নিউজিল্যান্ডে জনসংখ্যা সংকট: হাজার হাজার নাগরিক দেশ ছাড়ছেন, অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমাচ্ছেন
নিউজিল্যান্ডের রাজধানী ওয়েলিংটনের সাবেক মেয়র টোরি ওয়ানাও এখন নিজ দেশ ছেড়ে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে বসবাস করছেন। ৪২ বছর বয়সী এই নারী মেয়রের দায়িত্ব শেষ হওয়ার পর নিউজিল্যান্ডে ভালো কাজের সুযোগ না পেয়ে প্রতিবেশী দেশে চলে গেছেন। ওয়ানাওয়ের মতে, বিদেশে উন্নতির সুযোগ এখন নিউজিল্যান্ডের চেয়ে অনেক বেশি।
দেশত্যাগের রেকর্ড সংখ্যা
কেবল টোরি ওয়ানাও নন, তাঁর মতো হাজার হাজার নিউজিল্যান্ডবাসী এখন দেশ ছাড়ছেন। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত এক বছরে প্রায় ৭১ হাজার নাগরিক বিদেশে চলে গেছেন। এই সংখ্যা দেশটির মোট জনসংখ্যার ১ শতাংশেরও বেশি। ২০০৮ সালের বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকটের পর এত বড় দেশত্যাগের ঘটনা নিউজিল্যান্ডে আর দেখা যায়নি।
দেশ ছাড়া মানুষের অর্ধেকই পাড়ি জমাচ্ছেন অস্ট্রেলিয়ায়। দুই দেশের মধ্যে বিশেষ চুক্তির কারণে নিউজিল্যান্ডের নাগরিকরা সহজেই অস্ট্রেলিয়ায় থাকতে ও কাজ করতে পারেন। নিউজিল্যান্ডের অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়েছে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে গেছে। তাই ভালো বেতন ও উন্নত জীবনের আশায় মানুষ দেশ ছাড়ছেন।
সরকারের উদ্বেগ ও পদক্ষেপ
নিউজিল্যান্ডের জন্য এটি এখন বড় দুশ্চিন্তার বিষয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ বিভাগ একটি বিজ্ঞাপন তৈরি করেছে, যেখানে অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার অসুবিধাগুলো তুলে ধরা হয়েছে। বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, অস্ট্রেলিয়ার উত্তরে ভয়ংকর প্রাণী, পূর্ব দিকে ভিড় ও মরুভূমি এলাকা শহর থেকে দূরে। সরকার চায়, নাগরিকরা দেশে ফিরে আসুন।
নিউজিল্যান্ডের মানুষ অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার পেছনে সাধারণ কিছু কারণ কাজ করছে। সেখানে বেশি বেতন, ক্যারিয়ারে উন্নতির সুযোগ ও জীবনযাত্রার খরচ কম। ফলে মাস শেষে ভালো টাকা জমানো সম্ভব হয়। মানুষ উন্নত জীবনের আশায় দেশ ছাড়ছে।
অর্থনৈতিক সংকট ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা
নিউজিল্যান্ডের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা বেশ নাজুক। করোনা মহামারির পর সরকার বাজারে টাকা ছাড়লে মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে যায়। এখন সুবিধা তুলে নেওয়ায় অর্থনীতি মন্দার মুখে। দেশটিতে বেকারত্বের হার ৫.৩ শতাংশ, যা গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
২৮ বছর বয়সী নাজ ম্যাডেন-ফ্রান্ডি আগে হ্যামিল্টন শহরে কাজ করতেন। তিনি জানান, সেখানে আয় ভালো হলেও জীবন চালানো কষ্টের ছিল। ভালো বেতনের আশায় তিনি এখন অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনে চলে গেছেন। সেখানে তিনি ও তাঁর স্বামী আগের চেয়ে বেশি আয় করছেন এবং বাড়ির জন্য টাকা জমাতে পারছেন।
দেশত্যাগের নতুন প্রবণতা
নিউজিল্যান্ডের ম্যাসি ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞানী পল স্পুনলি জানান, সাধারণত অর্থনৈতিক মন্দার সময় মানুষ দেশ ছাড়ে এবং অবস্থা ভালো হলে ফিরে আসে। কিন্তু এবারের চিত্র ভিন্ন। শুধু তরুণরাই নন, বয়স্ক ব্যক্তিরাও অস্ট্রেলিয়ায় থাকা পরিবারের কাছে চলে যাচ্ছেন। এর মানে হলো, মানুষ পাকাপাকিভাবে বিদেশে থাকার পরিকল্পনা করছেন।
সরকারের ভয়, দেশ তার সেরা দক্ষ মানুষদের হারিয়ে ফেলছে, যা ভবিষ্যতের জন্য ভালো নয়। তবে একটি ইতিবাচক দিক হলো, গত এক বছরে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার বিদেশি নিউজিল্যান্ডে বসবাসের জন্য প্রবেশ করেছেন।
সরকারের সংস্কার কর্মসূচি
নিউজিল্যান্ড সরকার হাত গুটিয়ে বসে নেই। তারা উচ্চাভিলাষী সংস্কার কর্মসূচি হাতে নিয়েছে যেন মেধাবী নাগরিকরা দেশ ছেড়ে না যান। সরকার ব্যবসায়ীদের জন্য কর কমিয়েছে ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে এসব পদক্ষেপে মানুষ দেশে ফিরবেন কি না, তা সময়ই বলে দেবে।



