ভিয়েতনামে নকল বিলাসপণ্যের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান, জব্দ ২৩ হাজার জোড়া স্যান্ডেল
ভিয়েতনামে নকল পণ্যের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান

চলতি বছরের শুরুতে ভিয়েতনামের হো চি মিন সিটির উপকণ্ঠে দুটি গুদামে অভিযান চালিয়ে পুলিশ ২৩ হাজার জোড়ার বেশি নকল স্যান্ডেল উদ্ধার করে। এসব স্যান্ডেলে নাইকি, অ্যাডিডাস, ক্রকস ও গুচির লোগো থাকলেও প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে গুদামের কোনো সম্পর্ক ছিল না। অভিযানে প্রায় ২০০ কোটি ভিয়েতনামি ডং (প্রায় ৭৬ হাজার মার্কিন ডলার) মূল্যের পণ্য জব্দ করা হয়।

নকল পণ্যের বৈশ্বিক কেন্দ্র ভিয়েতনাম

সেই গুদাম থেকে মাত্র ৩০ কিলোমিটার দূরে হো চি মিন সিটির পর্যটন এলাকার খোলাবাজারে একই ধরনের নকল স্যান্ডেল বিক্রি হচ্ছে। বিদেশে যেসব স্যান্ডেলের দাম ৯০০ ডলার পর্যন্ত, সেগুলোর নকল সংস্করণ মিলছে মাত্র ৩০ ডলারে। পাশাপাশি রয়েছে ‘শ্যানেলের’ ব্যাগ, ‘প্রাডার’ টি-শার্ট ও ‘রোলেক্স’ ঘড়িসহ নানা নকল বিলাসপণ্য।

সস্তা নকল বিলাসপণ্যের অন্যতম বৈশ্বিক কেন্দ্র হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে ভিয়েতনামের পরিচিতি। বিশ্বের সবচেয়ে বড় নকল পণ্যের বাজারগুলোর কয়েকটির অবস্থান এই দেশে। তবে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে থাকায় সরকার এখন সেই বদনাম ঘোচাতে তৎপর।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সরকারের কঠোর অবস্থান

বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ লঙ্ঘনের অভিযোগে ৭ মে ভিয়েতনাম সরকার দেশব্যাপী অভিযান শুরু করে। নকল পণ্য, অনলাইন পাইরেসি ও ট্রেডমার্ক লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে চালানো হয় এই অভিযান। যদিও এমন অভিযান দেশটিতে নতুন নয়, তবে সাম্প্রতিক অভিযানের ব্যাপ্তি ও কঠোরতা আগের চেয়ে অনেক বেশি।

হো চি মিন সিটির সাইগন স্কয়ারের এক পোশাক বিক্রেতা (ছদ্মনাম থ্যান ট্রুক) বলেন, ‘আগে অভিযান হলেও মূলত দামি ব্যাগ বা স্যুটকেসের মতো পণ্যের দিকে নজর থাকত। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। এখন অভিযান অনেক কঠোর।’ সাক্ষাৎকার দেওয়ার কিছুক্ষণ আগেই তিনি ৫০০ ডলার মূল্যের লোয়ে ব্র্যান্ডের একটি টি-শার্টের নকল সংস্করণ ১৭ ডলারে বিক্রি করেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

যুক্তরাষ্ট্রের চাপেই কঠোর অবস্থান

এবার আন্তর্জাতিক চাপের কারণে অভিযান আরও জোরদার হয়েছে, বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতির কারণে। এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তরের এক প্রতিবেদনে বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ সুরক্ষায় দীর্ঘদিনের ব্যর্থতার কারণে ভিয়েতনামকে ‘অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিদেশি দেশ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। গত ১৩ বছরে প্রথমবার কোনো দেশকে এই আখ্যা দেওয়া হলো। একই প্রতিবেদনে ভিয়েতনামকে বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ অধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অপরাধীও বলা হয়।

নতুন শুল্ক আরোপের আশঙ্কায় ভিয়েতনাম সরকার মে মাসে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় অন্তত ২০ শতাংশ বেশি অভিযান চালানোর প্রতিশ্রুতি দেয়। এই অভিযানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল সাইগন স্কয়ার ও পাশের বেন থান মার্কেট, দেশটির সবচেয়ে বড় নকল পণ্যের বাজারগুলোর মধ্যে অন্যতম। মে মাসের মাঝামাঝি আকস্মিক কয়েকটি অভিযানে এসব বাজার থেকে বিপুল পরিমাণ নকল পণ্য জব্দ করা হয়। সেই সঙ্গে জরিমানা করা হয় ১৯ হাজার ডলারের বেশি।

নকল পণ্যের উৎস চীন

ভিয়েতনামের অধিকাংশ নকল পণ্যের উৎস চীন। দেশটির উত্তর সীমান্ত পেরিয়ে এসব পণ্য আসে। পাইকারেরা চীন থেকে স্থানীয় বাজারে বিক্রির উপযোগী পণ্য বড় পরিসরে আমদানি করে পরে ছোট ব্যবসায়ীদের কাছে সরবরাহ করেন। বিষয়টি হলো, ঘরের পাশে চীনের অবস্থান এবং ইউরোপের অনেক বিলাসবহুল ব্র্যান্ডের উৎপাদন এশিয়ায় হওয়া—এই দুটি কারণে নকল শিল্প উৎসাহিত হচ্ছে। কালোবাজারিরাও দক্ষ হয়ে উঠছেন।

তবু সাম্প্রতিক অভিযানকে সফল বলছে ভিয়েতনামের সরকার। মে মাসের শেষ তিন সপ্তাহেই ১ হাজার ৪০০টির বেশি বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ লঙ্ঘনের ঘটনা মোকাবিলা করেছে কর্তৃপক্ষ।

যুক্তরাষ্ট্রের চাপ আরও বাড়ছে

তবে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ কমেনি। মে মাসের শেষ দিকে ওয়াশিংটন তদন্ত শুরু করে, ভিয়েতনাম বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ লঙ্ঘন রোধে ব্যর্থ হয়ে মার্কিন বাণিজ্যের ক্ষতি করছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে। এরপর ভিয়েতনামও অভিযান আরও জোরদার করে। ১০ জুন থান হোয়া প্রদেশে পুলিশ ১০ হাজারের বেশি নকল গয়না উৎপাদন ও বিক্রির এক চক্রের সন্ধান পায়। বুলগারি, কার্তিয়ে, লুইস ভিটন ও টিফানি অ্যান্ড কোংয়ের নকল এসব পণ্য বিক্রি করে চক্রটি আনুমানিক ১১ লাখ ৪০ হাজার ডলার অবৈধ মুনাফা করেছে।

হো চি মিন সিটি ও হ্যানয়ের অনেক দোকান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পুলিশ গুদাম, পোশাকের দোকান ও জুতার বিক্রয়কেন্দ্রেও অভিযান চালিয়েছে।

কারও ক্ষতি, কারও সুযোগ

এই অভিযান নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে মতভেদ আছে। হো চি মিন সিটি ও দা লাতে নিজের পোশাকের ব্র্যান্ড পরিচালনা করেন থি নুগুয়েন। তাঁর মতে, নকল পণ্য শুধু ডিজাইনারদের মেধাস্বত্বই লঙ্ঘন করে না, ভিয়েতনামের খুচরা বাজারও বিশৃঙ্খল করে তোলে। থি আরও বলেন, ‘ক্রেতারা অবিকল আসলের মতো দেখতে নকল ডিজাইনের পোশাক কিনতে ৭৫ ডলার খরচ করেন। অথচ উন্নত কাপড় ও ভালো কারুকাজে তৈরি কাস্টম পোশাকের জন্য অর্ধেক দাম চাইলেও আপত্তি করেন।’

থির ভাষায়, ভিয়েতনামে দক্ষ দর্জি ও সূচিশিল্পীর অভাব নেই। কিন্তু তাঁদের অনেকেই যথাযথ পারিশ্রমিক পান না। শেষ পর্যন্ত অনেকে নকল পণ্য তৈরির কারখানায় কাজ করতে বাধ্য হন। নকল পণ্যের ব্যবসা কমে আসায় থি এখন নিজের ব্যবসায় আরও বিনিয়োগ ও দাম বাড়ানোর পরিকল্পনা করছেন। তাঁর মতে, ‘পরিচ্ছন্ন, স্বচ্ছ ও ন্যায্য ব্যবসায়িক পরিবেশে কাজ করার আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। এটি জয়-পরাজয়ের বিষয় নয়; বরং সঠিক ও ভুল, আসল ও নকলের মধ্যে ন্যায্যতা ফিরিয়ে আনার বিষয়।’

নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য নকলই ভরসা

অন্যদিকে সবাই এই অভিযানে খুশি নন। দা নাংয়ের অফিসকর্মী হুই নিয়মিত নকল ফুটবল জার্সি ও জুতা কেনেন। তাঁর মতে, ‘বিক্রেতাদের গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। যত দিন সহজে নকল পণ্য পাওয়া যাবে, তত দিন তিনি আগের মতোই কিনবেন।’ হুইয়ের ভাষায়, নকল পণ্য সস্তা ও সহজলভ্য; কেনাও সুবিধাজনক।

ভিয়েতনামের প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ গ্রামীণ এলাকায় বাস করেন। দেশটিতে গড় মাসিক আয় ২২৫ ডলার। ফলে সস্তা নকল পণ্যের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান অনেক নিম্ন আয়ের ক্রেতাকে বাজারের বাইরে ঠেলে দিতে পারে।

চাহিদা থাকলে বাজারও থাকবে

বিশ্লেষকেরা বলেন, নকল পণ্যের বাজারের মূল চালিকা হলো অর্থনৈতিক বাস্তবতা। তাঁদের মতে, মানুষ জানে পণ্যটি নকল। কিন্তু আসল পণ্য কেনার সামর্থ্য না থাকায় সেটিই তাঁদের কাছে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য বিকল্প। এতে তাঁরা সন্তুষ্টও হন। বিশ্লেষকেরা আরও বলেন, বিলাসপণ্যের প্রকৃত ক্রেতা ও নকল পণ্যের ক্রেতা প্রায় একেবারে ভিন্ন। ফলে নকল পণ্যের কারণে আন্তর্জাতিক বিলাসবহুল ব্র্যান্ডগুলোর প্রকৃত বিক্রির ক্ষতি খুবই সীমিত।

তাঁদের ভাষায়, নকল পণ্য না থাকলেও নিম্ন আয়ের মানুষ আসল ব্র্যান্ডের পণ্য কিনতেন না। তাঁদের সেই সামর্থ্য নেই, একটি ব্যাগের জন্য এত টাকা কেন দিতে হবে, সেটিও তাঁদের মাথায় ঢোকে না।

পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন

থ্যান ট্রুক জানান, তাঁর বেশির ভাগ ক্রেতাই বিদেশি পর্যটক। নকল পণ্যের বড় বাজারগুলোও পর্যটনকেন্দ্রে গড়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভিয়েতনামের নকল পণ্যের বাজার পুরোপুরি নির্মূল করা কঠিন। উৎপাদক ও বিক্রেতারা ইতিমধ্যে আইন এড়িয়ে যাওয়ার নতুন উপায় বের করছেন। যেমন নাইকির বদলে ‘মাইক’ নাম ব্যবহার করা বা নকশায় সামান্য পরিবর্তন আনা।

থি থান হুয়ং ত্রানের মতে, এমনভাবে নকশার পরিবর্তন করা হয় যেন আইনের ঝামেলায় পড়তে না হয়, কিন্তু পণ্যের চেহারা, মান ও ব্র্যান্ডের ভাবমূর্তি এমন যেন থাকে, ক্রেতারা তা কিনতে আগ্রহী হন। থানের ভাষায়, ‘যত নিয়মই করা হোক, যাঁদের জীবিকা এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল, তাঁরা টিকে থাকার নতুন পথ খুঁজে নেবেন। এটি পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়। যত দিন ক্রেতার চাহিদা থাকবে, তত দিন বিক্রেতাও থাকবে।’