যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যচুক্তি পর্যালোচনার দাবি শিল্পপতি-গবেষকদের, বৈঠকে মন্ত্রী-সচিব
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যচুক্তি পর্যালোচনার দাবি, বৈঠকে মন্ত্রী

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে শিল্পপতি-গবেষকদের উদ্বেগ, পর্যালোচনার তাগিদ

বাংলাদেশের বিশিষ্ট শিল্পপতি, ব্যবসায়ী ও গবেষকেরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি জরুরিভাবে পর্যালোচনা করার দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, চুক্তির বিভিন্ন ধারা বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী এবং এতে উদ্বেগজনক বিষয় রয়েছে। আজ বুধবার ঢাকায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে এক বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা এই পরামর্শ দেন। বৈঠকে সরকারি পক্ষ থেকে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম ও বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।

চুক্তি পর্যালোচনা ও কৌশল নির্ধারণের আহ্বান

বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা জোর দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট পাল্টা শুল্ককে অবৈধ ঘোষণা করেছেন, যা কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে। তবে এই কাজটি ধীরে-সুস্থে এবং পরিকল্পিতভাবে করতে হবে। তাঁরা উল্লেখ করেন, চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার করলে কীভাবে শূন্য শুল্ক পাওয়া যাবে, তা পরিষ্কার করা দরকার। এমনকি এই চুক্তি কীভাবে সম্পাদিত হলো, তা-ও খোলাসা করা প্রয়োজন।

বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, ‘ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের ডেকেছি। চুক্তিসহ নানা বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। কোন খাতের কী সমস্যা, সেগুলো নিয়েও আলোচনা হয়েছে।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার ৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি করেছে, সে ব্যাপারে এখনো বলার মতো অবস্থা তৈরি হয়নি। আমরা দেখছি যে এর পক্ষে-বিপক্ষে কী আছে। একটি চুক্তির পক্ষে-বিপক্ষে দুটি দিক থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। আমরা এগুলো পর্যালোচনা করব। এরপর করণীয় ঠিক করব।’

শিল্পপতি ও গবেষকদের মতামত

ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকিন আহমেদ বৈঠকে অংশ নিয়ে বলেন, ‘চুক্তি যেহেতু হয়েই গেছে এবং দেশটিও যুক্তরাষ্ট্র, ফলে হুট করে কিছু করা যাবে না। যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের রায়ের আগে আমাদের মতো অনেক দেশ একই ধরনের চুক্তি করেছে। আমরা এখন দেখতে পারি যে তারা কী ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। আমাদের পরিকল্পিতভাবে এগোতে হবে।’

গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, ‘এটা সত্যি যে চুক্তিটিতে বাংলাদেশের স্বার্থ পুরোপুরিভাবে সংরক্ষিত হয়নি; বরং এতে কিছু উদ্বেগজনক ধারাও আছে। যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট যে রায় দিয়েছেন, তাকে কাজে লাগিয়ে আমরা কোনো সুযোগ নিতে পারি কি না, সেই চেষ্টাও করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের তুলার ব্যবহার ও বিপরীতে শূন্য শুল্ক নিয়ে বড় ধরনের ধোঁয়াশা আছে। চুক্তি পর্যালোচনা করে এগুলো পরিষ্কার করা দরকার।’ তিনি চুক্তি করার প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এবং ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা নেওয়ার ওপর জোর দেন।

তৈরি পোশাক খাতের প্রতিক্রিয়া

বাংলাদেশ নিট পোশাক উৎপাদক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তির একটা ভালো দিক হচ্ছে দেশটির তুলা ব্যবহার করে উৎপাদিত তৈরি পোশাক রপ্তানিতে পাল্টা শুল্ক শূন্য হবে। এ জন্য কী কী শর্ত মানতে হবে, সেটি জানা দরকার। তৈরি পোশাক খাতের জন্য মার্কিন চুক্তি যদি দেশের জন্য ভালো না হয়, তাহলে সেটি পুনর্বিবেচনা করার অনুরোধ করেছি বৈঠকে।’

বৈঠকে অংশগ্রহণকারী অন্যান্য ব্যক্তিবর্গ

বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন:

  • এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক আবদুর রহিম খান ও সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন
  • বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান
  • মেট্রো চেম্বারের সভাপতি কামরান টি রহমান
  • বিটিএমএর সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল
  • বাংলাদেশ চেম্বারের সভাপতি আনোয়ার-উল-চৌধুরী
  • ওষুধ শিল্প সমিতির সভাপতি আবদুল মুক্তাদির
  • সিরামিক উৎপাদক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মইনুল ইসলাম
  • হিমায়িত খাদ্য রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ শাহজাহান চৌধুরী
  • মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল
  • ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সিমিন রহমান
  • সিটি গ্রুপের পরিচালক শম্পা রহমান
  • সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন
  • রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক

দ্রব্যমূল্য ও চাঁদাবাজি প্রসঙ্গ

বৈঠকে দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতি নিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যেসব পণ্য আমদানি তদারকি করে, সেগুলোর দাম বাজারে স্বাভাবিক রয়েছে। তবে কিছু পণ্য, বিশেষ করে সবজিজাতীয়, একসঙ্গে কেনার কারণে দাম বেড়েছে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘রমজানের শুরুতে অনেকে একসঙ্গে এক মাসের বাজার করেন। বিক্রেতারাও পরিস্থিতি ও শূন্যতার সুযোগ নেন। ৪০-৫০ টাকার লেবু ১২০ টাকা হয়ে গেছে ওই পরিস্থিতিতে। এরপর কিন্তু ঠিকই আবারও আগের দামে ফিরে এসেছে।’

চাঁদাবাজি সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘চাঁদাবাজি বন্ধে এত দিন বিভিন্ন সরকার আশ্বাস দিলেও কাজ হয়নি। অপেক্ষা করুন, আমরা কাজ করে দেখাব।’