হরমুজ প্রণালি যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত: বিশ্ব অর্থনীতি ও প্রযুক্তি সরবরাহে বড় হুমকি
বিশ্ববাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বর্তমানে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। পৃথিবীর মোট পরিধি প্রায় ৪০ হাজার কিলোমিটার হলেও, এই বিশাল অর্থনীতি আসলে মাত্র ১০০ মাইলের মতো কয়েকটি সংকীর্ণ জলপথের উপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে হরমুজ প্রণালি ও তাইওয়ান প্রণালি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি পথ হিসেবে বিবেচিত হয়।
হরমুজ প্রণালির সংকট: জ্বালানি সরবরাহে ধাক্কা
গত দেড় মাসে ইরান হরমুজ প্রণালিকে প্রায় যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করেছে, যেখানে সবচেয়ে সরু অংশের প্রস্থ মাত্র ২১ মাইল। এখানে জাহাজ চলাচল ভীষণভাবে কমে গেছে, তেলবাহী ট্যাংকারগুলো ভয়ে থেমে রয়েছে এবং ইরানের ছোট নৌকা ও ড্রোনগুলো চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে তেল ও গ্যাস সরবরাহে বড় ধাক্কা লেগেছে, কারণ বিশ্বের একটি বড় অংশের জ্বালানি এই পথ দিয়ে যায়।
এই সংকট শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সমস্যা নয়, বরং এশিয়ায় সম্ভাব্য বড় সংঘাতের একটি মহড়া হিসেবে দেখা হচ্ছে। চীন এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে তাইওয়ানকে ঘিরে একই ধরনের কৌশল প্রয়োগ করতে পারে, যা বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তি সরবরাহকে ব্যাহত করতে পারে।
তাইওয়ান প্রণালির গুরুত্ব: প্রযুক্তির প্রাণ
তাইওয়ান প্রণালি সবচেয়ে সরু জায়গায় প্রায় ৮১ মাইল চওড়া, কিন্তু এর গুরুত্ব তেলের জন্য নয়, বরং প্রযুক্তির জন্য। তাইওয়ানের টিএসএমসি কোম্পানি বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত চিপের ৯০ শতাংশের বেশি উৎপাদন করে, যা আধুনিক প্রযুক্তির প্রাণ হিসেবে বিবেচিত। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যুদ্ধবিমান, স্মার্টফোন—সবকিছুই এই চিপের উপর নির্ভরশীল।
এই নির্ভরতা কমাতে যুক্তরাষ্ট্র ২০২২ সালে ‘চিপস অ্যান্ড সায়েন্স অ্যাক্ট’ পাস করেছে, যাতে দেশেই চিপ উৎপাদন বাড়ানো যায়। টেক্সাস, ওহাইও ও নিউইয়র্কে নতুন কারখানার পরিকল্পনা রয়েছে, কিন্তু বাস্তবে এখনো যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ তাইওয়ানের চিপের উপর নির্ভরশীল।
চীনের লক্ষ্য ও বিশ্বাসযোগ্য প্রতিশ্রুতির প্রশ্ন
চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং শুধু অর্থনৈতিক সাফল্যের জন্য নয়, বরং ইতিহাসে নিজের নাম স্থায়ী করতে চান। তাঁর লক্ষ্য মাও সে-তুংয়ের ঘোষিত ‘এক চীন’ নীতি পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা, অর্থাৎ তাইওয়ানকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা। এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো যুক্তরাষ্ট্র কতটা দৃঢ়ভাবে প্রতিরোধ করবে।
যদি সি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র দ্বিধাগ্রস্ত হবে বা শেষ পর্যন্ত পিছু হটবে, তাহলে চীনের জন্য আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়ে যাবে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির ভাষায় এটিকে ‘বিশ্বাসযোগ্য প্রতিশ্রুতি’ বলা হয়—আপনি যা বলছেন, তা সত্যিই করবেন, এই বিশ্বাস প্রতিপক্ষের মধ্যে তৈরি করতে না পারলে প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। হরমুজ প্রণালিকে শক্তি প্রয়োগ করে আবার পুরোপুরি চালু করতে হবে, দীর্ঘ মেয়াদে আরও জাহাজ নির্মাণ করতে হবে, অস্ত্রভান্ডার বাড়াতে হবে এবং বিকল্প জ্বালানি সরবরাহের পথ তৈরি করতে হবে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশে পাইপলাইন প্রকল্প বাড়াতে হবে, যাতে হরমুজ প্রণালির উপর নির্ভরতা কমে।
যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী নৌবাহিনীর অধিকারী এবং অর্থনৈতিক শক্তিও তার হাতে রয়েছে। ইরানের সঙ্গে সংঘাত যেন একধরনের অনুশীলন, কিন্তু আসল পরীক্ষা হবে তাইওয়ানকে ঘিরে পরিস্থিতি। এই অবস্থায় তাইওয়ান আর শক্ত দুর্গ মনে হবে না, বরং অনিশ্চিত এক প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়াবে, যা বিশ্ব অর্থনীতি ও প্রযুক্তি ব্যবস্থার জন্য বড় হুমকি সৃষ্টি করতে পারে।



