ট্রাম্পের দাবি ইরান ভেঙে পড়ছে, বিশ্লেষকরা বলছেন ভিন্ন কথা
ট্রাম্পের দাবি ইরান ভেঙে পড়ছে, বিশ্লেষকরা ভিন্নমত

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করে আসছেন, ওয়াশিংটনের কঠোর নৌ-অবরোধের মুখে ইরান আর্থিকভাবে ভেঙে পড়ছে। মঙ্গলবার রাতে তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, অবরোধের কারণে তেহরান প্রতিদিন প্রায় ৫০ কোটি ডলার হারাচ্ছে এবং দেশটিতে চরম বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে।

অবরোধের প্রেক্ষাপট

গত ১৩ এপ্রিল থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ শুরু করে। এরপর হরমুজ প্রণালির কাছে একটি ইরানি পতাকাবাহী ট্যাংকারে গুলি চালিয়ে সেটি জব্দ করে যুক্তরাষ্ট্র। পাশাপাশি সমুদ্রে ইরানগামী বা ইরান থেকে পণ্যবাহী জাহাজগুলোকে দিক পরিবর্তন করতেও বাধ্য করা হয়। ইরানের সশস্ত্র বাহিনী এসব পদক্ষেপকে অবৈধ ও দস্যুতা হিসেবে অভিহিত করেছে।

পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ইরান সব ধরনের বিদেশি জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে এবং বেশ কিছু বিদেশি জাহাজ আটক করেছে। এর আগে তারা কেবল বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলোর জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিচ্ছিল।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ইরান কি আসলেই সংকটে?

বিশ্লেষকরা বলছেন, অবরোধ ইরানকে ক্ষতিগ্রস্ত করলেও দেশটি দীর্ঘ সময় টিকে থাকার সক্ষমতা রাখে। যুদ্ধের আগে ইরান প্রতিদিন তেল থেকে ১১ কোটি ৫০ লাখ ডলার আয় করত। কিন্তু বর্তমানে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় (ব্যারেল প্রতি ৯০-১০০ ডলার) গত এক মাসে ইরান প্রতিদিন গড়ে ১৬ কোটি ডলারের বেশি আয় করেছে। অর্থাৎ অবরোধের মধ্যেও ইরান আগের চেয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি অর্থ উপার্জন করেছে।

ইরানের উপকূলে এবং সমুদ্রে ভাসমান ট্যাঙ্কারগুলোতে প্রায় ১৬০ থেকে ১৮০ মিলিয়ন (১৬-১৮ কোটি) ব্যারেল তেল মজুদ রয়েছে। বিশ্লেষক কেনেথ কাটজম্যানের মতে, এই মজুত দিয়ে ইরান আগামী আগস্ট পর্যন্ত আয় সচল রাখতে পারবে।

ইরান বর্তমানে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ থেকে টোল আদায় করছে। কিছু ক্ষেত্রে একটি জাহাজের কাছ থেকেই ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তেহরানের কঠোর অবস্থান

ইরানের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরিফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে বলেন, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা বিনামূল্যে পাওয়া যায় না। তিনি আরও বলেন, ইরানের তেল রফতানি সীমিত করে অন্যদের জন্য বিনামূল্যে নিরাপত্তা আশা করা যায় না। হয় সবার জন্য উন্মুক্ত তেলের বাজার থাকবে, নতুবা সবাইকে চড়া মূল্য দিতে হবে।

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও যুদ্ধবিরতি আলোচনার প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ জানিয়েছেন, মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত কোনও পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়া সম্ভব নয়।

রাজনৈতিক ও সামরিক ঐক্য

ট্রাম্প ইরানে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের দাবি করলেও তেহরান তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, ইরানে কোনও কট্টরপন্থী বা উদারপন্থী নেই। আমরা সবাই ইরানি ও বিপ্লবী। জাতীয় ঐক্য ও সর্বোচ্চ নেতার নির্দেশনায় আমরা আগ্রাসীকে অনুতপ্ত করতে বাধ্য করব।

সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত অ্যাডাম এরেলি আল জাজিরাকে বলেন, ইরানিরা এই পরিস্থিতির জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল। তাদের টিকে থাকার যে জেদ ও দেশপ্রেম, তা সম্ভবত ট্রাম্পের ধৈর্যের চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, ১ মে’র মধ্যে ট্রাম্পকে কংগ্রেসের অনুমোদনের আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। অন্যদিকে, চীনের পণ্যবাহী জাহাজ জব্দ করা নিয়ে বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষও ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। এই ধৈর্যের খেলায় শেষ পর্যন্ত কে জয়ী হয়, তা-ই এখন দেখার বিষয়।

সূত্র: আল জাজিরা