মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় জ্বালানি তেলের দাম সর্বোচ্চ, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে সংকটের আশঙ্কা
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা ও সংঘাতের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম গত দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কাতার এনার্জির প্রধান নির্বাহী এবং দেশটির জ্বালানি মন্ত্রী সাদ আল-কাবি সতর্ক করে বলেছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও গ্যাস রপ্তানিকারক দেশগুলো আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই উৎপাদন স্থগিত করতে বাধ্য হতে পারে। তার এই সতর্কবার্তার পর বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা জোরালো হয়েছে।
তেলের দাম বৃদ্ধি ও সম্ভাব্য প্রভাব
গতকাল শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ৯ শতাংশের বেশি বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৯৩ ডলার ছাড়িয়েছে, যা ২০২৩ সালের শরতের পর সর্বোচ্চ। জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, তেলের দাম বৃদ্ধির এই ধারা অব্যাহত থাকলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় ব্যাপক প্রভাব পড়বে। পরিবহন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি হিটিং, খাদ্যপণ্য ও আমদানিকৃত পণ্যের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। সাদ আল-কাবি সতর্ক করে বলেন, “যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হলে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১৫০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।”
কাতার এনার্জির উৎপাদন বন্ধ ও বৈশ্বিক সরবরাহ ঝুঁকি
কাতার এনার্জি জানিয়েছে, তাদের এলএনজি উৎপাদন কেন্দ্রে সামরিক হামলার কারণে উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে। সাদ আল-কাবির মতে, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্বজুড়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধি স্থবির হয়ে পড়তে পারে। জ্বালানির দাম দ্রুত বাড়বে এবং কলকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বাজারে পণ্যের তীব্র সংকট দেখা দিতে পারে। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে। গত সপ্তাহে ইরান ও মার্কিন-ইসরায়েল সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে চীন, ভারত ও জাপানের মতো বড় অর্থনীতির দেশগুলো—যারা অপরিশোধিত তেলের জন্য এই রুটের ওপর নির্ভরশীল—তারা সম্ভাব্য জ্বালানি সংকটের মুখে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন ও সরকারি পদক্ষেপ
রাইস্ট্যাড এনার্জির বিশ্লেষক হোর্হে লিওন পরিস্থিতিটিকে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি ‘বাস্তব ঝুঁকি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, “আমরা এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে বোঝা কঠিন এটি সাময়িক সংকট, নাকি একটি বড় অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সূচনা। যদি সরবরাহ ব্যবস্থা দুই সপ্তাহের বেশি ব্যাহত থাকে, তবে বৈশ্বিক সামষ্টিক অর্থনীতিতে এর গুরুতর প্রভাব পড়বে।” যুক্তরাজ্যের বাজার তদারকি সংস্থা সিএমএ এবং জ্বালানি নিয়ন্ত্রক সংস্থা অফজেম পরিস্থিতি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। ইতোমধ্যে দেশটিতে পেট্রল ও ডিজেলের দাম ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর হাতে কয়েক সপ্তাহের তেল মজুত থাকলেও তা শেষ হয়ে গেলে এবং উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ববাজারে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে। সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশের সরকার তাদের জরুরি তেল মজুত বাজারে ছাড়ার পরিকল্পনা করতে পারে—যেমনটি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় করা হয়েছিল।
