ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তিতে সংশোধন: ডাল ও কৃষিপণ্যের শুল্ক বিষয়ে দিল্লির জয়
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান বাণিজ্য চুক্তি আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ট্রাম্প প্রশাসন প্রকাশিত মার্কিন ফ্যাক্টশিটে একাধিক সংশোধনী এনেছে, যা বিশেষজ্ঞদের মতে ভারতের কূটনৈতিক সাফল্যের ইঙ্গিত বহন করে। সংশোধিত নথিতে ভারতের আমেরিকান ডালজাত পণ্যে শুল্ক কমানোর পূর্ববর্তী দাবি সম্পূর্ণভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে।
ফ্যাক্টশিটের মূল পরিবর্তনসমূহ
প্রাথমিক ফ্যাক্টশিটে উল্লেখ ছিল যে, ভারত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য কেনার বাধ্যতামূলক অঙ্গীকার করেছে। কিন্তু সংশোধিত সংস্করণে এই শব্দটি পরিবর্তন করে বলা হয়েছে, ভারত এই পরিমাণ পণ্য কেনার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। এই পরিবর্তনটি চুক্তির প্রকৃতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
আগের নথিতে ভারতের কৃষি খাতে মার্কিন পণ্যের প্রবেশাধিকার নিয়ে বিস্তারিত উল্লেখ ছিল, যার মধ্যে ডালজাত পণ্য, লাল জোয়ার, বাদাম, তাজা ফল, সয়াবিন তেল, ওয়াইন ও স্পিরিটস অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে সংশোধিত সংস্করণে ‘নির্দিষ্ট কিছু ডাল’ শব্দটি সরিয়ে ফেলা হয়েছে। নতুন নথিতে কেবল ‘অন্যান্য পণ্য’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা ভারতের কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় দিল্লির দৃঢ় অবস্থানের প্রতিফলন বলে ধরা হচ্ছে।
কৃষি খাতের সংবেদনশীলতা
ভারত বিশ্বের বৃহত্তম ডাল উৎপাদক ও ভোক্তা দেশ হিসেবে পরিচিত। মসুর ও ছোলার মতো পণ্যে উচ্চ শুল্ক আরোপ করে ভারতীয় সরকার স্থানীয় কৃষকদের সুরক্ষা দিয়ে আসছে। ফ্যাক্টশিটের এই সংশোধন থেকে স্পষ্ট যে, ওয়াশিংটনের চাপের মুখেও দিল্লি নিজের অবস্থান অটুট রাখতে সক্ষম হয়েছে। শুধু তাই নয়, সংশোধিত নথি থেকে ‘কৃষিপণ্য’ শব্দটিও অপসারণ করা হয়েছে, যা ভারতের কৃষি নীতির প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নমনীয়তার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ডিজিটাল সার্ভিস ট্যাক্সের বিষয়ে পরিবর্তন
ডিজিটাল সার্ভিস ট্যাক্স নিয়েও মার্কিন প্রশাসন তাদের পূর্ববর্তী অবস্থান থেকে সরে এসেছে। আগের নথিতে ভারতকে এই কর তুলে নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সংশোধিত ফ্যাক্টশিটে সেই লাইন বাদ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ভারত বৈষম্যমূলক বা অতিরিক্ত বোঝা সৃষ্টি করে এমন ডিজিটাল বাণিজ্য–সংক্রান্ত বাধা দূর করতে দ্বিপক্ষীয় নিয়ম প্রণয়নের বিষয়ে আলোচনা করতে রাজি হয়েছে।
চুক্তির ভবিষ্যৎ ও প্রেক্ষাপট
ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির রূপরেখা আগামী মার্চ মাসের মধ্যে স্পষ্ট হওয়ার আশা করা হচ্ছে, যদিও আলোচনা প্রায় এক বছর আগে শুরু হয়েছিল। গত কয়েক মাসে ট্রাম্প প্রশাসন ভারতীয় পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ পারস্পরিক শুল্ক আরোপ করেছিল, যা পরে রাশিয়া থেকে তেল কেনার শাস্তি হিসেবে বাড়ানো হয়েছিল। সম্প্রতি সমঝোতার পর এই শুল্কহার ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশে নামানো হয়েছে, ফলে ভারতীয় রপ্তানিকারকরা কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন।
এই প্রেক্ষাপটে, ভারত ইতিমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সই করেছে, যা মার্কিন বাণিজ্য নীতির অনিশ্চয়তার প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ফ্যাক্টশিটের এই সংশোধনীগুলি দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের উন্নতির সম্ভাবনা জোরালো করছে, যদিও চূড়ান্ত চুক্তি এখনও অনিশ্চিত রয়ে গেছে।
