লিবিয়ায় রমজানে সংকট: মূল্যস্ফীতি, মুদ্রা অবমূল্যায়ন ও রাজনৈতিক বিভাজনে জনজীবন বিপর্যস্ত
লিবিয়ায় রমজানে মূল্যস্ফীতি ও রাজনৈতিক বিভাজনে সংকট

লিবিয়ায় রমজানে সংকট: মূল্যস্ফীতি, মুদ্রা অবমূল্যায়ন ও রাজনৈতিক বিভাজনে জনজীবন বিপর্যস্ত

লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং গভীর রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে লিবিয়ার অনেক নাগরিকের জন্য রমজান মাসটি ফিকে হয়ে গেছে। দীর্ঘদিনের শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের ১৫ বছর পরও দেশটি পূর্ব ও পশ্চিম অংশে বিভক্ত রয়ে গেছে। বিপুল তেল ও গ্যাস সম্পদ থাকা সত্ত্বেও জ্বালানিসহ বিভিন্ন পণ্যের সংকটে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।

পণ্য রেশনিং ও জ্বালানি সংকটে রমজানের আয়োজন ব্যাহত

রমজান মাসে সাধারণত লিবিয়ার মানুষ ইফতার ও সেহরির জন্য বাজার করেন এবং পরিবার-পরিজন নিয়ে ভালোমন্দ খাবারের আয়োজন করেন। কিন্তু এ বছর সুপারমার্কেটগুলো পণ্য রেশনিং করে সীমিত হারে বিক্রি করছে। অনেক পেট্রোল পাম্পে জ্বালানি নেই বললেই চলে। রাজধানী ত্রিপোলিতে এই সপ্তাহে অধিকাংশ এটিএমে নগদ অর্থের অভাব দেখা দিয়েছে।

৩৭ বছর বয়সী ফিরাস জ্রিগের মতে, অর্থনীতি ক্রমেই খারাপ হচ্ছে। তার অভিযোগ, মুদ্রা ব্যবসায়ীদের কারসাজির কারণে দিনারের দরপতন হয়েছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে রান্নার তেলের দাম দ্বিগুণ হয়েছে। মাংস ও পোলট্রির দাম বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ। সরকার নির্ধারিত মূল্য ১.৫ দিনার হলেও রাষ্ট্রীয় সরবরাহে গ্যাস সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে, কালোবাজারে তা ৭৫ দিনার বা তারও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।

রাজনৈতিক বিভাজন ও অর্থনৈতিক চাপের মুখে লিবিয়া

২০১১ সালের আরব বসন্তের গণঅভ্যুত্থানের পর সৃষ্ট অস্থিরতা কাটিয়ে উঠতে লড়াই করছে লিবিয়া। বর্তমানে দেশটি জাতিসংঘ স্বীকৃত ত্রিপোলিভিত্তিক সরকার এবং পূর্বাঞ্চলে সামরিক নেতা খলিফা হাফতার সমর্থিত প্রশাসনের মধ্যে বিভক্ত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিরাপত্তা পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। চলতি মাসেই গাদ্দাফির ছেলে ও সম্ভাব্য উত্তরসূরি সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফি নিহত হন।

নিরাপত্তা পরিস্থিতি তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকায় এখন অনেক লিবীয় তাদের জীবিকা নিয়েই বেশি উদ্বিগ্ন। গত মাসে পশ্চিমাঞ্চলীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক দিনারের মূল্য প্রায় ১৫ শতাংশ কমিয়েছে। এক বছরের কম সময়ের মধ্যে এটি দ্বিতীয়বারের মত অবমূল্যায়ন। কর্তৃপক্ষ বলছে, আর্থিক ও মুদ্রানীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং সরকারি সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনার জন্য এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

দারিদ্র্য ও সামাজিক চাপ বৃদ্ধির আশঙ্কা

এই সপ্তাহে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী আব্দুলহামিদ দবেইবা স্বীকার করেন, অবমূল্যায়নের ফলে ফের ‘নাগরিকদের ওপর চাপ বেড়েছে’। লিবিয়ায় জাতিসংঘ সহায়তা মিশনের প্রধান হান্না টেটেহ সতর্ক করে বলেছেন, দারিদ্র্য ও সামাজিক চাপ বাড়ছে। নাজুক নিরাপত্তা পরিস্থিতির সঙ্গে এই অর্থনৈতিক অবস্থা মিললে অপ্রত্যাশিত রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে বলে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে জানিয়েছেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে অভিন্ন জাতীয় বাজেটের অভাব, দ্বৈত প্রশাসনিক ব্যবস্থার কারণে সরকারি ব্যয়ের সমন্বয়হীনতা এবং তেলখাতের আয় কমে যাওয়া লিবিয়ার অর্থনীতিকে আরও চাপের মুখে ফেলেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

উন্নয়নের পথে সংগ্রামরত লিবীয় নাগরিক

গত মঙ্গলবার গাদ্দাফি পতনের আন্দোলনের ১৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে ত্রিপোলিতে আতশবাজি ফুটানো হয়। তবে অনেক লিবীয় নাগরিকের জন্য জীবন এখনও সংগ্রামের। ফিরাস জ্রিগ বলেন, গত তিন বছরে নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে সামান্য উন্নতি হয়েছে, কিন্তু অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ এখনও অনেক কঠিন।

লিবিয়ার এই সংকটময় পরিস্থিতি শুধু রমজান মাসেই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রতিফলন। দেশটির জনগণ এখনও স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের পথে হাঁটছে, কিন্তু মূল্যস্ফীতি, মুদ্রা অবমূল্যায়ন এবং রাজনৈতিক বিভাজনের বোঝা তাদের পথ কঠিন করে তুলছে।