বাগেরহাটের ঐতিহ্যবাহী খানজাহান আলী মাজারের দীঘি থেকে উদ্ধার করা কুমিরটি খুলনায় আনার পর ১৮ দিন ধরে সম্পূর্ণ খাবার বর্জন করেছে। গত ১ জুন মাজারের দীঘিতে ফাতেমা নামের এক শিশুকে টেনে নেওয়ার পর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। জেলা প্রশাসক ও মাজার কমিটির সভাপতির অনুরোধে ৩ জুন বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ কুমিরটিকে উদ্ধার করে খুলনায় নিয়ে আসে।
নতুন পরিবেশে খাবার বয়কট
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের খুলনার ডিএফও নির্মল কুমার পাল জানিয়েছেন, কুমিরটি নতুন পরিবেশে এসে পুরোপুরি খাবার বর্জন করেছে। তিনি বলেন, 'মানুষ এবং কুমির উভয়ের নিরাপত্তাই আমাদের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। কুমিরটি মাঝেমধ্যেই দীঘি থেকে লোকালয়ে চলে যেত, যাতে মানুষের ওপর আক্রমণের ঝুঁকি থাকে এবং ক্ষুব্ধ জনতা কুমিরটিকে পিটিয়ে মেরে ফেলার আশঙ্কাও থাকে।'
তিনি আরও জানান, মাজার কমিটি যদি আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে উভয়পক্ষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে জানায়, তবে কুমিরটি ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যথায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
কুমিরটির শারীরিক অবস্থা
ডিএফও নির্মল কুমার পাল জানান, মিঠা পানির এই কুমিরটি অত্যন্ত মোটা। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৭ থেকে ৮ ফুট এবং ওজন আনুমানিক ৫০০ থেকে ৬০০ কেজি। বয়স প্রায় ৫০ বছর। অতিরিক্ত চর্বির কারণে প্রজননক্ষম হলেও কিছু শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে।
বর্তমানে কুমিরটিকে খুলনার বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। সরীসৃপ প্রাণী হওয়ায় এটি পানি ও ডাঙা উভয়স্থানে চলাফেরা করলেও অতিরিক্ত মোটা হওয়ার কারণে মাটিতে বেশি হাঁটতে পারছে না। বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে কুমিরটি তার চেনা ও বৃহত্তর পরিবেশে ফেরার জন্য ছটফট করছে এবং প্রায়ই খাঁচার গেটে গিয়ে ধাক্কা দিচ্ছে।
অনাহারে ১৮ দিন
ডিএফও নির্মল কুমার আরও জানান, সরীসৃপ প্রাণী একবার খেলে দীর্ঘদিন না খেয়ে থাকতে পারে। বাগেরহাট থেকে খুলনায় আনার পর থেকে এখন পর্যন্ত কুমিরটি কিছুই মুখে তোলেনি। তাকে খাওয়ানোর জন্য মুরগি ও পানিতে হাঁস বেঁধে দেওয়া হলেও সে তা খাচ্ছে না। এমনকি খাঁচায় দেওয়া মুরগি শিকার করে মেরে ফেললেও তা সাবাড় করেনি কুমিরটি।
খাবার না খেলেও কুমিরটির সুরক্ষায় কোনো কমতি রাখছে না বন বিভাগ। অ্যানিমেল কিপার ও জুনিয়র ওয়াইল্ডলাইফ স্কাউটরা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এর সেবা-যত্ন করছেন। কুমিরটির থাকার পানি প্রতিদিন পরিবর্তন করা হচ্ছে এবং গরম লাগলে তার শরীরে ফ্রেশ পানি স্প্রে করা হচ্ছে।
মাজারের কুমিরের ইতিহাস
খানজাহান আলী মাজারের দীঘিতে একসময় ঐতিহ্যবাহী 'কালাপাহাড়' ও 'ধলাপাহাড়' নামে দুটি বিখ্যাত কুমির ছিল। সেগুলো মারা যাওয়ার পর ভারতের মাদ্রাজ (চেন্নাই) থেকে কয়েকটি মিঠা পানির কুমির এনে দীঘিতে ছাড়া হয়। তবে নিজেদের মধ্যে মারামারি করে বেশ কয়েকটি কুমির মারা যাওয়ার পর কেবল এই একটি কুমিরই বেঁচে ছিল, যা এখন খুলনায় বন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে।



