ভেনেজুয়েলায় শক্তিশালী দুই ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত ১৬৪ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হয়েছে। তবে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস আশঙ্কা করছে, প্রাণহানি ১০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়া মানুষের সংখ্যা ও ক্ষয়ক্ষতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে এই পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি।
ভূমিকম্পের বিবরণ ও প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতি
ইউএসজিএস জানায়, স্থানীয় সময় বুধবার বিকেলে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার পশ্চিমে প্রথমে ৭ দশমিক ২ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়। এর এক মিনিটেরও কম সময়ের ব্যবধানে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দ্বিতীয় ভূমিকম্প হয়।
ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ ১৬৪ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন। তবে ভূমিকম্পে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত লা গুয়াইরা রাজ্যের তথ্য এই প্রাথমিক হিসাবে আসেনি। ওই এলাকায় ভবনের ছাদ ধসে পড়ার সময় মানুষের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার চিত্র ভিডিও ফুটেছে দেখা গেছে।
প্রাণহানির সম্ভাব্য সংখ্যা ও উদ্ধার তৎপরতা
ইউএসজিএস পূর্বাভাসমূলক মডেলের নিহতের সম্ভাব্য ওই হিসাব দিয়ে জানিয়েছে, প্রাণহানির সংখ্যা কয়েক হাজার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এই সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। অনেক মানুষ ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছেন। এলাকাটিতে এখনো শক্তিশালী পরাঘাত (আফটারশক) অনুভূত হচ্ছে।
রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে কারাকাসের ধসে পড়া ভবনগুলোর ধ্বংসস্তূপে তল্লাশি শুরু করেন উদ্ধারকর্মীরা। নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে ধ্বংসস্তূপের পাশে ভিড় করেছেন উদ্বিগ্ন স্বজনেরা। আহত অবস্থায় উদ্ধার হওয়া অনেককে স্ট্রেচারে করে নিয়ে যেতে দেখা গেছে। মারিয়া আলেজান্দ্রা নামের এক বাসিন্দা বলেন, ‘আমরা যখন নিচে নামছিলাম তখন সবকিছু ভৌতিক সিনেমার মতো মনে হচ্ছিল।’
মারিয়া আরও বলেন, ‘ধ্বংসস্তূপ মাড়িয়ে আমাদের নিচে নামতে হয়েছে। ভবনের তত্ত্বাবধায়ক শিশু কোলে এবং সব প্রতিবেশী নিচে নামছিলেন। তবে ওই ধসে পড়া ভবন থেকে আমি কেবল একটি পরিবারকেই বেরিয়ে আসতে দেখেছি।’
সরকারি প্রতিক্রিয়া ও নিখোঁজের তথ্য
বুধবার দিবাগত রাত ১টার দিকে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে রদ্রিগেজ বলেন, ‘কয়েক ডজন ভবন ধসে পড়েছে। আমরা বর্তমানে উদ্ধার তৎপরতা জোরদার করেছি। যত বেশি সম্ভব প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করছি আমরা।’ রদ্রিগেজ আরও বলেন, ‘লা গুয়াইরা রাজ্য এখন এক সত্যিকার ট্র্যাজেডির নাম এবং এটি একটি দুর্যোগপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত হয়েছে।’
ভূমিকম্পে নিখোঁজদের তথ্য সংগ্রহে একটি ওয়েবসাইট তৈরি করা হয়েছে। দেশের বাইরে থাকা বিরোধী দলীয় অনেক নেতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ এই সাইটটির লিঙ্ক শেয়ার করেছেন। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার ভোর ৫টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত সেখানে ১০ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ হওয়ার তথ্য নথিভুক্ত করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা ও আন্তর্জাতিক সহায়তা
সরকারি ছুটির দিনে ভূমিকম্প আঘাত হানায় ভেনেজুয়েলার অনেক মানুষ ওই সময় নিজেদের বাসাবাড়িতে অবস্থান করছিলেন। পূর্ব কারাকাসের বাসিন্দা ৫৬ বছর বয়সী কোরো মার্টিনেজ বলেন, ‘বিরাট একটি শব্দ হলো। বাড়ির ভেতরের জিনিসপত্র সব পড়ে যাচ্ছিল, এমনকি ফ্রিজের ভেতরের জগগুলোও আছড়ে পড়ল। আমি আগে কখনো এমন কিছুর মুখোমুখি হইনি।’
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই দুর্যোগ মোকাবিলায় ভেনেজুয়েলাকে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছেন। এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে তিনি লিখেছেন, এই দুর্যোগ মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র সব ধরনের সহায়তা দিতে প্রস্তুত এবং তারা সেই সামর্থ্য রাখে। ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা দুটি ভূমিকম্পই ব্যাপক মাত্রার উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেছেন, এতে বহু মানুষের প্রাণহানি হয়েছে।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট রদ্রিগেজ বলেছেন, তাঁর দেশ এখন উদ্ধার তৎপরতায় মনোনিবেশ করছে। আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বিদেশ থেকেও উদ্ধারকারী দল এসে পৌঁছাবে। এ সময় তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ অন্যান্য বিশ্বনেতাদের ধন্যবাদ জানান।
ভেনেজুয়েলায় জাতিসংঘের মানবাধিকার মিশন সরকারকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর থাকা সব বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তারা বলছে, এটি ‘জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন’। অবশ্য কিছু এলাকায় ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া শুরু হয়েছে।



