যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যচুক্তি: বাংলাদেশের জন্য বৈষম্যমূলক শর্ত ও আইনি অনিশ্চয়তা
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যচুক্তি: বৈষম্যমূলক শর্ত ও অনিশ্চয়তা

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যচুক্তি: বাংলাদেশের জন্য বৈষম্যমূলক শর্ত ও আইনি অনিশ্চয়তা

২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প 'অর্থনৈতিক স্বাধীনতার দিন' ঘোষণা করেন এবং 'জাতীয় জরুরি অবস্থা'র কথা বলে পাল্টা শুল্ক আরোপের নির্বাহী আদেশ সই করেন। ট্রাম্পের দাবি ছিল, এই নীতি দেশীয় উৎপাদন বাড়াবে, চাকরি তৈরি করবে এবং ট্রিলিয়ন ডলার আয় এনে দেবে। তবে অর্থনীতিবিদরা এই শুল্ক গণনার ফর্মুলাকে সরলীকৃত বলে উল্লেখ করেন এবং এটিকে ভূরাজনৈতিক স্বার্থরক্ষার কৌশল হিসেবে চিহ্নিত করেন।

আইনি চ্যালেঞ্জ ও অন্তর্বর্তী সরকারের চুক্তি

২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে পাঁচটি মার্কিন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা করে। তাদের যুক্তি ছিল, আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইনের অধীনে শুল্ক আরোপের ক্ষমতা কংগ্রেসের, প্রেসিডেন্টের নয়। এই মামলা চলাকালে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে 'নন-ডিসক্লোজার' চুক্তি সই করে। চুক্তির শর্তাবলি গোপন থাকায় নাগরিকদের মধ্যে প্রশ্ন জাগে এবং সমালোচনার সৃষ্টি হয়।

আগস্ট মাসে ফেডারেল আপিল আদালত রায় দেন যে বৈশ্বিক শুল্কের অধিকাংশই অবৈধ। এই রায় ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতির মূল ভিত্তিতে বড় আঘাত হানে। এরপর মামলা সুপ্রিম কোর্টে যায় এবং পাঁচ মাস ধরে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তির আলোচনা চালিয়ে যায়। প্রথমত, এই অবস্থায় নতুন চুক্তি করা যেকোনো দেশকে অনিশ্চিত আইনি পরিস্থিতির সম্মুখীন করে। দ্বিতীয়ত, ট্যারিফগুলো মার্কিন ভোক্তা ও ব্যবসার ওপর কর হিসেবে কাজ করছিল এবং শুল্ক ফেরতের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। তৃতীয়ত, নির্বাহী বিভাগ শুল্ককে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানাতে পারে এই আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিশ্রুতির ওপর আস্থা কমে যায়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বৈষম্যমূলক শর্ত ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

নির্বাচনের তিন দিন আগে, ৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করে। এর মাত্র দশ দিন পর ২০ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট পাল্টা শুল্ককে অবৈধ ঘোষণা করেন। দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলো ধীরে এগোচ্ছে এবং শর্ত পর্যালোচনা করছে, কিন্তু বাংলাদেশ তাড়াহুড়া করে চুক্তি স্বাক্ষর করে। তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এই চুক্তিকে সাফল্য হিসেবে আখ্যায়িত করেন, যদিও চুক্তির শর্তগুলো বাংলাদেশের প্রতি বৈষম্যমূলক।

২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ভারত বিরোধিতার বক্তব্য শক্তিশালী হয়। এই পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনৈতিক স্বার্থ বস্তুনিষ্ঠভাবে পর্যালোচনা করতে ব্যর্থ হয়। 'ভারতীয় আধিপত্য বনাম যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য'—এই দুইয়ের মধ্যে বেছে নেওয়ার তাগিদ থেকে দ্রুত চুক্তি করা হয়েছে বলে মনে হতে পারে। তৈরি পোশাক খাতের চাপও অজুহাত হিসেবে কাজ করে।

ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক বেশি ধার্য করার কৌশলগত কারণ ছিল প্রতিটি দেশের সঙ্গে আলাদাভাবে দর-কষাকষিতে এগিয়ে থাকা। বাংলাদেশের জন্য প্রথমে ৩৭ শতাংশ শুল্ক ধার্য করে ধীরে ধীরে তা নামিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়। শেষ পর্যন্ত শুল্ক ১৯ শতাংশ করার সময় বাণিজ্যচুক্তিতে শুধু তৈরি পোশাক পাল্টা শুল্কমুক্ত করার জন্য বেশ কিছু শর্ত দেয় যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহারের শর্ত এবং রপ্তানির পরিমাণ নির্ধারণের অধিকার অন্তর্ভুক্ত। ব্যবসায়ীরা চুক্তির এসব শর্তের বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

অসম চুক্তির অর্থনৈতিক প্রভাব

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তিটি বাংলাদেশের জন্য নানা কারণে বৈষম্যমূলক। এ চুক্তিতে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যে মোট শুল্ক প্রায় ৩৪ দশমিক ৫ শতাংশে উঠেছে; অর্থাৎ তৈরি পোশাক রপ্তানি সুবিধার বদলে কার্যত বাড়তি শুল্কের বোঝা চাপানো হয়েছে। এর বিনিময়ে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের ৬ হাজার ৭১০টি পণ্যে শুল্কছাড় দিচ্ছে আর নিজে পাচ্ছে মাত্র ১ হাজার ৬৩৮টি পণ্যে সীমিত পাল্টা শুল্কছাড়। এতে স্থানীয় কৃষিশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত ও রাজস্ব আয় কমার ঝুঁকি আছে।

সার্বিকভাবে যে পোশাক ব্যবসায়ীদের কথা বিবেচনা করা হয়েছিল, তাদের স্বার্থরক্ষাও এখন অনিশ্চিত হয়ে গেছে। ভারতের ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ শুল্ক আর বাংলাদেশের জন্য ১৯ শতাংশ দেখিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার যে সাফল্যের দাবি করেছিল, মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ের মধ্য দিয়ে তা বাতিল হয়ে যায়। সব দেশের জন্য এখন ১০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক কার্যকর। এ থেকে বোঝা যায়, জনতুষ্টিবাদী বক্তব্য এবং বিশেষ ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর স্বার্থ বিবেচনা করে নেওয়া সিদ্ধান্ত দেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

বর্তমান সরকারের করণীয় ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব

চুক্তিতে উল্লেখ আছে, চুক্তি সই করার ৬০ দিনের মধ্যে বাংলাদেশ তা থেকে বের হয়ে আসতে পারবে। যেহেতু চুক্তিটি এখনো সংসদে অনুমোদন হয়নি, কাজেই বর্তমান সরকার সংসদে এই চুক্তি পর্যালোচনা করার জন্য সময় চাইতে পারে। সে ক্ষেত্রে এখনই এই চুক্তি কার্যকর হবে না। কিন্তু এর আগেই ট্রাম্পের একজন বিশেষ দূত দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর ৩ মার্চ আলোচনার জন্য ঢাকায় এসেছেন। লক্ষণীয় হলো, বাণিজ্যচুক্তি ছাড়াও বাংলাদেশের সঙ্গে দুটি বিশেষায়িত প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।

প্রতিরক্ষা চুক্তির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হচ্ছে, বেশি দামে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কিনতে বাধ্য থাকা এবং চুক্তির শর্তের কারণে অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বাধাগ্রস্ত হওয়া। বাংলাদেশ ভূরাজনৈতিকভাবে একটি সংবেদনশীল দেশ। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করেই বাংলাদেশকে নিজের স্বার্থ রক্ষা করতে হয়। এর ফলে এ ধরনের চুক্তি ভবিষ্যতের জন্য সংকট তৈরি করতে পারে।

বর্তমান সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই অসম বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে কী করবে তা এখন দেখার বিষয়। ইতিমধ্যে বাজেটে চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বরাদ্দ রাখা হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেশি দামে গম কেনা শুরু হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান নির্বাচিত সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তির ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা আলোচিত হয়েছে।

সুপারিশ ও সমাপ্তি

সম্প্রতি ইসরায়েলের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রও ইরানে আক্রমণ করেছে। এই আক্রমণের বিষয়টি অন্য দেশগুলোর ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে সংসদ অধিবেশন শুরুর আগেই ট্রাম্পের বিশেষ দূতের প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রস্তাব নিয়ে বাংলাদেশ সফরে এসেছেন। অন্যদিকে ইরান হরমুজ প্রণালি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় তেলের দাম বেড়ে যাচ্ছে। এই সংকটপূর্ণ পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পাশাপাশি, নতুন সরকারের দায়িত্ব দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই অর্থনৈতিক কাঠামো নির্মাণ করা।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি কার্যকর হলে বাংলাদেশের অর্থনীতি কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, সেটা নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ পর্যালোচনা করা এখন প্রধান দায়িত্ব। চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশকে মার্কিন বোয়িং বিমান, বিপুল পরিমাণ এলএনজি ও কৃষিপণ্য কিনতে হলে নিকটবর্তী বাজার থেকে সস্তা পণ্য আমদানির সুযোগ কমে যাবে এবং সরকারি ভর্তুকির চাপ ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি আরও বাড়বে। বিদ্যুৎ, টেলিকম, অবকাঠামো, তেল, গ্যাস, বিমা ইত্যাদি খাতে মার্কিন কোম্পানিকে বেশি সুবিধা দিতে গেলে দেশীয় শিল্প ও কৌশলগত খাতগুলো দুর্বল হয়ে যাবে।

নিরাপত্তার নামে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা ও বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আবার যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী কোনো বাণিজ্যচুক্তি করলে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি বাতিল করে আবার শাস্তিমূলক উচ্চ শুল্ক আরোপ করতে পারবে। এ রকম অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র এখন যে মনস্তাত্ত্বিক ও কূটনৈতিক চাপ তৈরি করেছে, তাতে বাংলাদেশের বিচলিত হওয়া চলবে না। অন্তর্বর্তী সরকার যে ভুল করেছিল, নির্বাচিত সরকার সেই একই ভুল করলে বাংলাদেশ তড়িঘড়ি করে আরেকটি সুযোগ হারাবে।

বাংলাদেশের উচিত, চাপের কাছে হার না মেনে পর্যালোচনার জন্য সময় চাওয়া; আইনি জটিলতা পর্যবেক্ষণ করা, দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা স্মরণ করিয়ে দেওয়া এবং সর্বোপরি জাতীয় সংসদের মাধ্যমে চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন ও সংশোধন করতে চাওয়ার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়ে দেওয়া।

মোশাহিদা সুলতানা, সহযোগী অধ্যাপক, অ্যাকাউন্টিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।