স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার সুপারিশ করেছে জাতিসংঘ— সপ্তাহজুড়ে দেশের প্রায় সব গণমাধ্যমে এমন সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট কমিটির মূল প্রতিবেদনের ভাষ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাস্তবে তারা তিন বছরের কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমার সুপারিশ করেনি। বরং ‘স্বল্প সময়ের’ বা শর্টার এক্সটেনশন দেওয়ার কথা বলেছে।
সরকারের আবেদন এক জিনিস, সিডিপির সুপারিশ আরেক
বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের নির্ধারিত সময় ২০২৬ সালের নভেম্বর। তবে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক চাপ, বৈশ্বিক বাণিজ্য অনিশ্চয়তা, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, কর সংস্কারসহ বিভিন্ন প্রস্তুতির কথা উল্লেখ করে সরকার জাতিসংঘের কাছে উত্তরণের জন্য আরও তিন বছর সময় চেয়েছে।
সিডিপি সেই আবেদন বিবেচনা করে প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর পক্ষে মত দিলেও তাদের প্রতিবেদনে কোথাও তিন বছরের কথা বলা হয়নি। বরং প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিন বছরের পরিবর্তে “shorter extension” বা অপেক্ষাকৃত কম সময়ের বর্ধিত প্রস্তুতিকাল টেকসই উত্তরণের জন্য অধিক উপযোগী হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের ব্যাখ্যায়, জাতিসংঘের ভাষায় শর্টার এক্সটেনশন বলতে সাধারণত এক বছরের মতো সীমিত সময় বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ তিন বছর সময় চাইলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে তার চেয়ে অনেক কম সময় অনুমোদিত হতে পারে।
কেন দীর্ঘ সময় চায়নি সিডিপি
সিডিপির যুক্তি হলো, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে এলডিসি থেকে উত্তরণের সব সূচক উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে পূরণ করেছে। মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা– তিনটি সূচকেই বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় মানদণ্ড অতিক্রম করেছে।
কমিটির মূল্যায়ন অনুযায়ী, আগামী কয়েক বছরেও এসব সূচকের কোনোটি নির্ধারিত সীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকি খুবই কম। ফলে দীর্ঘ সময় এলডিসি তালিকায় থেকে গেলে উত্তরণের মাধ্যমে যে নতুন সুযোগ ও সুবিধা পাওয়া সম্ভব, সেগুলো অর্জনেও বিলম্ব হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তুলনামূলকভাবে স্বল্প সময়ের প্রস্তুতিকাল বাংলাদেশকে এলডিসিভিত্তিক বিশেষ বাণিজ্য সুবিধার ওপর নির্ভরতা কমাতে সহায়তা করবে। একইসঙ্গে উচ্চ উৎপাদনশীলতা, অধিক মূল্য সংযোজন এবং প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতিতে দ্রুত রূপান্তরের পথও সুগম করবে।
সংকটের বাস্তবতা স্বীকার করেছে জাতিসংঘ
তবে সিডিপি বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জও অস্বীকার করেনি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিস্থিতির পরিবর্তন, সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক অভিঘাতের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব এবং দেশের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।
এসব কারণে প্রস্তুতিকাল কিছুটা বাড়ানোর যৌক্তিকতা রয়েছে বলে মনে করে কমিটি। তবে একইসঙ্গে তারা সতর্ক করে বলেছে, প্রস্তুতিকাল বৃদ্ধি কোনোভাবেই সংস্কার বিলম্বিত করার অজুহাত হতে পারে না। বরং এই সময়ের মধ্যে দৃশ্যমান ও পরিমাপযোগ্য সংস্কার অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হবে।
সংস্কার ছাড়া বাড়তি সময়ের যৌক্তিকতা নেই
সিডিপির প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো– প্রস্তুতিকাল বৃদ্ধি তখনই অর্থবহ হবে, যখন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ সংস্কারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখাতে পারবে। কমিটি বিশেষভাবে আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ, সরকারি ব্যয়ের অগ্রাধিকার পুনর্বিন্যাস এবং সুশাসন জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, সংস্কারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ছাড়া প্রস্তুতিকাল বৃদ্ধি কীভাবে টেকসই উত্তরণ নিশ্চিত করবে, তা বোঝা কঠিন। অর্থাৎ জাতিসংঘের বার্তা হচ্ছে, সময় নয়, সংস্কারই মূল বিষয়।
সরকারের জরুরি তৎপরতা
সিডিপির সুপারিশ পাওয়ার পরপরই সরকার বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা শুরু করেছে। বুধবার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক জরুরি বৈঠকে এলডিসি উত্তরণ-সংক্রান্ত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে একটি উচ্চপর্যায়ের মনিটরিং কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, গত ২৯ এপ্রিল সিডিপির সঙ্গে বাংলাদেশের একটি ভার্চুয়াল বৈঠক হয়। সেখানে সরকার বিভিন্ন সংস্কার কর্মসূচির বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দেয়। এর ভিত্তিতে ২৫টি ক্ষেত্রে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে।
এসব ক্ষেত্রের মধ্যে রয়েছে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, কর সংস্কার, সুশাসন, রফতানি বহুমুখীকরণ, মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং মেধাস্বত্ব-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতার জন্য ওষুধ শিল্পের প্রস্তুতি।
সরকার এখন দ্রুত জাতিসংঘের কাছে আনুষ্ঠানিক অঙ্গীকারপত্র পাঠানো এবং সাধারণ পরিষদে সমর্থন আদায়ে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখন সাধারণ পরিষদের
সিডিপির সুপারিশ গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটিই শেষ কথা নয়। বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ানো হবে কিনা এবং হলে কত দিনের জন্য হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ।
ফলে এখনও নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না যে বাংলাদেশ তিন বছর, এক বছর কিংবা অন্য কোনও সময়সীমার বর্ধিত প্রস্তুতিকাল পাবে। তবে সিডিপির প্রতিবেদনের ভাষা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট, জাতিসংঘ বাংলাদেশের আবেদনকে সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করলেও দীর্ঘ সময় ধরে এলডিসি অবস্থান বজায় রাখার পক্ষে নয়। বরং তারা সীমিত সময়ের সুযোগ দিয়ে দ্রুত সংস্কার বাস্তবায়নের মাধ্যমে টেকসই উত্তরণ নিশ্চিত করতে চায়।
মূল প্রশ্ন এখন সময় নয়, সংস্কার
বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বাড়তি সময় পাওয়া নয়; বরং সেই সময়কে কাজে লাগানো। কারণ জাতিসংঘের বার্তা স্পষ্ট, উত্তরণ বিলম্বিত করার সুযোগ পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু সেই সুযোগের বিনিময়ে অর্থনীতি, রাজস্ব ব্যবস্থা, আর্থিক খাত ও সুশাসনে দৃশ্যমান সংস্কার দেখাতে হবে।
না হলে বাড়তি সময় পেলেও তার কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলবে না। আর সেই কারণেই এলডিসি উত্তরণ বিতর্কে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কত বছর সময় পাবে, তা নয়; বরং সেই সময়ের মধ্যে কতোটা সংস্কার বাস্তবায়ন করতে পারবে।



