের পর এক কনজারভেটিভ প্রধানমন্ত্রী দেশকে আরও গভীর অকার্যকারিতার দিকে ঠেলে দিয়েছেন। থেরেসা মে ব্রেক্সিট আলোচনার জটিলতায় ভেঙে পড়েছিলেন, বরিস জনসন বিদায় নেন কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে, লিজ ট্রাস ক্ষমতা হারান বাজারের তীব্র আতঙ্কে আর ঋষি সুনাককে পড়তে হয় নজিরবিহীন নির্বাচনি ভরাডুবির মুখে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট

আজ ব্রিটেন এক নিম্ন-প্রবৃদ্ধির বৃত্তে আটকা পড়ে আছে; যেখানে যুক্ত হয়েছে বাণিজ্য সংঘাত, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ভেঙে পড়া জনসেবামূলক খাত এবং এমন এক অতি-সংবেদনশীল ভোটার গোষ্ঠী, যারা রাজনৈতিক নেতাদের সামান্য ব্যর্থতাও এখন আর সহ্য করতে রাজি নয়। কিয়ার স্টারমারের শাসনকাল মূলত অভিবাসন ও জীবনযাত্রার ব্যয় সংকটের পেছনেই ব্যয় হয়েছে। আর এই পরিস্থিতি নাইজেল ফারাজের ডানপন্থি দল রিফর্ম ইউকে-র জন্য দারুণ এক সুযোগ তৈরি করে দেয়। তারা লেবার পার্টির ঐতিহ্যবাহী শ্রমজীবী মানুষের সমর্থন নিজেদের দিকে টেনে নিতে শুরু করে।

অ্যান্ডি বার্নহামের উত্থান

এই প্রেক্ষাপটে দৃশ্যপটে আগমন অ্যান্ডি বার্নহামের। গ্রেটার ম্যানচেস্টারের সাবেক এই মেয়র এবং ক্যারিশম্যাটিক 'কিং অব দ্য নর্থ' এখন লেবার পার্টির একমাত্র হেভিওয়েট নেতা, যার মধ্যে ফারাজের এই উত্থান রুখে দেওয়ার মতো আসল জনতুষ্টিবাদী আবেদন রয়েছে। পার্লামেন্টে ফিরিয়ে আনার জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা একটি উপ-নির্বাচনে বার্নহাম রিফর্ম ইউকে-কে বড় ব্যবধানে পরাজিত করেছেন। আর এর মাধ্যমেই লেবার পার্টির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এবং ব্রিটেনের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথ সম্ভবত তার জন্য পরিষ্কার হয়ে গেছে।

পশ্চিমা বিশ্বে জনতুষ্টিবাদের ঢেউ

অ্যান্ডি বার্নহাম যদি ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে প্রবেশও করেন, তার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ক্ষমতায় থাকার দায়ভার বহন করা, যা কোভিড-পরবর্তী পুরো গণতান্ত্রিক বিশ্বের শাসকদের জন্যই একটি প্রমাণিত বোঝা হিসেবে দেখা দিয়েছে। ফ্রান্সে ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর জনপ্রিয়তার রেটিং কোনও কোনও সময় মাত্র ১১ শতাংশে নেমে এসেছে, যেখানে আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে উগ্র ডানপন্থি দল ন্যাশনাল র‍্যালি জয়ের দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে। জার্মানিতে উগ্র ডানপন্থি এএফডি নজিরবিহীনভাবে তাদের অবস্থান শক্ত করেছে এবং চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের রক্ষণশীলদের চেয়ে ব্যবধান ক্রমাগত বাড়িয়েই চলেছে। এমনকি হাঙ্গেরিতেও গত এপ্রিলে ভোটাররা ভিক্টর অরবানের ১৬ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সবচেয়ে প্রতিষ্ঠিত জাতীয়তাবাদী সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে।

ট্রাম্পের অবস্থান

এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি আগামী নভেম্বরে একটি কঠিন মধ্যবর্তী পরীক্ষার মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন, তিনিও এই একই ক্ষমতাসীনবিরোধী শক্তির মুখে অরক্ষিত প্রমাণিত হচ্ছেন। ২০১৬ সালে ট্রাম্পের ঐতিহাসিক বিজয় ব্রেক্সিটের ভূ-রাজনৈতিক ধাক্কার সঙ্গেই জড়িত ছিল, যা ইঙ্গিত দিয়েছিল যে অভিবাসন, বিশ্বায়ন এবং অভিজাতদের ব্যর্থতার প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করতে পশ্চিমা ভোটাররা পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাকে পুড়িয়ে দিতেও প্রস্তুত। কিন্তু এখন ট্রাম্প নিজেই সেই ব্যবস্থার অংশ। উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ইরান যুদ্ধের কারণে তার জনপ্রিয়তার রেটিং এখন মাত্র ৩০-এর কোঠার ওপরের দিকে ঘোরাফেরা করছে। বিশ্বের সবচেয়ে সফল অ্যান্টি-সিস্টেম রাজনীতিবিদ এখন আকস্মিকভাবে তার নিজের নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধেই লড়াই করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন।

উপসংহার

নিজেদের 'নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে নেওয়ার' পক্ষে ভোট দেওয়ার এক দশক পর, ব্রিটেন আজ এক রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে আটকা পড়েছে। দশ বছরের এই পদ্ধতিগত বিশৃঙ্খলা প্রমাণ করেছে যে, রাষ্ট্রব্যবস্থা-বিরোধী ক্ষোভকে উসকে দেওয়া অত্যন্ত সহজ, কিন্তু সেই ক্ষোভকে ধারণ করে রাষ্ট্র শাসন করা কার্যত অসম্ভব।