প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১৭ বছর পর দেশে ফিরেই বলেছিলেন, ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান।’ সেই পরিকল্পনার বেশ কিছু অংশ বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে পাওয়া গেছে। ক্ষমতায় যাওয়ার পর সেসব পরিকল্পনার কিছু বাস্তবায়নও হচ্ছে। যেমন ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ইত্যাদি। ধরে নেওয়া হচ্ছে এসবই ‘প্ল্যান এ’–এর অংশ। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এর মধ্যেই দুনিয়া অনেক বদলে গেছে।
বাংলাদেশ ও বিশ্বের পরিবর্তন
প্রথমত, গত ২০ বছরে বাংলাদেশও আসলে অনেক বদলে গেছে। অর্থনীতির আকার বেড়েছে। মানুষের চাওয়া-পাওয়ার ধরন, চিন্তাভাবনা, প্রত্যাশা—সবকিছুরই পরিবর্তন হয়েছে। যদিও মন্ত্রীদের কারও কারও কথা শুনলে মনে হয়, তাঁরা সেই ২০ বছর আগের বাংলাদেশেই আছেন। দ্বিতীয়ত, গত দুই মাসে দুনিয়াই অনেক বদলে গেছে। একেকটা বৈশ্বিক সংকটই আসলে দুনিয়াকে বদলে দেয়। তবে এখনকার সংকট এতটাই বড় যে এর প্রভাবে দুনিয়া বদলাতে বদলাতে কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা এখনো কেউ জানে না।
এ রকম এক সময়ে ‘প্ল্যান এ’ তেমন কাজ করবে না, দরকার হবে ‘প্ল্যান বি’। ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি নিরাপত্তায় যে সংকট দেখা দিয়েছে, তাতে সব দেশই অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকে নতুন করে সাজাচ্ছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। কেননা বলা হচ্ছে, ইরান যুদ্ধের কারণে যেসব উন্নয়নশীল দেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তার মধ্যে বাংলাদেশের মতো দেশই বেশি।
আইএমএফের সতর্কবার্তা
মাত্রই শেষ হলো বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বার্ষিক সভা। নিয়ম মেনে এ সভার আগে আইএমএফ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ১৪ এপ্রিল প্রকাশিত এবারের প্রতিবেদনে আইএমএফ বলেছে, ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব তিন রকম হবে।
প্রথমত, জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের দাম বাড়বে। এতে উৎপাদন খরচ বাড়বে, পরিবহন ব্যয় বাড়বে, বাজারে জিনিসপত্রের দামও বাড়বে। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি বাড়বে, আর মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমবে। দ্বিতীয়ত, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও শ্রমিকেরা নিজেদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে চাইবে। এতে পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে, মজুরি বাড়ানোর চাপও বাড়তে পারে। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তৃতীয়ত, বিনিয়োগকারীরা যদি মনে করেন—পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে, তাহলে আর্থিক বাজারে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। শেয়ারবাজার পড়ে যেতে পারে, ডলার শক্তিশালী হতে পারে, অনেক দেশ থেকে টাকা বেরিয়ে যেতে পারে। এতে ঋণ পাওয়া কঠিন হবে, বিনিয়োগ কমবে, অর্থনীতির গতি আরও শ্লথ হবে।
তবে আইএমএফ বলেছে, সব দেশ সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না; এই ধাক্কা সব দেশে একইভাবে লাগবে না। যেসব দেশ তেল-গ্যাস বেশি আমদানি করে, তারা বেশি বিপদে পড়বে। নিম্ন আয়ের ও উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকবে। কারণ, তাদের হাতে ধাক্কা সামাল দেওয়ার মতো বাড়তি অর্থ বা নীতিগত শক্তি কম। অন্যদিকে উপসাগরীয় তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোরও সমস্যা হবে। যুদ্ধের কারণে অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, উৎপাদন কমে যেতে পারে, রপ্তানি ব্যাহত হতে পারে, পর্যটন ও ব্যবসাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে যেসব দেশ মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমিক পাঠায়, সেসব দেশের জন্য আরেকটি ঝুঁকি হলো রেমিট্যান্স কমে যাওয়া।
বাংলাদেশের জন্য প্রভাব
আইএমএফ আরও বলেছে, জ্বালানির দাম বাড়লে সব সময় সঙ্গে সঙ্গে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হয় না। কারণ, এতে অর্থনীতির গতি এমনিতেই কমে যায়। কিন্তু যদি দেখা যায়, এই দাম বাড়ার প্রভাব অন্য খাতেও ছড়িয়ে পড়ছে, মানুষ ও ব্যবসা ভবিষ্যতে আরও মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা করছে, তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সুদহার বাড়ানোসহ কঠোর নীতি নিতে হতে পারে।
এখন আপনারাই মিলিয়ে দেখুন। আইএমএফ তো আসলে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর কথাই বেশি বলছে। কারণ, বাড়তি ধাক্কা সামাল দেওয়ার মতো অর্থ ও সামর্থ্য বাংলাদেশের নেই। বাংলাদেশ জ্বালানি খাতে প্রায় পুরোটাই আমদানিনির্ভর। আর এখন অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ভরসা হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে পাঠানো রেমিট্যান্স। এর মধ্যে আবার বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ ঠিকই কঠোর পদক্ষেপ নিয়েও ফেলেছে। অর্থাৎ জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়েছে।
মজার ব্যাপার হচ্ছে, অর্থনীতির সব তত্ত্ব উড়িয়ে দিয়ে মন্ত্রীরা বলা শুরু করেছেন যে জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে মূল্যস্ফীতি বাড়বে না। তাঁরা হয়তো ভুলে গেছেন, সাড়ে তিন বছর ধরে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির হার অনেক বেশি, সে তুলনায় মজুরি বৃদ্ধির হার কম। অর্থাৎ ক্রমাগতভাবে মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে। এখন জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে মানুষের ব্যয় আরও বাড়বে। এ অবস্থায় মূল্যস্ফীতি কমানোর একমাত্র ক্ষমতা আছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বা বিবিএসের। মন্ত্রীরা এখন তাঁদের বক্তৃতা-বিবৃতির মান রাখতে বিবিএসকে মূল্যস্ফীতি কম দেখাতে বলবেন কি না, সেটাই দেখার বিষয়।
প্ল্যান বি-এর প্রয়োজনীয়তা
আসলে বর্তমান পরিস্থিতিতে ‘প্ল্যান বি’র অংশ হওয়া উচিত—মন্ত্রীরা সবাই সব বিষয়ে কথা বলবেন না, তা নিশ্চিত করা। সংকটের সময় নীতিনির্ধারকেরা কীভাবে কথা বলবেন, এ বিষয়ে ‘পাবলিক কমিউনিকেশন ডিউরিং ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইসিস’ শিরোনামে আইএমএফের একটি গাইডলাইন আছে। নীতিনির্ধারকেরা সেটা পড়ে দেখতে পারেন।
অর্থনীতিতে ‘প্ল্যান বি’ কেন দরকার, সেটা আরও পরিষ্কার করে বলা যাক। চলতি (২০২৫-২৬) অর্থবছর শেষ হতে আর দুই মাসের কিছু বেশি সময় বাকি। দেখা যাচ্ছে, অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে বাণিজ্যঘাটতি বেড়েছে। এর মধ্যে টানা আট মাস ধরে রপ্তানি আয়ে কোনো প্রবৃদ্ধি নেই। উল্টো আমদানি ব্যয় বাড়ছে। খাদ্য আমদানি বৃদ্ধি এর প্রধান কারণ। এখন ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি আমদানির ব্যয়ও বাড়ছে। এতে বাণিজ্যঘাটতি আরও বাড়বে। ফলে চাপ পড়বে বিনিময় মূল্য ও বৈদেশিক মুদ্রার মজুতের ওপর। এর ওপর আবার ইরান যুদ্ধের প্রভাবে প্রবাসী আয় কমে গেলে নতুন করে বিপদ দেখা দেবে। তখন মানুষের ভোগ ব্যয়, ব্যাংকের আমানত—সবই কমবে। ফলে পুরো মুদ্রানীতিই নতুন করে আরও কঠোর করতে হবে। আর তাতে কমবে বিনিয়োগ। মনে রাখতে হবে, গত এক দশকের মধ্যে দেশে বিনিয়োগের হার এখনই সবচেয়ে কম।
সরকারের আয় ও ব্যয়ের চাপ
বিএনপি সরকারের ‘প্ল্যান এ’ কার্যকর করতে সরকারকে বাড়তি ব্যয় করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হচ্ছে সরকারের আয় অত্যন্ত কম। এতটাই কম যে সরকারকে এখন ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ঋণ করে চলতে হচ্ছে। গত অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ বছরের মধ্যে প্রথমবার ৭ শতাংশের নিচে নেমে যায়। চলতি অর্থবছরেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। সুতরাং সরকার কোথায় কী ব্যয় করবে, আর আয় কোথা থেকে আসবে—এ নিয়েই তো ‘প্ল্যান বি’ দরকার।
ইরান যুদ্ধের সময় কাতারের রাস লাফানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) রপ্তানি প্ল্যান্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কাতারের হিসাবে, এটি পুনর্নির্মাণে তিন থেকে পাঁচ বছর লাগতে পারে। ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে কাতারের এলএনজির ওপর বেশি নির্ভরশীল দেশগুলো। এর মধ্যে বাংলাদেশও আছে। তাহলে এখন কি যুক্তরাষ্ট্র থেকেই এলএনজি বেশি আনতে হবে? তাহলে ব্যয় কত বাড়বে? এরও হিসাব করতে হবে। এমনিতেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তির নানা ধারা নিয়ে উদ্বেগ আছে। এই চুক্তি কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, তা নিয়েও তো ‘প্ল্যান বি’ দরকার।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন
বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ নিয়ে এপ্রিলের হালনাগাদ প্রতিবেদনে ইরান যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু আশঙ্কার কথা বলেছে। যেমন—জ্বালানির দাম বাড়ায় চলতি হিসাব ঘাটতি জিডিপির প্রায় ১ শতাংশ পর্যন্ত যেতে পারে; মূল্যস্ফীতি অন্তত দশমিক ৫ শতাংশ পয়েন্ট বাড়তে পারে; শিল্পে প্রবৃদ্ধি কমবে, রপ্তানি ধীর হবে, আমদানি বাড়ায় বাণিজ্য ভারসাম্য খারাপ হবে; প্রবাসী আয়ে চাপ পড়বে, ২০২৬-২৭ সময়ে প্রায় ১৬ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকবে; সরকারের ব্যয় জিডিপির প্রায় দশমিক ৮ শতাংশ পয়েন্ট বাড়তে পারে। ফলে সরকারি ঋণ জিডিপির ৪৬ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। সবশেষে বলেছে, আগেই দুর্বল ব্যাংক খাত আরও দুর্বল হতে পারে। এতে বিনিয়োগ কমবে এবং কর্মসংস্থান তৈরির সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সব মিলিয়ে অর্থনীতি আবারও কঠিন পরীক্ষার সামনে দাঁড়িয়ে। বাংলাদেশ এমনিতে কঠিন পরীক্ষার মধ্যে আছে কোভিডের পর থেকেই। এ থেকে উত্তরণের দায়িত্ব নিয়েছে বিএনপি সরকার। আইএমএফ বারবার একটাই কথা বলছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এবারের যুদ্ধের ঝুঁকি বেশি। তবে সঠিক নীতি নিলে ক্ষতি কিছুটা সামলানো সম্ভব। সেই সঠিক নীতি কী ‘প্ল্যান এ’তে আছে? সম্ভাবনা কম। তাহলে সরকারের ‘প্ল্যান বি’ কী?



