ট্রাম্পের নতুন শুল্কে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যচুক্তির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
ট্রাম্পের শুল্কে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি অনিশ্চিত

ট্রাম্পের নতুন শুল্কে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যচুক্তির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক নীতির ওপর মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের অবৈধ ঘোষণার পর পরিস্থিতি নতুন মোড় নিয়েছে। গত শুক্রবার আদালতের রায়ে ট্রাম্পের শুল্ক অবৈধ ঘোষিত হওয়ার পর তিনি বিকল্প পথ বেছে নিয়ে নতুন করে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্প্রতি স্বাক্ষরিত পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে ব্যাপক অনিশ্চয়তা।

সুপ্রিম কোর্টের রায় ও ট্রাম্পের পাল্টা পদক্ষেপ

গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক নীতিকে অবৈধ ঘোষণা করেছেন। আদালতের মতে, ট্রাম্প ১৯৭৭ সালের ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট ব্যবহার করে শুল্ক আরোপ করলেও এই আইন প্রেসিডেন্টকে এমন ক্ষমতা দেয় না। রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ট্রাম্প কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নতুন পদক্ষেপ নেন। তিনি ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইন প্রয়োগ করে সব দেশের পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন, যা পরদিন শনিবার বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়। এই নতুন শুল্ক ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হবে বলে হোয়াইট হাউস জানিয়েছে।

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যচুক্তির অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

এই পরিস্থিতিতে ৯ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের ওপর পাল্টা শুল্কের হার ১৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে ট্রাম্পের নতুন শুল্ক ঘোষণার পর এই চুক্তি বাতিল হয়ে যাবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, চুক্তিটি হয়তো বাতিল হয়ে যেতে পারে, কিন্তু বিষয়টি ২৪ ফেব্রুয়ারির পরই স্পষ্ট হবে। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সাবেক সদস্য মোস্তফা আবিদ খান বলেছেন, দুই দেশের সংসদে অনুসমর্থনের বাধ্যবাধকতা থাকায় চুক্তি এখনো কার্যকর হয়নি, তাই পুরো বিষয়টি নতুন করে দেখার সুযোগ আছে।

চুক্তি নিয়ে পূর্ববর্তী বিতর্ক ও বর্তমান অবস্থান

বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এই চুক্তি সম্পাদন নিয়ে অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে প্রশ্ন উঠেছিল। নির্বাচনের তিন দিন আগে চুক্তি না করার পক্ষে মত দেওয়া হয়েছিল, যাতে নির্বাচিত সরকার এটি করতে পারে। চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে ঢাকা থেকে ভার্চ্যুয়ালি যোগ দিয়েছিলেন বিদায়ী সরকারের বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ও বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান। চুক্তির পর বশিরউদ্দীন জানিয়েছিলেন, পাল্টা শুল্কহার ২০ শতাংশ থেকে কমে ১৯ শতাংশ হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার করে পোশাক রপ্তানি করলে শুল্কহার শূন্য হবে। তবে তিনি এও বলেছিলেন, ভবিষ্যতে কোনো সরকার চুক্তি দেশের স্বার্থের অনুকূল না মনে করলে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।

ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞদের মতামত

বাংলাদেশ নিট পোশাক উৎপাদক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হক বলেছেন, ৯ ফেব্রুয়ারির চুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে গেলে ভালো, কারণ এতে বাংলাদেশের স্বার্থহানির বহু ধারা আছে। রপ্তানিকারকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের নতুন শুল্কহারও আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। এছাড়া স্বল্প সময়ে শুল্কহার বারবার পরিবর্তন অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। মোস্তফা আবিদ খান আরও উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশকে এই বিষয়ে আরও কৌশলী হতে হবে এবং সরকারের পক্ষ থেকে এখনই কোনো অবস্থান নেওয়া সমীচীন নয়।

শুল্ক ইতিহাস ও বর্তমান প্রভাব

২০২৫ সালের ২ এপ্রিল ট্রাম্প ১৫৭টি দেশের পণ্যে পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছিলেন, যা পরে আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্য ২০ শতাংশে সমঝোতা হয়। ৯ ফেব্রুয়ারির চুক্তিতে এটি ১৯ শতাংশে নামানো হয়। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য আইন অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ১৫০ দিনের জন্য ১৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করতে পারেন। ট্রাম্পের নতুন সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা আগের মতোই থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, কিন্তু অনিশ্চয়তা ব্যবসায়ীদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।