মধ্যপ্রাচ্য সংকটে ডলারের উত্থান: নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ফিরেছে কি ঐতিহ্যবাহী মুদ্রা?
ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্মিলিত হামলার পর বৈশ্বিক মুদ্রাবাজারে মার্কিন ডলারের উল্লেখযোগ্য উত্থান নতুন করে আলোচনার সূত্রপাত করেছে। বিনিয়োগকারী ও বিশ্লেষকদের মতে, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার এই সময়ে ডলার আবারও তার ঐতিহ্যগত 'সংকটকালীন মুদ্রা' বা 'ক্রাইসিস কারেন্সি' হিসেবে নিজের অবস্থান পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে।
ডলারের শক্তিশালী প্রত্যাবর্তন
সোমবার প্রধান প্রায় সব মুদ্রার বিপরীতে মার্কিন ডলার শক্তিশালী হয়েছে, যেখানে ডলার সূচকের মান প্রায় ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে সাত মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। কানাডার স্কশিয়া ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা কৌশলবিদ এরিক থিওরেট এই দিনটিকে ডলারের জন্য 'ধ্রুপদি দিন' হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ এড়িয়ে নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে ডলারের দিকে ঝুঁকেছেন, যা সংকটকালে এর ঐতিহাসিক ভূমিকাকে সমর্থন করে।
পূর্বের সংশয় ও বর্তমান অবস্থা
গত কয়েক মাস ধরে ডলার নিয়ে বাজারে ব্যাপক সংশয় বিরাজ করছিল, বিশেষ করে গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপের পর বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে পতন দেখা দিলেও ডলার প্রত্যাশিতভাবে শক্তিশালী হতে পারেনি। এতে প্রশ্ন উঠেছিল যে চাপের সময়ে ডলারের আকর্ষণ কি ফিকে হয়ে যাচ্ছে। তবে বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটে ডলারের শক্তিশালী অবস্থান সেই সন্দেহ কিছুটা দূর করেছে।
মজার বিষয় হলো, সাধারণত সোনার দাম বাড়লে ডলারের দাম কমে, কিন্তু এবার ইরানে হামলার পর দুটোর দামই একসঙ্গে বেড়েছে। গোল্ড প্রাইস ডট অর্গের তথ্য অনুসারে, সোমবার সোনার দাম আউন্সপ্রতি ৮৮ ডলারের বেশি বেড়ে ৫ হাজার ৩৬৬ ডলার ছাড়িয়েছে, যা শীঘ্রই সর্বকালের রেকর্ড ভাঙতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ডলারের শক্তির পেছনের কারণ
বিশ্লেষকরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক বাজারের গভীরতা ও শক্ত ভিত ডলারের জন্য একটি বড় সহায়ক হিসেবে কাজ করে। এরিক থিওরেটের ভাষায়, 'বড় পরিসরে ঝুঁকি কমাতে মার্কিন ট্রেজারি বাজারই একমাত্র বাজার, যা ঝুঁকির মাত্রা সামলাতে পারে।' সংকটের সময় বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা ট্রেজারি বিল ও বন্ডের দিকে ঝুঁকলেই স্বাভাবিকভাবে ডলারের চাহিদা বৃদ্ধি পায়।
যুক্তরাষ্ট্রের মার্সার অ্যাডভাইজার্সের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা ডন ক্যালকাগনি যোগ করেন, 'ডলারের বিকল্প নেই, এটাও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। অস্থিরতার সময় বিনিয়োগকারীদের জন্য ডলার থেকে দূরে থাকা কঠিন, তাই নিরাপদ সম্পদ হিসেবে এর নৈপুণ্যে আমি তেমন অবাক নই।'
ঝুঁকির উৎস ও ডলারের ভবিষ্যৎ
গত বছর ডলার কেন নিরাপদ বিনিয়োগ মাধ্যম হিসেবে আকর্ষণীয় হতে পারেনি, তার ব্যাখ্যায় বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন যে তখন ঝুঁকির উৎস ছিল যুক্তরাষ্ট্র নিজেই। ওয়াশিংটনের শুল্ক নীতি বিশ্ববাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছিল, ফলে যে দেশ অনিশ্চয়তার উৎস, তার মুদ্রায় আশ্রয় নিতে বিনিয়োগকারীদের অনীহা দেখা দেয়।
ম্যাক্রো হাইভের গবেষক বেঞ্জামিন ফোর্ড বলেন, 'ট্রাম্পের তথাকথিত স্বাধীনতা দিবসের ঘোষণায় ডলারের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়েছিল, কিন্তু এখন তেলের দাম বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে বিনিয়োগকারীরা আবার ডলারের দিকে ফিরছেন।' বিএনওয়াইয়ের জন ভেলিসের মতে, যখন সংকট আন্তর্জাতিক ও ভূরাজনৈতিক হয়, তখন ডলারের আবেদন অটুট থাকে, যা বর্তমান বাজারে স্পষ্টভাবে লক্ষণীয়।
অব্যাহত বিতর্ক ও সতর্কতা
তবে সবাই এতটা নিশ্চিত নন যে ডলার তার পুরোনো মর্যাদা সম্পূর্ণভাবে ফিরে পেয়েছে। রাবোব্যাংকের জেন ফোলি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, 'এবারের সংকটে ডলারের অবস্থান দেখে মনে হতে পারে সে ফিরে এসেছে, কিন্তু বিতর্ক এখনও শেষ হয়নি।'
স্টেট স্ট্রিট ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্টের অ্যারন হার্ডের মতে, জ্বালানি সংকটের বাইরে অন্য ধাক্কায় ডলার একইভাবে শক্তিশালী নাও থাকতে পারে। তিনি বলেন, 'যদি সাধারণ অর্থনৈতিক ভীতি দেখা দেয়, তখন ডলার এতটা কার্যকর নাও হতে পারে। আগে বড় সংকটে শেয়ারবাজার পড়ে গেলেও ডলার শক্তিশালী হতো, কিন্তু ভবিষ্যতে ডলার ও ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ একসঙ্গে অস্থির হয়ে যেতে পারে।'
ফোর্ড আরও যোগ করেন, স্বল্প মেয়াদে ডলারের ভবিষ্যৎ তেলের দামের গতিপথের ওপর নির্ভর করবে। তেলের দাম বাড়লে ও ঝুঁকি নেওয়ার আগ্রহ কমলে ডলারের চাহিদা বাড়বে, কিন্তু তেলের দাম কমে গেলে সুইস ফ্রাঁ বা জাপানি ইয়েনের মতো প্রচলিত নিরাপদ মুদ্রাগুলো আবার শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, মধ্যপ্রাচ্য সংকটে ডলারের উত্থান ইঙ্গিত দেয় যে এটি এখনও বৈশ্বিক অস্থিরতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বিবেচিত হয়, যদিও এর স্থায়িত্ব নিয়ে বিতর্ক ও সতর্কতা অব্যাহত রয়েছে।
