অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রে প্রভাব বিস্তারে পাকিস্তানের বিপুল ব্যয়
অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রে প্রভাব বিস্তারে পাকিস্তানের ব্যয়

অর্থনৈতিক সংকট, ঋণের বোঝা, মূল্যস্ফীতি এবং অভ্যন্তরীণ নানা সমস্যায় জর্জরিত পাকিস্তান একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তারের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশি প্রতিনিধিদের নিবন্ধন-সংক্রান্ত সরকারি নথিতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশটি প্রতি মাসে প্রায় ৯ লাখ মার্কিন ডলার ব্যয় করছে, যা বছরে এক কোটি থেকে এক কোটি বিশ লাখ ডলারের সমপরিমাণ।

প্রভাব বিস্তারে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি

প্রকাশিত নথিতে দেখা যায়, পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একাধিক প্রভাব-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রধান কাজ হলো- পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট মহলে যোগাযোগ স্থাপন করা এবং উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের ব্যবস্থা করা।

বিশ্লেষকের মতামত

পররাষ্ট্রবিষয়ক বিশ্লেষক রবিন্দর সচদেব সংবাদ সংস্থা এএনআইকে বলেন, ওয়াশিংটনে বিদেশি সরকারগুলোর পক্ষে প্রভাব বিস্তারের জন্য প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান নিয়োগ কোনো নতুন বিষয় নয়। বিভিন্ন দেশ দীর্ঘদিন ধরেই এমন পদ্ধতি অনুসরণ করে আসছে। তবে পাকিস্তানের সাম্প্রতিক ব্যয়ের পরিমাণ দেশটির বাড়তি কূটনৈতিক তৎপরতার স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তিনি জানান, সরকারি নথি অনুযায়ী পাকিস্তান প্রতি মাসে প্রায় ৯ লাখ ডলার ব্যয় করছে। এর মধ্যে একটি চুক্তির আওতায় পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জন্য উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের ব্যবস্থা করতে মাসিক ৫০ হাজার ডলার ব্যয় করা হচ্ছে। অন্য একটি চুক্তির মাধ্যমে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের লক্ষ্যে প্রতি মাসে আড়াই লাখ ডলার ব্যয় করা হচ্ছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ব্যয় বৃদ্ধির প্রমাণ

সচদেব আরও বলেন, গত বছরের অক্টোবর মাসে একটি প্রতিষ্ঠানকে মাসিক ২৫ হাজার ডলারের বিনিময়ে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সেই প্রতিষ্ঠানই প্রায় বারো লাখ ডলারের নতুন চুক্তি লাভ করেছে। তার মতে, এটি যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানের প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টার ব্যাপক সম্প্রসারণের প্রমাণ।

সামরিক উত্তেজনার মধ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা

এই তথ্যগুলো এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্ব সাম্প্রতিক ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা নিয়ে ভিন্নধর্মী বক্তব্য দিচ্ছে। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির, যিনি পরে ফিল্ড মার্শাল পদে উন্নীত হন, সম্প্রতি দাবি করেন যে ভারত সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনার সময় যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে মধ্যস্থতার আগ্রহ প্রকাশ করেছিল এবং পাকিস্তান আঞ্চলিক শান্তির স্বার্থে সেই প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছিল।

রাওয়ালপিন্ডিতে সেনাবাহিনীর প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এ বক্তব্য দেন। পাকিস্তানের দৈনিক ডনের প্রতিবেদনে বলা হয়, আসিম মুনিরের দাবি অনুযায়ী ভারত যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের মাধ্যমে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি নথিতে প্রকাশিত তথ্য ভিন্ন এক বাস্তবতা তুলে ধরে।

৬০টি যোগাযোগ ও বৈঠক

প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৬ মে থেকে ৯ মে পর্যন্ত সময়ের মধ্যে পাকিস্তানের প্রতিনিধিরা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রায় ৬০টি যোগাযোগ ও বৈঠক সম্পন্ন করেন। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছিল দেশটির আইনসভা, প্রতিরক্ষা দপ্তর এবং অর্থ মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী সংস্থা।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই সময়টিই ছিল ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছানোর সময়। পেহেলগামে সংঘটিত সন্ত্রাসী হামলার পর ভারত যে সামরিক অভিযান পরিচালনা করে, সেই অভিযানের সময়ও ওয়াশিংটনে পাকিস্তানের এই কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত ছিল।

ভারতের সামরিক অভিযান

ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৬ ও ৭ মে রাতের অভিযানে ভারতীয় বাহিনী পাকিস্তান এবং পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর অঞ্চলে অবস্থিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়টি স্থাপনায় সমন্বিত ও নির্ভুল হামলা চালায়।

সমান্তরাল কৌশল

একদিকে সীমান্তে সামরিক উত্তেজনা, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোতে নিবিড় যোগাযোগ এই দুই ধারার কর্মকাণ্ড একই সময়ে পরিচালিত হওয়ায় বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক ও কূটনৈতিক উভয় ক্ষেত্রে সমান্তরালভাবে সক্রিয় থাকার মাধ্যমে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। সীমান্তে সংঘাত চলমান থাকলেও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সমর্থন অর্জন এবং নীতিনির্ধারণী মহলে প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা দেশটির কৌশলগত পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

অর্থনৈতিক বৈপরীত্য

অর্থনৈতিক দুরবস্থার মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রে এই বিপুল ব্যয় পাকিস্তানের অগ্রাধিকার ও পররাষ্ট্রনীতির বাস্তব চিত্র সম্পর্কে নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করেছে। যখন দেশটির সাধারণ জনগণ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান সংকট এবং ঋণচাপের মতো সমস্যার মুখোমুখি, তখন আন্তর্জাতিক প্রভাব বিস্তারে কোটি কোটি ডলার ব্যয়ের বিষয়টি দেশটির অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতির মধ্যে একটি স্পষ্ট বৈপরীত্য হিসেবে সামনে এসেছে।