যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতিতে ঘন ঘন পরিবর্তন, বাংলাদেশের রফতানি বাজারে অনিশ্চয়তা
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতিতে পরিবর্তন, বাংলাদেশের রফতানিতে অনিশ্চয়তা

যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতিতে ঘন ঘন পরিবর্তন, বাংলাদেশের রফতানি বাজারে অনিশ্চয়তা

গত ৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যার মাধ্যমে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর শুল্কের হার ১৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপিত পাল্টা শুল্ক অবৈধ ঘোষণা করে দেয়। এর পরপরই ট্রাম্প ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের আওতায় নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন, যা একদিন পর বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়। এই নতুন শুল্ক ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।

বাণিজ্যচুক্তির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি বাতিল হয়ে যাবে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। যদিও এখনও পর্যন্ত কেউ এ বিষয়ে স্পষ্টভাবে কিছু বলতে পারছেন না। আবার নতুন ১৫ শতাংশ শুল্ক বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে কিনা, তাও নিশ্চিত নন সংশ্লিষ্টরা। ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, "চুক্তিতে রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ কমানোর কথা বলা হলেও কত শতাংশ কটন ব্যবহার করলে শুল্ক সুবিধা মিলবে, তা স্পষ্ট নয়। এমনকি রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ শূন্য হলেও নিয়মিত প্রায় সাড়ে ১৬ শতাংশ শুল্ক বহাল থাকতে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে।"

রফতানিকারকদের মধ্যে স্বস্তি ও শঙ্কা

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেওয়ায় বাংলাদেশের রফতানিকারকদের মধ্যে স্বস্তি ও শঙ্কা—দুই অনুভূতিই কাজ করছে। সুপ্রিম কোর্ট পারস্পরিক শুল্ক বাতিল করার পর প্রথমে ১৫০ দিনের জন্য ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের কথা জানানো হলেও ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে তা বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়। এই শুল্কহার বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যচুক্তিতে নির্ধারিত ১৯ শতাংশের চেয়ে কম হলেও ঘন ঘন পরিবর্তনের কারণে দেশের সর্ববৃহৎ রফতানি বাজার ঘিরে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন শিল্পনেতা ও অর্থনীতিবিদরা।

বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা

বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, শুল্কহার কোথায় গিয়ে স্থির হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। ফলে বড় ও দীর্ঘমেয়াদি অর্ডারের বদলে ক্রেতারা ছোট চালানভিত্তিক ক্রয়ে ঝুঁকতে পারেন। এতে রফতানির ধারাবাহিকতা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, ট্রাম্পের ঘোষিত নতুন শুল্কহারও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে। তাসকীন আহমেদ আরও বলেন, "মার্কিন প্রশাসনের নীতিতে দ্রুত পরিবর্তন আসছে। তাই কৌশলগতভাবে বিষয়টি বিবেচনা করা জরুরি। চুক্তি বহাল থাকলে অবিলম্বে পুনরায় আলোচনায় বসে রিনেগোশিয়েট করা উচিত। আর চুক্তি বাতিল হলে সেটি বাংলাদেশের জন্য মঙ্গলজনক হতে পারে।"

শুল্ক কাঠামো পুনর্বিন্যাসের পর্যায়ে

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বজনীন আমদানি শুল্কহার নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে দেশটির সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের পর। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মূল সর্বজনীন বেসলাইন শুল্কহার প্রায় ৮ দশমিক ৩ শতাংশ। তবে অতীতে জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইন ব্যবহার করে এই গড় শুল্কহার বাড়িয়ে প্রায় ১৫ দশমিক ৩ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছিল। সাম্প্রতিক সুপ্রিম কোর্টের রায়ে আইইইপিএ ও ট্রেড অ্যাক্টের সেকশন ১২২ ব্যবহারের সুযোগ সীমিত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র আবার ৮ দশমিক ৩ শতাংশের বেসলাইন পর্যায়ে ফিরে এসেছে। ফলে আগের উচ্চ-শুল্ক কাঠামো কার্যত শিথিল হয়েছে।

পোশাক খাতে শুল্কের প্রভাব

নতুন করে সেকশন ১২২-এর অধীনে বৈশ্বিক ১৫ শতাংশ অতিরিক্ত সারচার্জ আরোপের ফলে পোশাক আমদানিতে শুল্কের বোঝা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বর্তমানে এইচএস ৬১ ও ৬২ অধ্যায়ভুক্ত পোশাকপণ্যে গড় এমএফএন শুল্কহার প্রায় ১৪.৭ শতাংশ। তবে উচ্চ পরিমাণে আমদানি হওয়া মৌলিক পণ্য যেমন তুলার টি-শার্ট ও ডেনিমের ক্ষেত্রে নিয়মিত এমএফএন শুল্ক গড়ের চেয়ে বেশি, প্রায় ১৬.৫ শতাংশ। এই পণ্যের ওপর সেকশন ১২২-এর অতিরিক্ত ১৫ শতাংশ সারচার্জ যোগ হলে বাংলাদেশের রফতানিকৃত তুলাজাত পোশাকে মোট শুল্কের হার দাঁড়ায় প্রায় ৩১.৫ শতাংশে। অপরদিকে কৃত্রিম তন্তু বা সিনথেটিক ফাইবারের তৈরি পোশাকে মূল এমএফএন শুল্কহার আরও বেশি, সাধারণত ২৫ থেকে ৩২ শতাংশের মধ্যে। এর সঙ্গে অতিরিক্ত ১৫ শতাংশ সারচার্জ যুক্ত হলে এসব পণ্যে মোট শুল্কের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় আনুমানিক ৪০ থেকে ৪৭ শতাংশে, যা নির্দিষ্ট পণ্যের ধরন অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।

রফতানিকারকদের প্রতিক্রিয়া

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন-বিজিএমইএ’র সভাপতি মাহমুদুল হাসান বাবু বলেন, "শুল্ক কমলে পণ্যের দাম কমে এবং ভোগ বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। সে বিবেচনায় পাল্টা শুল্ক বাতিল হওয়া 'মন্দের ভালো'। তবে ঘন ঘন শুল্ক পরিবর্তনে আমদানিকারকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।" তিনি আরও বলেন, "যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সবচেয়ে বড় সমস্যা এখন শুল্ক কাঠামোর অনিশ্চয়তা। বারবার শুল্ক পরিবর্তনের কারণে ক্রেতা ও ব্র্যান্ডগুলো দর নির্ধারণে দ্বিধায় পড়ছে। এই অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়বে।"

চুক্তির বর্তমান অবস্থা

বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বলেন, "বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চুক্তি সই হলেও তা এখনও কার্যকর হয়নি। চুক্তি কার্যকর করতে দুই দেশের নিজ নিজ আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে 'রেটিফিকেশন' প্রয়োজন। বাংলাদেশ আপাতত সেই অনুমোদন প্রক্রিয়ায় যাবে না। তবে যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের অনুমোদনের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, তখন বাংলাদেশ অবস্থান স্পষ্ট করবে।" তিনি আরও বলেন, "যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট পাল্টা শুল্ক অবৈধ ঘোষণা করার পর নতুন আইনের আওতায় প্রায় সব দেশের পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। যদি এই হার সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হয়, তাহলে বাংলাদেশের বিশেষ কিছু করার সুযোগ থাকবে না। তবে দেশভেদে শুল্কহারে পার্থক্য থাকলে বাংলাদেশ আলোচনায় বসবে।"

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান বলেন, "শুল্কহার পূর্বানুমানযোগ্য হওয়া পোশাক খাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।" তার মতে, আদালতের সিদ্ধান্ত আইনি অনিশ্চয়তা কিছুটা কমালেও হঠাৎ করে অর্ডার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। তিনি সতর্ক করেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি আবারও কঠোর বাণিজ্যিক পদক্ষেপ নেয়, তবে বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থায় নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনায় মঙ্গলবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন বলে জানা গেছে, যা এই অনিশ্চয়তা কাটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।