ইরান-ইসরায়েল সংঘাতে বিশ্ব অর্থনীতির পুনরুদ্ধার বাধাগ্রস্ত, মূল্যস্ফীতি বাড়ার শঙ্কা
ইরান-ইসরায়েল সংঘাতে বিশ্ব অর্থনীতি বাধাগ্রস্ত, মূল্যস্ফীতি বাড়ার শঙ্কা

ইরান-ইসরায়েল সংঘাতে বিশ্ব অর্থনীতির পুনরুদ্ধার বাধাগ্রস্ত, মূল্যস্ফীতি বাড়ার শঙ্কা

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলার প্রভাবে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতির ধাক্কা বিশ্ব অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনাকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। চলতি বছর নাজুক বিশ্ব অর্থনীতি গতি পাবে বলে যে আশা করা হয়েছিল, এই সংঘাত সেটিকে বিলম্বিত করতে পারে বলে তাঁরা উল্লেখ করেছেন।

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও বৈশ্বিক প্রভাব

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী তেলবাহী ট্যাংকারকে সুরক্ষা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম ক্রমাগত বাড়ছে। বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিনির্ধারক ও অর্থনীতিবিদেরা সতর্ক করেছেন, এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্বজুড়ে খুচরা পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেতে পারে। পাশাপাশি চলতি বছরের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও সংশোধন করার প্রয়োজন হতে পারে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা শুক্রবার বলেন, জ্বালানির দাম ১০ শতাংশ বেড়ে যদি এক বছর স্থায়ী হয়, তবে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৪০ বেসিস পয়েন্ট (দশমিক ৪০ শতাংশ) বাড়তে পারে। এর ফলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দশমিক ১–২ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। জর্জিয়েভা মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গকে জানান, বিশ্ব অর্থনীতি দারুণ সহনশীলতা দেখিয়েছে, ধাক্কার পর ধাক্কা সত্ত্বেও বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৩ শতাংশে রয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের উদ্বেগ ও বাজার অস্থিরতা

কিছু অর্থনীতিবিদ মনে করেন, জ্বালানি ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়া সংকটের কেবল একটি দিক। তাঁদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের শেয়ারের অস্থিরতা ও যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি শুল্ক নিয়ে বাজারে আগে থেকেই নানা উদ্বেগ ছিল। এখন ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার ফলে আর্থিক বাজার আরও অস্থিতিশীল হয়ে পড়তে পারে।

নিউইয়র্কভিত্তিক বিনিয়োগ ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাকস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ও ব্রিটিশ সরকারের সাবেক উপদেষ্টা লর্ড জিম ও’নিল বলেন, বৈশ্বিক স্থিতিশীল পরিবেশে এই যুদ্ধ শুরু হয়েছে, বিষয়টি তেমন নয়। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতের বিমানবন্দর, তেল শোধনাগার ও গ্যাস প্ল্যান্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ইরান এরই মধ্যে রকেট ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। দেশটি এখন অঞ্চলটির ৪৫০টির বেশি লোনাপানি মিঠা করার (ডিস্যালিনেশন) প্ল্যান্ট লক্ষ্য করে হামলা চালালে সেখানে সামাজিক অস্থিরতা শুরু হতে পারে।

হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব ও তেলের দাম বৃদ্ধি

বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। অতীতে তেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার অভিজ্ঞতা এবং বিভিন্ন গবেষণার ওপর ভিত্তি করে ব্লুমবার্গ ইকোনমিকস জানিয়েছে, বাজারে তেলের সরবরাহ ১ শতাংশ কমলে দাম বাড়ে প্রায় ৪ শতাংশ। তাই এই প্রণালি যদি কয়েক মাসের জন্য বন্ধ হয়ে যায়, তবে তেলের দাম ইরান যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। এতে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম বেড়ে ১০৮ ডলারে পৌঁছাতে পারে।

অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের অনুমান, চলতি বছরের শেষে গিয়ে যুক্তরাজ্য এবং ইউরোজোনে (ইউরোপীয় ইউনিয়নের যেসব দেশ ইউরো ব্যবহার করে) মূল্যস্ফীতি আগের পূর্বাভাসের চেয়ে দশমিক ৫–৬ শতাংশ পয়েন্ট বেশি হতে পারে। গত জানুয়ারিতে যুক্তরাজ্যে মূল্যস্ফীতি ছিল ৩ শতাংশ, আর ফেব্রুয়ারিতে ইউরোজোনে তা ছিল ১ দশমিক ৯ শতাংশ।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রভাব

যুক্তরাষ্ট্রের চলতি বছরের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস এখনো ২ দশমিক ২ শতাংশে অপরিবর্তিত রয়েছে। এর কারণ হলো, পাইকারি বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি দেশটির ফ্র্যাকিং (তেল ও গ্যাস উত্তোলনকারী) কোম্পানিগুলোর বড় মুনাফার মাধ্যমে আংশিকভাবে সামলানো হচ্ছে। এসব কোম্পানি দেশটিতে উৎপাদিত গ্যাস চড়া দামে বিক্রি করে বড় অঙ্কের মুনাফা করতে পারবে, যা জ্বালানি আমদানির বাড়তি খরচকে পুষিয়ে দেবে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তারা এখন থেকেই সরাসরি আর্থিক চাপের মুখে পড়ছেন। অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ১৭ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় ফিলিং স্টেশনে তেলের দাম এরই মধ্যে বেড়েছে। সাধারণত বিশ্ববাজারে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১ ডলার বাড়লে খুচরা পর্যায়ে তেলের দাম প্রায় ২ দশমিক ৫ সেন্ট বাড়ে। জ্বালানির মূল্য পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান গ্যাসবাডির তথ্যমতে, শনিবার থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সব জায়গায় প্রতি গ্যালন তেলের দাম গড়ে ১৫ সেন্ট বেড়েছে।

যুক্তরাজ্যের চিন্তন প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল রিসার্চের মতে, এ সংঘাতের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হলে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দশমিক ২ শতাংশ কমে যেতে পারে। যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে সরকারি পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ১ শতাংশ হওয়ার কথা থাকলেও তা কমে দশমিক ৯ শতাংশে নেমে আসতে পারে। একইভাবে ইউরোপীয় কমিশনের পূর্বাভাস, ইউরোজোনের প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ২ শতাংশ থেকে কমে ১ শতাংশে নেমে আসতে পারে।

রাজনৈতিক প্রভাব ও সাধারণ মানুষের সংকট

নিত্যপণ্যের বাড়তি দামের চাপে থাকা সাধারণ মানুষের জন্য এটি নতুন সংকট তৈরি করবে। মে মাসে যুক্তরাজ্যের স্থানীয় নির্বাচন ও নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এটি একটি বড় রাজনৈতিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। গত মাসে যুক্তরাজ্যের অফিস ফর ন্যাশনাল স্ট্যাটিসটিকসের এক জরিপে দেখা গেছে, ৮৮ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক জীবনযাত্রার ব্যয়কে নিজেদের প্রধান সমস্যা বলে মনে করেন। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যভিত্তিক জরিপ সংস্থা ইউগভের সাম্প্রতিক এক সমীক্ষা বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৪২ শতাংশ নাগরিক দেশটির বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা দুর্বল বলে মনে করেন।

ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংকের (ইসিবি) নীতিনির্ধারকেরা গত বৃহস্পতিবার সতর্ক করে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এ সংঘাত যদি দীর্ঘায়িত হয় এবং আরও দেশ এতে জড়িয়ে পড়ে, তবে ইউরোজোনে মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে এবং প্রবৃদ্ধি থমকে যাবে। ইসিবির ভাইস প্রেসিডেন্ট লুইস ডি গুইন্ডোস বলেন, ‘আমাদের প্রাথমিক ধারণা ছিল, এ সংঘাত স্বল্পস্থায়ী হবে। কিন্তু এটি দীর্ঘায়িত হলে মুদ্রাস্ফীতির হার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।’