যুক্তরাষ্ট্র ও তাইওয়ানের মধ্যে ঐতিহাসিক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত
যুক্তরাষ্ট্র ও তাইওয়ান তাদের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে আনুষ্ঠানিকভাবে সই করেছে। এই চুক্তির মাধ্যমে উভয় দেশ পারস্পরিক শুল্ক হ্রাস করতে এবং তাইওয়ান কর্তৃক মার্কিন পণ্য ক্রয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়াতে সম্মত হয়েছে। বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির (ইউএসটিআর) দপ্তর চুক্তিটির বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করেছে, যা ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী প্রচারিত হয়েছে।
শুল্ক কমানোর মাধ্যমে বাণিজ্য সুবিধা
নতুন চুক্তি অনুযায়ী, তাইওয়ান থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর মার্কিন শুল্কের হার ১৫ শতাংশে নিশ্চিত করা হয়েছে। পূর্বে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে এই শুল্ক ২০ শতাংশ পর্যন্ত আরোপ করা হয়েছিল। শুল্ক হ্রাসের এই সিদ্ধান্ত তাইওয়ানের শক্তিশালী সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মতো এশীয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের সমান সুযোগ প্রদান করবে। অন্যদিকে, তাইওয়ানও প্রায় সব ধরনের মার্কিন পণ্যের ওপর শুল্ক কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা বাণিজ্য ভারসাম্য উন্নয়নে সহায়ক হবে।
বড় অঙ্কের ক্রয় ও বিনিয়োগের অঙ্গীকার
চুক্তির শর্তাবলী অনুসারে, ২০২৫ থেকে ২০২৯ সালের মধ্যে তাইওয়ানকে বড় অঙ্কের মার্কিন পণ্য ক্রয় করতে হবে। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে:
- ৪৪.৪ বিলিয়ন ডলারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও অপরিশোধিত তেল
- ১৫.২ বিলিয়ন ডলারের বেসামরিক উড়োজাহাজ ও ইঞ্জিন
- ২৫.২ বিলিয়ন ডলারের বিদ্যুৎ গ্রিড সরঞ্জাম, জেনারেটর এবং ইস্পাত তৈরির সরঞ্জাম
এছাড়া, তাইওয়ান থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি হওয়া ২ হাজারেরও বেশি পণ্যকে পারস্পরিক শুল্ক থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, যার ফলে মার্কিন রফতানির ওপর গড় শুল্ক ১২.৩৩ শতাংশে নেমে আসবে। গত জানুয়ারিতে হওয়া এক প্রাথমিক চুক্তিতে তাইওয়ানি কোম্পানিগুলো যুক্তরাষ্ট্রে সেমিকন্ডাক্টর, জ্বালানি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে ২৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের অঙ্গীকার করেছিল, যার মধ্যে টিএসএমসি একাই ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। মার্কিন বাণিজ্য সচিব হাওয়ার্ড লুটনিক জানিয়েছেন, তাইওয়ান সরকার আরও ২৫০ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন বিনিয়োগের গ্যারান্টি দেবে।
অর্থনৈতিক ও কৃষি খাতের সুবিধা
তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে এই চুক্তিকে ঐতিহাসিক হিসেবে উল্লেখ করে ফেসবুকে লিখেছেন যে, এটি তাইওয়ানের অর্থনীতি ও শিল্পের জন্য একটি যুগান্তকারী মুহূর্ত এবং উচ্চ-প্রযুক্তিগত কৌশলগত অংশীদারত্ব প্রতিষ্ঠা করবে। চুক্তিটির ফলে তাইওয়ানে মার্কিন গরুর মাংস, ডেইরি ও ভুট্টার মতো কৃষি পণ্যের ওপর থাকা ২৬ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক তাৎক্ষণিকভাবে বিলুপ্ত হবে, যদিও শুকরের মাংস ও হ্যামের ওপর থাকা উচ্চ শুল্ক ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে। এছাড়া, তাইওয়ান মার্কিন মোটরগাড়ির নিরাপত্তা মান এবং ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের মানদণ্ড মেনে নিতে রাজি হয়েছে, যা স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধি করবে।
বাণিজ্য ঘাটতি ও ভবিষ্যত চ্যালেঞ্জ
২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসে তাইওয়ানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে ১২৬.৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা ২০২৪ সালে ছিল ৭৩.৭ বিলিয়ন ডলার। মূলত তাইওয়ান থেকে উচ্চমানের এআই চিপ আমদানির কারণেই এই ঘাটতি বৃদ্ধি পেয়েছে। উল্লেখ্য, চূড়ান্ত এই চুক্তিটি কার্যকর করতে তাইওয়ানের পার্লামেন্টের অনুমোদনের প্রয়োজন হবে, যেখানে বর্তমানে বিরোধী দল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় রয়েছে, যা ভবিষ্যত বাস্তবায়নে একটি সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিতে পারে।
