বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ তিন বছর পিছানোর আনুষ্ঠানিক আবেদন
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের জন্য প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা চালিয়ে আসছে। তবে সাম্প্রতিক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, রফতানি খাতে সংকট এবং বাজেট সংক্রান্ত চাপের কারণে সরকার এলডিসি থেকে উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার জন্য জাতিসংঘের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পাঠিয়েছে। এই উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে এবং আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের আবেদন গ্রহণযোগ্য হবে কিনা, তা নিয়ে এখন উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তার পারদ চড়ছে।
বাণিজ্য কূটনীতিতে জোর দেওয়ার আহ্বান
তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন, বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, “সরকারের এই উদ্যোগ সময়োপযোগী এবং প্রয়োজনীয়। তবে আবেদন কার্যকর করতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করতে হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোকে সক্রিয়ভাবে কাজ করতে হবে— যাতে কোনও দেশ আমাদের প্রস্তাবে আপত্তি না জানায়।”
উল্লেখ্য, স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের আগে বাংলাদেশের রফতানি খাত নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের মতে, শুল্কসুবিধা হ্রাসের ঝুঁকি মোকাবিলায় এখন বাণিজ্য কূটনীতিকে দেশের অর্থনৈতিক কৌশলের কেন্দ্রে আনা অপরিহার্য।
বিশেষজ্ঞদের মতামত ও কৌশলগত পরামর্শ
বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক ও ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, “কূটনৈতিক ও বাণিজ্য নীতির সমন্বয় ছাড়া এলডিসি উত্তরণের সুফল পূর্ণভাবে ভোগ করা কঠিন। তাই ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডার মতো বড় বাজারে প্রবেশাধিকার ধরে রাখতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আরও শক্তিশালী করতে হবে। একইসঙ্গে বাজার বহুমুখীকরণে লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও উদীয়মান এশীয় অর্থনীতিতে লক্ষ্যভিত্তিক পরিকল্পনা প্রণয়ন অত্যন্ত জরুরি।”
তিনি আরও যোগ করেন, “বাংলাদেশের রফতানি খাতের স্বনির্ভরতা এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে এ ধরনের উদ্যোগ কার্যকর হতে পারে।”
‘ক্রাইসিস বাটন’ চাপে বাংলাদেশের পদক্ষেপ
বাংলাদেশের আবেদন এখনই চূড়ান্ত অনুমোদনের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তবে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মনে করেন, দেশের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই ‘ক্রাইসিস বাটন’ চাপানো হয়েছে। আগামী সপ্তাহ থেকে পাঁচ দিনব্যাপী জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে নিউইয়র্কে। এই বৈঠকে বাংলাদেশের আবেদন মূল্যায়ন করা হবে।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য ইএমএম উপকমিটির প্রধান ও সিডিপির সদস্য হিসেবে বৈঠকে অংশগ্রহণ করছেন। চলতি সপ্তাহে উপকমিটির বৈঠকে উত্তরণ সম্পন্ন দেশ এবং পাইপলাইনে থাকা দেশগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা হবে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ হলো উত্তরণ পেছানোর আবেদন। তবে এটি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নয়, একজন সচিবের পক্ষ থেকে পাঠানো হয়েছে।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, “প্রথাগত কাঠামো অনুযায়ী, বাংলাদেশকে আগের উত্তরণ মূল্যায়ন প্রতিবেদনের সঙ্গে সাম্প্রতিক তথ্য মিলিয়ে বিচার করা হবে। বিশেষ করে গত নভেম্বরে সরকারের দেওয়া প্রতিবেদনের সঙ্গে নতুন আবেদনের তুলনা হবে। এছাড়া, উত্তরণকালীন কৌশলপত্র বাস্তবায়নে বাংলাদেশের আন্তরিকতা পর্যালোচনা করা হবে।”
বাংলাদেশের প্রস্তুতি ও প্রয়োজনীয়তা
ত্রিবার্ষিক ভিত্তিতে এলডিসি-ভুক্ত দেশগুলোর মূল্যায়ন হয়। প্রধান তিনটি সূচক হলো:
- মাথাপিছু আয়
- মানবসম্পদ সূচক
- অর্থনৈতিক ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণতা সূচক
এই তিনটির মধ্যে কমপক্ষে দুটি সূচকে উত্তীর্ণ হতে হয় বা মাথাপিছু আয় নির্ধারিত সীমার দ্বিগুণ হতে হবে। বাংলাদেশ ২০১৮ ও ২০২১ সালের মূল্যায়নে তিনটি সূচকেই উত্তীর্ণ হয়েছে। এর ফলে ২০২৪ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণ নিশ্চিত ছিল। তবে করোনার প্রভাব এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে উত্তরণ দুই বছর পিছিয়ে গেছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্র জানায়, ১৮ ফেব্রুয়ারি ইআরডি সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকীর সই করা চিঠিটি সিডিপির কাছে পাঠানো হয়। চিঠিতে বলা হয়েছে, কোভিড-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রাপ্ত প্রস্তুতিমূলক (প্রিপারেটরি) সময়কালটি কার্যকরভাবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা থাকলেও পরপর একাধিক বৈশ্বিক ধাক্কায় সেই লক্ষ্য পূরণ ব্যাহত হয়েছে।
পরবর্তী ধাপ ও সম্ভাব্য সময়সীমা
বাংলাদেশ সরকার তিন বছরের জন্য একটি ‘ক্রাইসিস অ্যাসেসমেন্ট’ পরিচালনা এবং সম্ভাব্য সময় বৃদ্ধির আনুষ্ঠানিক আবেদন করেছে। ইআরডি কর্মকর্তাদের মতে, ফেব্রুয়ারির বৈঠকের পর প্রায় দুই সপ্তাহের মধ্যে একটি প্রাথমিক মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি হবে। এরপর সিডিপি পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ দেবে। চূড়ান্ত সুপারিশ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে পাঠানো হবে, যেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। পুরো প্রক্রিয়ায় সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
গত বছর জাতিসংঘ বাংলাদেশের অনুরোধে একটি মূল্যায়ন পরিচালনা করেছিল। এতে দেশের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরা হলেও নির্দিষ্ট কোনও সুপারিশ দেওয়া হয়নি, বরং প্রক্রিয়াটিকে বাংলাদেশের জন্য ‘চ্যালেঞ্জিং’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এবার প্রক্রিয়াটি আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে এবং চলমান মূল্যায়নের ফলাফলের ওপরই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে।
বাজার ও ব্যবসায়ী মহলের প্রত্যাশা
বাজার ও ব্যবসায়ী মহল মনে করছে, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় যদি সময় বৃদ্ধি পাওয়া যায়, তবে রফতানি খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প, এলডিসি-উত্তর প্রতিযোগিতার জন্য আরও শক্তিশালী প্রস্তুতি নিতে পারবে। ইআরডি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ফেব্রুয়ারি মাসের বৈঠকের পর প্রাথমিক মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রায় দুই সপ্তাহের মধ্যে তৈরি হতে পারে। এরপর সিডিপি তাদের পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ প্রদান করবে। চূড়ান্ত সুপারিশের ভিত্তিতে বিষয়টি যাবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে, যেখানে এলডিসি উত্তরণ সংক্রান্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এই পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে সময় লাগতে পারে সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর পর্যন্ত।
