সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি: মূল্যস্ফীতি ও বৈষম্য বাড়ার শঙ্কা
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি: মূল্যস্ফীতি ও বৈষম্য বাড়ার শঙ্কা

ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা মোহাম্মদ শিহাব উদ্দিন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। উচ্চমূল্যের বাজারে তার বেতনে পাঁচজনের সংসার চালানো দায় হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর খবর তাকে দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, 'এমনেই জিনিসপত্রের যে দাম, তাতে বাজারে গেলে ঘাম ছুটে যায়। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর সাথে সাথে সেগুলোর দাম আবারও বেড়ে যাবে। কিন্তু আমাদের মতো মানুষের আয় তো বাড়ছে না। তাহলে আমরা বাঁচবো কীভাবে?'

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সাড়ে ১৪ লাখের বেশি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারির বেতন বৃদ্ধি শুধু মূল্যস্ফীতিই বাড়াবে না, বরং বৈষম্য, দারিদ্র্য ও তারল্য সংকটসহ আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে নানান ঝুঁকি তৈরি করবে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবীর বলেন, 'সেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য যে ধরনের পরিকল্পনা ও পূর্বপ্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন, সরকার সেদিকে দৃষ্টি না দিলে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংকট আরও বেড়ে যেতে পারে।'

নতুন বেতন কাঠামো: কী প্রস্তাব করা হয়েছে?

বাংলাদেশে সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেল ঘোষিত হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর প্রতিবছর মূল বেতন পাঁচ শতাংশ হারে বাড়লেও নতুন পে স্কেল ঘোষণা করা হয়নি। ২০২৫ সালে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে একটি বেতন কমিশন গঠন করে। কমিশন গত জানুয়ারি মাসে সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়, যেখানে বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, সর্বনিম্ন বেতন স্কেল ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার কথা বলা হয়। এছাড়া বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ এবং যাতায়াত ভাতা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়। নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

গত ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতা গ্রহণের পর বিএনপি সরকার মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে। ওই কমিটি ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের (মধ্যম ও নিম্ন পদ) কর্মচারীদের বেতন বেশি বাড়ানোর খসড়া রূপরেখা তৈরি করেছে। দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বেশ কয়েকটি গ্রেডে মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য খসড়া রূপরেখা শিগগিরই মন্ত্রিসভায় পাঠানো হবে এবং চলতি মাসেই গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হতে পারে।

মূল্যস্ফীতি উস্কে দেওয়ার আশঙ্কা

প্রতি পাঁচ বছর পর পর বেতন পর্যালোচনার বিধান থাকলেও গত দশ বছরে তা করা হয়নি। বিশ্লেষকরা নতুন পে স্কেল ঘোষণাকে যৌক্তিক বললেও, সময়টি সংকটময় বলে মন্তব্য করেন ড. মাহফুজ কবীর। তিনি বলেন, 'গত এক দশকে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিসহ খরচ যেভাবে বেড়েছে, তাতে নতুন পে স্কেল যৌক্তিক। কিন্তু সিদ্ধান্তটি এমন সময় নেওয়া হয়েছে, যখন বাংলাদেশের অর্থনীতি সংকটময় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।'

গত জুনে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও তা এখনো ৯ শতাংশের ওপরে রয়েছে। সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন, 'নতুন পে স্কেল ঘোষণা মুদ্রাস্ফীতিকে আরও উস্কে দেবে।' তার মতে, বাড়তি বেতনের অর্থের জন্য সরকারকে ঋণ নিতে হবে বা টাকা ছাপাতে হবে, যা অর্থনীতিতে যোগ হয়ে মূল্যস্ফীতি বাড়াবে।

জিনিসপত্রের দাম বাড়ার সম্ভাবনা

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধিতে তাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে, যা পণ্যের চাহিদা বাড়িয়ে দাম বাড়াতে পারে। ড. সেলিম রায়হান বলেন, 'স্বাভাবিকভাবেই জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যেতে পারে।' তবে সরবরাহ ঠিক রাখলে দাম নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। কিন্তু ড. মাহফুজ কবীর সতর্ক করে বলেন, 'আমাদের দেশের অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, চাহিদা বাড়লেই ব্যবসায়ীদের একটি অংশ কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পণ্যের দাম কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়।'

তিনি আরও বলেন, 'সরকার যদি নিত্যপণ্যের সংকট বা লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তাহলে ভোগান্তি থেকে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ তৈরি হতে পারে।'

বৈষম্য ও দারিদ্র্য বৃদ্ধির শঙ্কা

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সরকারি চাকরিজীবীর সংখ্যা সাড়ে ১৪ লাখের কিছু বেশি। অন্যদিকে, বেসরকারিখাতে শ্রমশক্তির সংখ্যা প্রায় ৬ কোটি ৯৭ লাখ, যা মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৯৫ শতাংশ। ড. সেলিম রায়হান বলেন, 'বেসরকারি খাতের কর্মীদের বেতন বাড়ছে না, ফলে দুই অংশের মধ্যে বৈষম্য তৈরি হচ্ছে।'

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮.৭ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে বেড়ে ২১.৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ড. মাহফুজ কবীর বলেন, 'সরকারির পাশাপাশি বেসরকারি খাতের কর্মীদের বেতন না বাড়লে আয় বৈষম্য আরও বাড়বে, যার ফলে দারিদ্র্যের হারও বৃদ্ধি পেতে পারে।'

তারল্য সংকটের আশঙ্কা

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা বাবদ প্রায় ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা পেনশন ও গ্রাচুইটিসহ ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা। 'জনপ্রশাসন নিট' খাতে সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত অর্থের অন্তত ৪৪ হাজার কোটি টাকা নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের জন্য সংরক্ষিত।

ড. মাহফুজ কবীর বলেন, 'বাড়তি ব্যয়ের বিপরীতে সরকারের আয় সেভাবে বাড়ছে না। বাজেটে বিপুল ঘাটতি দেখা যাচ্ছে, যা মেটাতে সরকারকে দেশে-বিদেশে ঋণ নিতে হবে। বিদেশি সংস্থা থেকে ঋণ নিলে অর্থনীতিতে চাপ বাড়বে, আর দেশি ব্যাংক থেকে নিলে তারল্য সংকট দেখা দেবে।'

সরকারের অবস্থান

বিএনপি সরকার অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জিং বলে স্বীকার করছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বিবিসি বাংলাকে বলেন, 'ইশতাহারে বলা হয়েছে যে যথাসময়ে বাস্তবায়ন করা হবে এবং সেই অনুযায়ীই একটা রিভিউ করা হয়েছে।' তিনি জানান, বেতন-ভাতা একবারে না বাড়িয়ে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রথমে বেতন বা বেসিক বাড়ানো হবে।

গত জুনে সংসদে বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, 'সরকারি কর্মচারীরা বিগত প্রায় ১১ বছর যাবৎ একই বেতন কাঠামোতে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। মূল্যস্ফীতিজনিত কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো আগামী ১ জুলাই ২০২৬ হতে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করার ঘোষণা দিচ্ছি।' পে স্কেল পর্যালোচনা কমিটির সুপারিশে প্রথম দুই অর্থবছরে মূল বেতন ৫০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি এবং তৃতীয় বছরে ভাতা কার্যকরের কথা বলা হয়েছে।