স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পর উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোতে বিদ্যমান অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা হারানোর কারণে বাংলাদেশের প্রায় ১৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের রফতানি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির।
সংসদে বাণিজ্যমন্ত্রীর বক্তব্য
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনে চট্টগ্রাম-১১ আসনের সংসদ সদস্য জসিম উদ্দিন আহমেদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, “উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের ফলে উদ্ভূত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে বাণিজ্য ও বাজার বহুমুখীকরণের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।”
মন্ত্রী বলেন, “বাংলাদেশ শিগগিরই এলডিসি শ্রেণি থেকে উত্তরণ করবে। ফলে উন্নত দেশগুলোর বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যবস্থার আওতায় বর্তমানে পাওয়া অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা হারাবে, যা প্রায় ১৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের রফতানির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।”
চুক্তি ও উদ্যোগ
মন্ত্রী জানান, প্রভাব কমাতে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে জাপানের সঙ্গে একটি ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (ইপিএ) সম্পন্ন করেছে। একই সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (সিইপিএ) স্বাক্ষরের বিষয়ে আলোচনা চলছে।
মন্ত্রী বলেন, “ইউরোপীয় ইউনিয়ন, রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ (আরসিইপি), সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, চীন এবং অন্যান্য সম্ভাবনাময় রফতানি গন্তব্যের সঙ্গে ইপিএ, সিইপিএ বা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।”
বাণিজ্য ঘাটতি ও কারণ
মন্ত্রী জানান, দেশের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতির পেছনে আংশিকভাবে আগের সরকারের নীতিগত ব্যর্থতা এবং আংশিকভাবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি দায়ী। এর মধ্যে রয়েছে জ্বালানি সংকট, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, ডলারের সংকট এবং আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিকূল অবস্থা।
জ্বালানি, খাদ্য ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে ব্যয় বৃদ্ধি এবং রফতানি প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়ে যাওয়াও বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে সংসদে উল্লেখ করেন মন্ত্রী। মন্ত্রী জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে ২৪ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ২১ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার। ওই সময়ে দেশের রফতানি আয় ছিল ৫৫ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার, বিপরীতে আমদানির পরিমাণ ছিল ৭৯ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার।
রফতানি নির্ভরতা ও বহুমুখীকরণ
মন্ত্রী বলেন, “২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ২০২টি দেশ ও অঞ্চলে পণ্য রফতানি করলেও মোট রফতানি আয়ের ৮৪ শতাংশই তৈরি পোশাক খাত থেকে এসেছে।” একক খাতের ওপর নির্ভরতা কমাতে সরকার অন্যান্য সম্ভাবনাময় রফতানি খাতকেও পোশাকশিল্পের মতো সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বলে তিনি জানান।
মন্ত্রী বলেন, “চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, কৃষিপণ্য, ওষুধশিল্প, আইসিটি ও সফটওয়্যার সেবা, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য, হিমায়িত খাদ্য ও মাছ, এবং প্লাস্টিক পণ্য— এই আটটি খাতের আংশিক রফতানিকারকদের ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা দেওয়া হয়েছে।”
আবদুল মুক্তাদির বলেন, “সরকার বিজনেস প্রোমোশন কাউন্সিলের মাধ্যমে আটটি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতের উদ্যোক্তাদের সহায়তা দিচ্ছে। একই সঙ্গে টেকসই রফতানি প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে বৈশ্বিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে রফতানি নীতি ২০২৪-২০২৭ প্রণয়ন করা হয়েছে।”
বাজার সম্প্রসারণ ও অন্যান্য উদ্যোগ
বাজার সম্প্রসারণ ও বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা দূর করতে অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, উজবেকিস্তান, বেলারুশ ও কানাডার সঙ্গে বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ ব্যবস্থার আওতায় কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে বলে তিনি জানান। এছাড়া সরকার ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত বাণিজ্য মিশনের মাধ্যমে লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা এবং কমনওয়েলথ অব ইন্ডিপেনডেন্ট স্টেটসভুক্ত দেশগুলোতে নতুন রফতানি বাজার অনুসন্ধানের কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।
মন্ত্রী জানান, অন্যান্য উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলোর মাধ্যমে অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদার করা, কাঁচামাল আমদানির জন্য এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ড থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ প্রদান এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে রফতানিমুখী শিল্পের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার স্বল্পসুদে প্রি-শিপমেন্ট ঋণ তহবিল গঠন।
রফতানি বহুমুখীকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকে উৎসাহিত করতে সরকার কাগজ ও প্যাকেজিং পণ্যকে ‘প্রোডাক্ট অব দ্য ইয়ার ২০২৬’ ঘোষণা করেছে বলেও জানান তিনি।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য
বাগেরহাট-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল আলীমের এক আলাদা প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারে বাংলাদেশের চলমান উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন।
মন্ত্রী বলেন, “বাংলাদেশ ও ভুটান ২০২০ সালের ডিসেম্বরে একটি প্রেফারেনশিয়াল ট্রেড এগ্রিমেন্ট (পিটিএ) স্বাক্ষর করে, যার আওতায় বাংলাদেশের ১০০টি এবং ভুটানের ৩৪টি পণ্য শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা পাচ্ছে। নেপাল ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গে পিটিএ স্বাক্ষরের আলোচনা এগিয়ে চলছে। একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে প্রস্তাবিত কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (সিইপিএ) নিয়ে পরবর্তী দফার আলোচনার প্রস্তুতিও চলছে।”
মন্ত্রী বলেন, “এলডিসি উত্তরণের পর রফতানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি ও বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক জোট ও দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও বহুপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে বাংলাদেশ।”
সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানা এবং চট্টগ্রাম-১৩ আসনের সংসদ সদস্যের আলাদা প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, ভারত, আফগানিস্তান, ভুটান, নেপাল, শ্রীলংকা ও মালদ্বীপসহ সার্কভুক্ত দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের এখনও বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে।
সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানার প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৭ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার, যা সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। এছাড়া আফগানিস্তান, ভুটান ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গেও বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে।



