ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি: কৃষি বাজারে উন্মুক্তকরণ ও প্রতিক্রিয়া
ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি: কৃষি বাজারে পরিবর্তন

ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি: কৃষি খাতে নতুন সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র একটি অন্তর্বর্তীকালীন বাণিজ্য চুক্তির রূপরেখা প্রকাশ করেছে, যা দুই দেশের মধ্যে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল বা সাপ্লাই চেইন পুনর্গঠন, শুল্ক হ্রাস এবং জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা গভীর করার পথ প্রশস্ত করেছে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই চুক্তিতে কৃষি বাজারের বড় অংশ উন্মুক্ত করার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের চাপের মুখে নয়াদিল্লি কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তুললেও শেষ পর্যন্ত কিছু কৃষিপণ্যের বাণিজ্য বাধা শিথিল করতে রাজি হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত ভারতীয় কৃষক ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

ডিডিজিএস আমদানি ও পোল্ট্রি শিল্পের সুবিধা

চুক্তির অধীনে, ভারত যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রোটিন-সমৃদ্ধ ডিস্ট্রিলার্স ড্রাইড গ্রেইনস উইথ সলিউবলস (ডিডিজিএস) আমদানির অনুমতি দিতে যাচ্ছে, যা মূলত ভুট্টা থেকে ইথানল তৈরির একটি উপজাত। এই সিদ্ধান্ত ভারতের প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারের পোল্ট্রি শিল্পের জন্য উপকারী হবে, কারণ পোল্ট্রি উৎপাদনে ৬০-৭০ শতাংশ খরচ খাবারের পেছনে হয়। ডিডিজিএস আমদানি বৃদ্ধি পেলে পোল্ট্রি ফিডের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে, যা শিল্পটিকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে পারে।

দেশীয় কৃষকদের উদ্বেগ ও সম্ভাব্য ক্ষতি

তবে, এই চুক্তির কিছু নেতিবাচক দিকও রয়েছে। দেশীয় তেলবীজ প্রক্রিয়াজাতকারী এবং সয়াবিন চাষিরা ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন, কারণ বাজারে ডিডিজিএস-এর জোগান বাড়লে সয়ামিলের চাহিদা কমে যাবে। এটি সয়াবিন ও চীনাবাদামের দাম কমিয়ে দিতে পারে, যার ফলে কৃষকরা সয়াবিন চাষ ছেড়ে ভুট্টা বা ধানের দিকে ঝুঁকতে পারেন। এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুল্কমুক্ত সয়াবিন তেল আমদানির সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও ভারত সরকার একটি ট্যারিফ-রেট কোটা ব্যবস্থা রেখেছে, অর্থাৎ নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি তেল আমদানি করলে সাধারণ হারে শুল্ক দিতে হবে। এই পদক্ষেপ দেশীয় উৎপাদকদের কিছুটা সুরক্ষা প্রদান করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তুলা ও আপেল আমদানিতে পরিবর্তন

অন্যদিকে, তুলা আমদানিতে বর্তমানে ১১ শতাংশ শুল্ক থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিশেষ দীর্ঘ আঁশের তুলা (ইএলএস) শুল্কমুক্ত আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তুলা উৎপাদক হলেও এই বিশেষ মানের তুলার চাহিদা মেটাতে হিমশিম খায়, তাই এটি কেবল কোটার আওতায় আমদানির সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যা স্থানীয় বাজারে সীমিত প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আপেল আমদানির ক্ষেত্রে, ভারত বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম আপেল উৎপাদক হলেও ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে প্রতিবছর প্রায় ৫ লাখ টন আপেল আমদানি করতে হয়। নতুন চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের আপেলের ওপর শুল্ক কমিয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়েছে, কিন্তু ভারতীয় কৃষকদের রক্ষায় প্রতি কেজিতে ন্যূনতম আমদানি মূল্য ৮০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে বাজারে ১০০ টাকার নিচে কোনও আপেল ঢুকতে না পারে।

ইতিবাচক দিক ও ভবিষ্যত চ্যালেঞ্জ

এই বাণিজ্য চুক্তিতে ভারতীয় কৃষকদের জন্য কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ভারতের চা, কফি, মশলা এবং বিভিন্ন ফলের ওপর শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রদান করেছে, যা ভারতীয় চাষিদের লাভবান করবে। পাশাপাশি, বাসমতী ও সাধারণ চালের ওপর আমদানি শুল্ক কমিয়ে ১৮ শতাংশ করায় চাল রফতানিকারকদের জন্যও বড় বাজার উন্মুক্ত হবে।

তবে, ভারতের ইথানল উৎপাদনকারীরা বর্তমানে ২০ শতাংশ ব্লেন্ডিং লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পর অলস সক্ষমতা ও চাহিদা হ্রাসের মুখে পড়েছেন। এই চুক্তির ফলে ডিডিজিএস-এর বাজার ও আয় নিয়ে তারা নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারেন, যা শিল্পটির জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামগ্রিকভাবে, এই চুক্তি ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ করলেও কৃষি খাতে এর প্রভাব মিশ্রিত হতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মত দিয়েছেন।