রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন: ইউনূস সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব?
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন: ইউনূস সরকারের প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তব?

২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত কর্তৃত্ববাদী সরকারের রেখে যাওয়া দীর্ঘ অপূর্ণ কাজের তালিকা নিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে যাত্রা শুরু করেন, এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। এসব কাজের অনেকগুলোই ছিল কাঠামোগত ও নীতিগত ত্রুটিতে জর্জরিত। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আগের সরকারের ব্যর্থতা ছিল তার মধ্যে অন্যতম।

ইউনূস সরকারের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি

ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় শুরু থেকেই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০২৬ সালের ঈদের মধ্যে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ঘোষণা পুরো দেশবাসীর প্রশংসা কুড়িয়েছিল। শরণার্থী রোহিঙ্গারও এই ঘোষণায় নিজ মাতৃভূমিতে ফিরতে আশায় বুক বেঁধেছিলেন।

তবে ২০২৬ সালের ঈদ পেরিয়ে যাওয়ার পরও একজন রোহিঙ্গাকেও প্রত্যাবাসন করা সম্ভব হয়নি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠেছে—এটি কি তাহলে কেবলই কথার কথা ছিল; নাকি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত অবাস্তব আশ্বাস? নাকি ধরে নেওয়া হয়েছিল, জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হস্তান্তরের পর এই প্রতিশ্রুতি ধীরে ধীরে মানুষের স্মৃতি থেকে হারিয়ে যাবে? নাকি এটি সেই পুরোনো ধারা, যেখানে ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে বারবার প্রতিশ্রুতির ওপরই নির্ভর করে থাকতে হয়? সম্ভবত এ সবগুলোই এই প্রশ্নের উত্তর।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রাথমিক পদক্ষেপ ও অগ্রগতি

রোহিঙ্গা ইস্যুতে ড. ইউনূসের প্রাথমিক বক্তব্য ও পদক্ষেপে একটি সচেতন অবস্থান স্পষ্ট ছিল—তিনি ছিলেন একইসঙ্গে সতর্ক এবং আশাবাদী। তার সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলোও শুরুতে ইতিবাচক অগ্রগতির ইঙ্গিতই দিচ্ছিল। তিনি রোহিঙ্গা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যু দেখভালের জন্য একজন “হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ” নিয়োগ দেন। ২০২৪ সালের আগস্টের আগে পূর্ববর্তী সরকার মূলত অস্থায়ী ও তাৎক্ষণিক পদক্ষেপেই সীমাবদ্ধ ছিল, যা দীর্ঘদিনের জটিল ভূরাজনৈতিক সংকটের সমাধানে কার্যকর হয়নি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র কক্সবাজার রোহিঙ্গাদের আতিথ্য ও সংহতির সঙ্গে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। তবে দুঃখজনকভাবে, এই শহরটি এখন দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার ব্যাপক উপস্থিতির কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে; মানবিক সহায়তার নামে তাদের অবকাঠামো শহরের উল্লেখযোগ্য অংশ দখল করে নিয়েছে। কিছু পর্যবেক্ষকের মতে, এটিকে “রিফিউজি ট্যুরিজম” বলা যেতে পারে। বিশেষ করে বিশ্বের দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন সমুদ্রসৈকত এখানে থাকায় এ ধরনের প্রবণতা আরও চোখে পড়ছে।

সংকটের মাত্রা ও পরিসংখ্যান

সংকটের মাত্রা কতটা বিস্তৃত, তার পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গার সংখ্যা ছিল প্রায় দুই লাখ, যা ১৯৯৮ সালে বেড়ে দাঁড়ায় তিন লাখে। মিয়ানমারে গণহত্যা ও জাতিগত নিধনের কারণে ২০১৭ সালে একবছরেই আরও ৭ লাখ ২৩ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে। মিয়ানমারে অব্যাহত নির্যাতনের ফলে এরপরও রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আসা থেমে থাকেনি। ২০২৪ সালে তাদের সংখ্যা দাঁড়ায় ৯ লাখ ৯৪ হাজার ১২৪ জনে, যদিও অনেকের মতে তা ১০ লাখ ছাড়িয়েছে। ২০২৫ সালে আরও ১ লাখ ১৩ হাজার রোহিঙ্গা কক্সবাজারে আসে।

এর ফলে স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও রোহিঙ্গাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য জনসংখ্যাগত ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। ২০২৪ সালে কক্সবাজারে স্থানীয় জনসংখ্যা ছিল ৫ লাখ ৯৭ হাজার ২৩ জন, আর রোহিঙ্গা প্রায় ১০ লাখ। নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে এমন পরিসংখ্যান কি উদ্বেগজনক নয়? তবে উল্লেখ করা জরুরি, রোহিঙ্গারা তাদের জীবন রক্ষার জন্য বাংলাদেশের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে, যার ফলে তাদের পক্ষ থেকে সরাসরি সংঘাতের আশঙ্কা তুলনামূলকভাবে কম।

কূটনৈতিক উদ্যোগ ও বাস্তবতা

অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগের দিকে ফিরে গেলে দেখা যায়, একজন অভিজ্ঞ কূটনীতিক, অর্থনীতিবিদ ও সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তাকে হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও রোহিঙ্গা দু’পক্ষের মধ্যেই আশার সঞ্চার করেছিল। তবে সময়ের সঙ্গে স্পষ্ট হয়, কেবল সাধারণ কূটনৈতিক দক্ষতা দিয়েই পাঁচ দশকের পুরোনো ভূরাজনৈতিক জটিলতা পুরোপুরি বোঝা বা সমাধান করা সহজ নয়।

২০২৫ সালের মার্চে ড. ইউনূস জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসকে সঙ্গে নিয়ে কক্সবাজারের উখিয়ায় প্রায় এক লাখ রোহিঙ্গার সঙ্গে ইফতারে অংশ নেন। এর পরপরই এপ্রিলের শুরুতে বিমসটেকের ষষ্ঠ বৈঠকে মিয়ানমারের উপপ্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের মৌখিক আশ্বাস পায় বাংলাদেশ। এই ঘোষণা তাৎক্ষণিকভাবে আশার আলো জাগালেও পরে তা স্থবির হয়ে পড়ে—মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের পাশাপাশি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যথেষ্ট চাপ ও অনুসরণের অভাবও এর জন্য দায়ী বলে মনে করা হয়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ছিল, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সদর দফতরে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে রোহিঙ্গা ইস্যু উত্থাপন। সেখানে রাষ্ট্রগুলোর জবাবদিহিতা, মানবিক সহায়তা এবং নিরাপদ, স্বেচ্ছা ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। তবে অংশগ্রহণকারী দেশগুলো মূলত অর্থায়ন বৃদ্ধির ওপর জোর দেয়, প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার বিষয়টি সেখানে তেমন গুরুত্ব পায়নি। কোনও রাষ্ট্রপ্রতিনিধিই মিয়ানমারকে তার নাগরিকদের ফিরিয়ে নেওয়ার বাধ্যবাধকতার প্রশ্নটি জোরালোভাবে তোলেননি। একই সময়ে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন যুদ্ধ ও সংঘাতের দিকে মনোযোগ সরে যাওয়ায় রোহিঙ্গা সংকটে দাতাদের আগ্রহও ধীরে ধীরে কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় প্রভাব ও ভবিষ্যৎ

এর মধ্যে কক্সবাজারের সামাজিক-অর্থনৈতিক, পরিবেশগত এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে অবনতি হয়েছে। স্থানীয়দের প্রাথমিক আতিথেয়তা ধীরে ধীরে বিরক্তিতে রূপ নিচ্ছে। অপরদিকে, রোহিঙ্গারা এখনও পরিচয়হীনতা, সীমিত শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মতো গুরুতর সমস্যার মুখোমুখি—যা তাদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান হতাশা তৈরি করছে।

২০২৫ সালের এক গবেষণা অনুযায়ী, ২০১৭ সালে কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক সংকট ছিল ১৩ শতাংশ, যা ২০২৩ সালে বেড়ে ৩০ শতাংশে দাঁড়ায়। একই সময়ে রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে তা ৫৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮৬ শতাংশে পৌঁছায়। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বেকারত্বের হার ২০২২ সালের ৭ শতাংশ থেকে ২০২৩ সালে ১৬ শতাংশে দাঁড়ায়। এর ফলে শ্রমবাজারে চাপ বৃদ্ধি, দৈনন্দিন মজুরি কমে যাওয়া, নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়া, ছোট ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং মাদক ও চোরাচালানের মতো অবৈধ কর্মকাণ্ডে উভয় জনগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা বাড়ার প্রবণতা দেখা দেয়।

উপসংহার: প্রশ্ন থেকেই যায়

সব মিলিয়ে প্রশ্নগুলো থেকেই যায়—অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিশ্রুতি, কূটনৈতিক আশ্বাস এবং আন্তর্জাতিক উদ্যোগ থেকে রোহিঙ্গারা আসলে কী পেল? আরেকটি ঈদ কি তাদের ঘরে ফেরার নতুন স্বপ্ন হয়েই থেকে যাবে? নাকি অনিশ্চয়তার মধ্যেই দীর্ঘ শরণার্থী জীবনই তাদের একমাত্র বাস্তবতা হয়ে থাকবে?

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ