মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় অর্থনীতির ঝুঁকি মোকাবিলায় ৮ অর্থনীতিবিদের পরামর্শ
মধ্যপ্রাচ্য উত্তেজনায় অর্থনীতিবিদদের পরামর্শ

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় অর্থনীতির ঝুঁকি মোকাবিলায় বিশেষ পরামর্শ

চলমান মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় দেশের আট শীর্ষ অর্থনীতিবিদ গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পরামর্শ দিয়েছেন। শনিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সাথে এক বিশেষ বৈঠকে তারা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংরক্ষণ, নীতি সুদের হার না কমানো এবং ডলার বাজারের অস্বাভাবিক ওঠানামা নিয়ন্ত্রণের উপর জোর দিয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান এই বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ সংরক্ষণের জরুরি আহ্বান

অর্থনীতিবিদরা বৈঠকে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার পূর্ণ প্রভাব এখনো স্পষ্ট নয়। তবে ইরান-মার্কিন উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, প্রবাসী আয় এবং ডলার বাজারে নতুন চাপ সৃষ্টি হতে পারে। তাই অগ্রিম সতর্ক অবস্থান গ্রহণ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তাদের মতে, অপ্রয়োজনীয়ভাবে রিজার্ভ ব্যবহারের পরিবর্তে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংরক্ষণের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া উচিত। রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করে আমদানি অর্থায়নে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনেরও পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

জ্বালানি সরবরাহের বিকল্প উৎস অনুসন্ধান

বৈঠকে জ্বালানি সরবরাহের ঝুঁকি মোকাবিলায় মধ্যপ্রাচ্যের উপর নির্ভরতা কমানোর এবং বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করার উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রয়োজনে ব্রুনাই ও সিঙ্গাপুরসহ অন্যান্য দেশ থেকে জ্বালানি আমদানির সম্ভাবনা অনুসন্ধানের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা আরো বলেছেন যে বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লেও ভোক্তা পর্যায়ে তা সঙ্গে সঙ্গে সমন্বয় না করাই ভালো। এটি মুদ্রাস্ফীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

নীতি সুদের হার কমানো থেকে বিরত থাকার পরামর্শ

অর্থনীতিবিদরা বর্তমানে অপেক্ষাকৃত উচ্চ পর্যায়ে থাকা মুদ্রাস্ফীতির প্রেক্ষিতে নীতি সুদের হার কমানোর সিদ্ধান্ত না নেয়ার সুপারিশ করেছেন। তাদের মতে, বৈশ্বিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়া এবং বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি হলে তখন সুদের হার কমানোর বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। একইসাথে বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিশ্রুত ঋণ দ্রুত মুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণের উপর জোর দেয়া হয়েছে। তেল আমদানির জন্য ইসলামিক উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) থেকে অতিরিক্ত অর্থায়নের সম্ভাবনা অনুসন্ধানেরও পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

প্রবাসী আয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি ও প্রতিকার

বৈঠকে প্রবাসী আয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়টিও উঠে এসেছে। অর্থনীতিবিদরা বলেছেন যে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি অবনতি হলে শ্রমিকদের চলাচলে বিঘ্ন ঘটতে পারে, যা রেমিট্যান্স প্রবাহকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই প্রবাসীদের জন্য রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুততর করার উপর জোর দেয়া উচিত। বৈঠকে উপস্থিত একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অর্থনীতিবিদ জানান যে গভর্নরকে তিনটি প্রধান বিষয়ে মনোযোগ দেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে - রিজার্ভ নিঃশেষ না করা, আপাতত নীতি সুদের হার না কমানো এবং বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে ডলারের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি রোধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা।

গভর্নরের প্রতিশ্রুতি ও বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব

গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বৈঠকে বলেছেন যে তিনি সততা ও পেশাদারিত্বের সাথে তার দায়িত্ব পালন করবেন এবং কোনো রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করবেন না। একইসাথে তিনি ব্যাংকগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য আহ্বান জানান। অর্থনীতিবিদরা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়মিত পর্যবেক্ষণের জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠনেরও প্রস্তাব দিয়েছেন। তাদের মতে, যদি এমন কমিটি নিয়মিত বিশ্লেষণ ও পরামর্শ প্রদান করে তবে নীতি প্রণয়ন সহজ হবে এবং বাজারে অপ্রয়োজনীয় আতঙ্ক সৃষ্টির ঝুঁকিও হ্রাস পাবে।