যুক্তরাষ্ট্র-ভারত বাণিজ্য চুক্তি: শুল্ক কমলেও উদ্বেগ বাড়ছে কৃষকদের
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোষণা দিয়েছেন, ভারতের অধিকাংশ পণ্যের ওপর আরোপিত ৫০ শতাংশ শুল্ক অবিলম্বে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে পরবর্তীতে ওয়াশিংটন থেকে আসা নতুন ঘোষণায় এই শুল্ক ১৮ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তে ভারতীয় ব্যবসায়ীরা স্বস্তি পেলেও, দেশটির কৃষক ও বিরোধী দল নতুন চুক্তির শর্ত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
মোদি-ট্রাম্পের পোস্ট ও শুল্ক হ্রাস
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করে ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘এ চমৎকার ঘোষণার জন্য ১৪০ কোটি ভারতীয় জনগণের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে অনেক ধন্যবাদ।’ গত গ্রীষ্মে ট্রাম্প ভারতের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিলেন, যা পরে রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল কেনার ‘শাস্তি’ হিসেবে দ্বিগুণ করা হয়। সাম্প্রতিক পোস্টের পর সেই অচলাবস্থার অবসান হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছিল।
নতুন চুক্তির শর্ত ও প্রতিক্রিয়া
যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে প্রস্তাবিত বাণিজ্য চুক্তিতে ভারত আগামী পাঁচ বছরে ৫০ হাজার কোটি ডলার সমমূল্যের মার্কিন পণ্য কিনতে সম্মত হয়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতের আমদানি প্রায় দ্বিগুণ বাড়বে। নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটন আগামী মার্চ মাসের কোনো এক সময় এই চুক্তিতে সই করবে বলে জানিয়েছেন ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল।
তবে নতুন চুক্তির শর্ত ঘোষণার পর ভারতের শেয়ারবাজারের সূচক ৩ শতাংশ এবং ডলারের বিপরীতে রুপির মান কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারতের মাহিন্দ্রা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অনীশ শাহ এক বিবৃতিতে লিখেছেন, ‘এ চুক্তি ভারতের প্রবৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষায় এক অর্থবহ গতি যোগ করেছে।’
কৃষক ও বিরোধী দলের উদ্বেগ
ভারতের কৃষকদের আশঙ্কা, বিপুল পরিমাণে মার্কিন পণ্য আমদানি হলে তাঁদের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচিত চুক্তিতে সই না করার দাবিতে তাঁরা ধর্মঘটের পরিকল্পনা করেছেন। ভারতের পার্লামেন্টের বিরোধী দল অভিযোগ করেছে, চুক্তির শর্তগুলো দেশের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে বড় আপোস। এতে গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলো অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে এবং ডিজিটাল বাণিজ্য নীতিমালার ওপর ভারতের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হবে।
জ্বালানি তেল ও ডাল আমদানি বিতর্ক
হোয়াইট হাউসের ফ্যাক্ট শিটে বলা হয়েছে, রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করার ব্যাপারে ভারতের অঙ্গীকারের স্বীকৃতি হিসেবে শাস্তিমূলক শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জ্বালানিমন্ত্রী এ–সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর দেননি।
আরেকটি বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ‘নির্দিষ্ট কিছু ডাল’। হোয়াইট হাউসের ফ্যাক্ট শিটে ফল ও সয়াবিন তেলের মাঝখানে এই শব্দগুচ্ছ ঢোকানো হয়েছিল, যা পরে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। ভারতের কৃষিমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান বলেছেন, ‘বিদেশ থেকে ডাল আমদানি করা আনন্দের বিষয় নয়; বরং লজ্জার।’ তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিকে সমর্থন করে বলেন, এটি ভারতীয় কৃষকদের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখবে।
চুক্তির ভবিষ্যৎ ও অর্থনৈতিক প্রভাব
রেটিং সংস্থা ফিচ সলিউশনসের ইউনিট ‘বিএমআই’ পূর্বাভাস দিয়েছে, মোদি সরকারের সংস্কার পদক্ষেপ ভারতকে ‘আরও একটি প্রান্তিকে দুর্দান্ত অর্থনৈতিক পারফরম্যান্সের দিকে ক্রমে এগিয়ে নিচ্ছে।’ যুক্তরাষ্ট্রের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঐতিহাসিক বাণিজ্য চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের কৃষক, শ্রমিক ও শিল্প খাতের জন্য স্পষ্ট বিজয়।’
নতুন চুক্তি ভারতের অর্থনীতির জন্য সুযোগ তৈরি করলেও, কৃষক ও বিরোধী দলের উদ্বেগ এই প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলছে। মার্চ মাসে চুক্তি সই হওয়ার আগে এই ইস্যুগুলো আরও আলোচনার মুখোমুখি হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
