বিশ্বে এখনো ১১ কোটি ৭৮ লাখ বাস্তুচ্যুত, ২০২৫ সালে রেকর্ড প্রত্যাবর্তন
বিশ্বে এখনো ১১ কোটি ৭৮ লাখ বাস্তুচ্যুত, ২০২৫ সালে রেকর্ড প্রত্যাবর্তন

২০২৫ সালে রেকর্ড সংখ্যক বাস্তুচ্যুত মানুষের প্রত্যাবর্তন

বিশ্ব শরণার্থী দিবস ২০২৪ উপলক্ষে আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বিশ্বজুড়ে বাস্তুচ্যুত মানুষের প্রত্যাবর্তনের চিত্র। ২০২৫ সালে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ বাস্তুচ্যুত মানুষ নিজ দেশে ফিরে গেছেন, যা জাতিসংঘের রেকর্ড অনুযায়ী এক বছরে সর্বোচ্চ। তবে এই সংখ্যা মোট বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর মাত্র ১২ শতাংশ।

বিশ্বব্যাপী বাস্তুচ্যুতির চিত্র

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার (ইউএনএইচসিআর) এর সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে এখনো অন্তত ১১ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছেন। অর্থাৎ গড়ে প্রতি ৭০ জনে একজন বাস্তুচ্যুত। এই সংখ্যা প্রায় মিসর বা ফিলিপাইনের মোট জনসংখ্যার সমান।

বাস্তুচ্যুত এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছেন ৬ কোটি ৮৬ লাখ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তি (আইডিপি), ২ কোটি ৮৫ লাখ শরণার্থী (ইউএনএইচসিআরের ম্যান্ডেটের অধীনে), ৯০ লাখ আশ্রয়প্রার্থী, ৭২ লাখ আন্তর্জাতিক সুরক্ষার প্রয়োজনীয় ব্যক্তি এবং ৬০ লাখ ফিলিস্তিনি শরণার্থী (ইউএনআরডব্লিউএ’র ম্যান্ডেটের অধীনে)।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গত ১০ বছরে এই প্রথম জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা কমেছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাস্তুচ্যুতি সংকটগুলো থেকে বিপুল সংখ্যক শরণার্থী ও আইডিপি নিজ নিজ এলাকায় ফিরে যাওয়ার ফলে এই পরিবর্তন এসেছে।

শরণার্থী প্রত্যাবর্তনের প্রধান দেশসমূহ

২০২৫ সালে ৪৩ লাখ ৬০ হাজার শরণার্থী নিজ দেশে ফিরে গেছেন, যা ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় তিন গুণ। তবে এই প্রত্যাবর্তনকারীদের প্রায় ৯৮ শতাংশই মাত্র পাঁচটি দেশের নাগরিক। দেশগুলো হলো: আফগানিস্তান (১৯ লাখ ৫০ হাজার), সিরিয়া (১৩ লাখ ৪০ হাজার), সুদান (৬ লাখ ৫১ হাজার ৫০০), দক্ষিণ সুদান (১ লাখ ৯৯ হাজার ৩০০) এবং ইউক্রেন (১ লাখ ৩৯ হাজার ৩০০)।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আফগানিস্তান: আকস্মিক ও বড় মাপের প্রত্যাবর্তন

২০২৫ সালে প্রায় ২০ লাখ আফগান নিজ দেশে ফিরে গেছেন, যা সাম্প্রতিক ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ এবং আকস্মিক গণ-জনগোষ্ঠী চলাচলের ঘটনা। ইরান ও পাকিস্তান সরকারের কঠোর নীতির কারণে দশকের পর দশক ধরে এই দুটি দেশে বসবাস করা বহু আফগান নিজ দেশে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন।

৩০ বছর বয়সী মরিয়ম, যিনি ইরানে ছয় বছর বসবাসের পর তাঁর দুই ছেলেকে নিয়ে আফগানিস্তানে ফিরে গেছেন, তিনি বলেন, ‘এখন আমার কিছুই নেই—না কোনো চাকরি, না কোনো বাড়ি। কারও কাছে যে যাব, তেমন কেউও নেই।’ মরিয়ম কিডনি রোগে ভুগছেন এবং তাঁর ১৫ বছর বয়সী ছেলে সাদেককে স্কুলে পাঠাতে না পারার কষ্ট তাঁর কাছে যেকোনো অসুস্থতার চেয়ে বেশি যন্ত্রণাদায়ক।

জাতিসংঘ সতর্ক করে বলেছে, শরণার্থী প্রত্যাবর্তনের এই হার ও গতি আফগানিস্তানকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। ইউএনএইচসিআরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আফগানিস্তানে ফিরে আসা মানুষের মধ্যে ৮০ শতাংশ পরিবার দিনে অন্তত একবেলার খাবার বাদ দিতে বাধ্য হচ্ছেন এবং এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি পরিবার চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

সিরিয়া: আসাদের পতনের পর প্রত্যাবর্তনের ধারা

২০২৫ সালে প্রায় ১৩ লাখ সিরীয় বিদেশ থেকে নিজ দেশে ফিরে গেছেন, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি। এ ছাড়া আরও ২০ লাখ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত সিরীয় তাঁদের বাড়িতে ফিরে গেছেন। ফলে বৈশ্বিকভাবে সিরীয় শরণার্থীর সংখ্যা ৬০ লাখ থেকে কমে ৪৯ লাখে নেমে এসেছে।

সিরিয়ায় বিদ্রোহীদের অভিযানের ফলে ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর ক্ষমতাচ্যুত হন বাশার আল-আসাদ, যা সিরিয়ায় আসাদ বংশের ৫৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটায়। প্রায় ১৪ বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী সংকটের জন্ম দেয়। ২০২১ সালে প্রায় ৬৮ লাখ সিরীয় দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।

হিয়াম আল-জাজিরা, যিনি ১২ বছর তুরস্কে শরণার্থী থাকার পর সিরিয়ায় ফিরে এসেছেন, তিনি বলেন, ‘সে দেশে জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় আমাদের ফিরে আসতে বাধ্য করেছে। আমরা সেখানে ১২ বছর ছিলাম এবং শরণার্থী হিসেবে এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর ছিল।’

ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫ লাখ ৫৬ হাজার সিরীয় তুরস্ক থেকে, ৪ লাখ ৬৫ হাজার লেবানন থেকে এবং ২ লাখ ৫৬ হাজার জর্ডান থেকে ফিরে এসেছেন। প্রত্যাবর্তনকারীদের ১০ জনে মধ্যে ৭ জনের বেশি বলেছেন, সিরিয়ায় নিরাপত্তা এবং চলাচলের স্বাধীনতা উন্নত হয়েছে। বাকি সিরীয় শরণার্থীদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ ভবিষ্যতে দেশে ফিরে যেতে চান।

সুদান: গৃহযুদ্ধের মধ্যে প্রত্যাবর্তন

২০২৫ সালে প্রায় ৬ লাখ ৫১ হাজার শরণার্থী এবং ২৯ লাখ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তি সুদানে নিজ বাড়িঘরে ফিরে গেছেন। বিদেশ থেকে ফিরে আসা ব্যক্তিদের বেশির ভাগই প্রতিবেশী মিসর (৪ লাখ ৫ হাজার ৭০০ জন) এবং দক্ষিণ সুদান (২ লাখ ৮ হাজার ৭০০ জন) থেকে এসেছেন।

আনসাম রুস্তম, যিনি ২০২৩ সালের এপ্রিলে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পরিবারসহ খার্তুম ত্যাগ করেন, তিনি বলেন, ‘প্রতিদিনই যুদ্ধের স্মৃতি, নিজ বাড়িঘরের স্মৃতি, হারানো জিনিসপত্রের কথা আমাদের মনে পড়ত। মনের ভেতরে এই শোক বছরের পর বছর আমাদের সঙ্গে থেকেছে। তিন বছর পর যখন আমরা ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিই, সে সিদ্ধান্ত নেওয়াও সহজ ছিল না। বরং খুবই কঠিন পারিবারিক পরিস্থিতির কারণে এটা করতে হয়েছে।’ ফিরে আসার পর রুস্তম এবং তাঁর সন্তানেরা ধীরে ধীরে নতুন জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছেন।

অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি ও অন্যান্য দেশ

২০২৫ সালে ১ কোটি ৩ লাখেরও বেশি আইডিপি নিজ বাড়িতে ফিরে গেছেন। এর মধ্যে গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গোতে (ডিআরসি) ৩৬ লাখ, সুদানে ২৯ লাখ এবং সিরিয়ায় ২০ লাখ প্রত্যাবর্তনকারী ছিল, যা মোট প্রত্যাবর্তনকারীদের ৮০ শতাংশেরও বেশি।

ইউক্রেনে ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ ৩৭ লাখ আইডিপি ছিল। ওই বছর আরও প্রায় ৬ লাখ ৬৮ হাজার ইউক্রেনীয় নতুন করে দেশের অভ্যন্তরে বাস্তুচ্যুত হন এবং ৫ লাখ ৭৯ হাজার আইডিপি তাদের নিজ নিজ এলাকায় ফিরে গেছেন।

ইউএনএইচসিআর তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, অনেক শরণার্থী ও আইডিপির কাছে নিজ দেশে বা এলাকায় ফিরে গিয়ে জীবন পুনর্গঠনের ইচ্ছা সাধারণ এক অনুভূতি। তবে সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তনের পরিস্থিতি মোটেও অনুকূল নয়। অনেক মানুষ সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতার মধ্যেও ফিরে যাচ্ছেন, তাই ওইসব মানুষের জন্য নিজ দেশে ফিরে যাওয়া এখনো কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই যাচ্ছে।