ইরান যুদ্ধের প্রভাবে অর্থনীতিতে চাপ: এডিবি থেকে ২২০ কোটি ডলার ঋণের সম্ভাবনা
ইরান যুদ্ধের প্রভাবে অর্থনীতি: এডিবি থেকে ২২০ কোটি ডলার ঋণ

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তা: বাংলাদেশের জন্য এডিবি থেকে ঋণের সুযোগ

ইরান যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে, যা জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, শিপিং ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্নের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে আমদানি নির্ভর দেশগুলো নতুন করে চাপে পড়েছে, এবং এ তালিকায় বাংলাদেশও রয়েছে। সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ধাক্কা সামাল দিতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে প্রায় এক দশমিক ছয় বিলিয়ন বা ১৬০ কোটি ডলার ঋণ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের সামনে।

এডিবির বিশেষ জরুরি সহায়তা প্যাকেজ

জানা গেছে, এডিবির একটি বিশেষ জরুরি সহায়তা প্যাকেজের আওতায় এ অর্থ পাওয়া যেতে পারে। এছাড়া চলমান অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচির আওতায়ও পাওয়া যেতে পারে ৬০০ মিলিয়ন বা ৬০ কোটি ডলার। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি আমদানি ব্যয় বাড়া, সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বৃদ্ধির ঝুঁকি রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে আগাম প্রস্তুতির অংশ হিসেবে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ জোরদার করা হয়েছে।

বিশেষ সহায়তা প্যাকেজে ১০০ কোটি ডলার

বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে সৃষ্ট তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় গত ২৩ মার্চ এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উন্নয়নশীল সদস্য দেশগুলোর জন্য একটি বিশেষ অর্থনৈতিক সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করে এডিবি। এই প্যাকেজের আওতায় বাংলাদেশ প্রায় ১০০ কোটি ডলার পর্যন্ত অর্থায়ন পেতে পারে বলে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে জানা গেছে। ইতোমধ্যে বিষয়টি নিয়ে এডিবির কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তবে, অর্থ পেতে হলে বাংলাদেশকে একটি ‘নিডস অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্ট’ বা প্রয়োজনীয়তা মূল্যায়ন প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। এতে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অর্থনীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব, বাজেট ঘাটতির ঝুঁকি এবং অতিরিক্ত অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর এডিবি যাচাই–বাছাই করবে। সবকিছু ঠিক থাকলে দুই থেকে তিন মাসের মধ্যেই অর্থ ছাড়ের সম্ভাবনা রয়েছে।

বাজেট সহায়তা হিসেবে আরও ৬০০ মিলিয়ন ডলার

এডিবির চলমান ‘ইকোনমিক ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড গভর্নেন্স’ কর্মসূচির দ্বিতীয় কিস্তি হিসেবে আগামী জুনের মধ্যে ৬০০ মিলিয়ন বা ৬০ কোটি ডলার বাজেট সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ সহায়তা সরাসরি সরকারি কোষাগারে জমা হবে। ফলে সরকারের বৈদেশিক অর্থায়নের চাপ কমবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় কিছুটা স্বস্তি আসতে পারে।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত ডিসেম্বর মাসে একই কর্মসূচির প্রথম কিস্তি হিসেবে ৬০ কোটি ডলার ছাড় করেছিল এডিবি। ওই সময় সরকারের অর্থনৈতিক সংস্কার উদ্যোগের অগ্রগতি বিবেচনায় এ অর্থায়ন অনুমোদন করা হয়। সম্প্রতি এডিবির একটি প্রতিনিধি দল ঢাকা সফর করে কর্মসূচির অগ্রগতি পর্যালোচনা করেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কর্মসূচির আওতায় নির্ধারিত ১৭টি সংস্কার শর্তের অধিকাংশই ইতিমধ্যে পূরণ হয়েছে। বাকি শর্তগুলোও আগামী কয়েক মাসের মধ্যে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সংস্কারগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা বাড়ানো
  • আর্থিক ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা
  • জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আহরণ পদ্ধতি আধুনিক করা

সহ–অর্থায়নের সম্ভাবনাও রয়েছে

একই কর্মসূচির আওতায় এডিবির পাশাপাশি জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) এবং ওপেক ফান্ড থেকেও প্রায় ৩০০ মিলিয়ন বা ৩০ কোটি ডলার অর্থায়ন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ বিষয়ে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদি এ অর্থায়ন বাস্তবায়িত হয় তাহলে তা সামগ্রিকভাবে দেশের বৈদেশিক অর্থায়ন ব্যবস্থায় কিছুটা স্বস্তি আনতে পারে।

যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা

অর্থনীতিবিদদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের ওপর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে জ্বালানি খাতে। বাংলাদেশ এখনও বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত তিন সপ্তাহেই বাংলাদেশকে তুলনামূলক বেশি দামে ৯টি এলএনজি কার্গো আমদানি করতে হয়েছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ‘জিরো কার্বন অ্যানালিটিক্স’র হিসাবে, যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি বিল বছরে প্রায় ৪০ শতাংশ বা ৪৮০ কোটি ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে।

এর পাশাপাশি শিপিং রুটে বিঘ্ন ঘটলে পণ্য পরিবহন খরচ বাড়ার শঙ্কাও রয়েছে। এতে শুধু জ্বালানি নয়, পেট্রোকেমিক্যাল, সার ও কৃষি উৎপাদনেও প্রভাব পড়তে পারে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি খাতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।

এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, “চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আগামী তিন মাসের জন্য সরকারের একটি সুস্পষ্ট জরুরি কর্মপরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি বিষয় হলো—জ্বালানি সরবরাহ এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এটি কেবল আঞ্চলিক নয় বরং, একটি বৈশ্বিক সংকট। তাই এ পরিস্থিতিকে পুঁজি করে কেউ যেন অযৌক্তিকভাবে মুনাফা লুটতে না পারে, সে বিষয়েও সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে।”

তিনি আরও বলেন, “সম্ভাব্য জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার ইতিমধ্যে যেসব উদ্যোগ নিয়েছে তা প্রশংসার দাবি রাখে। তবে, একইসঙ্গে ভোক্তাদেরও জ্বালানি ব্যবহারে সংযমী ও সহনশীল হতে হবে। পাশাপাশি ধৈর্যও ধারণ করতে হবে। জ্বালানি সরবরাহ ও মজুদের প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে জনগণের সামনে স্বচ্ছ তথ্য তুলে ধরা সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এতে গুজব বা বাজারে অস্থিরতা কমানো সম্ভব।”

এছাড়া যেসব প্রবাসী যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দেশে এসে আটকে পড়েছেন তাদের দ্রুত কর্মস্থলে ফিরতে সহায়তা করতে বিমান চলাচল সহজ ও নিয়মিত করার উদ্যোগ নেওয়ার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।

সরবরাহ শৃঙ্খলে চাপের শঙ্কা

এডিবির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক নৌপথে ঝুঁকি বাড়লে পণ্য পরিবহন সময় ও ব্যয় দুটোই বাড়তে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি ও কাঁচামাল আমদানি নির্ভর শিল্পগুলো এতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কৃষি খাতে সার সরবরাহ ব্যাহত হলে উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। এছাড়া প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে, যদি মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়।

কাজ করছে মন্ত্রিসভা কমিটি

মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান সংঘাতের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব মোকাবিলায় সাত সদস্যের একটি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করেছে সরকার। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত এ কমিটি বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার সামগ্রিক প্রভাব পর্যবেক্ষণ এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতির সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় নীতিগত পদক্ষেপ নির্ধারণে কাজ করছে।

সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কমিটিটি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান যুদ্ধ ও অস্থিরতার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ এবং বিশ্লেষণ করবে। একইসঙ্গে এসব পরিস্থিতির ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতি, জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা, খাদ্য নিরাপত্তা এবং প্রবাসী কর্মসংস্থানের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়ন করবে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সংকট ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং এ বিষয়ে সরকারকে প্রয়োজনীয় নীতিগত সুপারিশ দেওয়াও কমিটির দায়িত্বের মধ্যে থাকবে।

সরকারি সূত্রে জানা গেছে, বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি, খাদ্যপণ্য ও পরিবহন ব্যয়ের সম্ভাব্য অস্থিরতার প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কতটা পড়তে পারে তা বিশ্লেষণ করাই হবে কমিটির প্রধান কাজ। একইসঙ্গে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ, মূল্যস্ফীতি এবং রফতানি বাণিজ্যের ঝুঁকি—এসব বিষয়ও পর্যালোচনা করা হবে।

কমিটির মূল্যায়নের ভিত্তিতে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজনীয় নীতি সমন্বয়, আর্থিক সহায়তা এবং জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এর মধ্যে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থায়ন নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এডিবিসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদারদের কাছ থেকে সম্ভাব্য অর্থায়ন নিয়ে আলোচনার প্রস্তুতি চলছে।

অর্থনীতির জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ

অর্থনীতিবিদদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, জ্বালানি আমদানি ব্যয় এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি একাধিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বহুপাক্ষিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর বাজেট সহায়তা ও স্বল্পসুদে ঋণ বৈদেশিক অর্থায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি এডিবির সম্ভাব্য এ অর্থায়ন বাস্তবায়িত হয় তাহলে তা স্বল্পমেয়াদে অর্থনীতির ওপর চাপ কিছুটা কমাতে সহায়তা করতে পারে। তবে, দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং কাঠামোগত সংস্কার জোরদার করা জরুরি বলে মনে করছেন তারা।