নিউ ম্যাড্রিডের ভয়াবহ ভূমিকম্প: ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী কম্পন
নিউ ম্যাড্রিডের ভয়াবহ ভূমিকম্প: ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী কম্পন

মিসিসিপি নদীপপুলার মেকানিকসভূমিকম্প কেন হয় তা কমবেশি সবারই জানা। মাটির নিচের টেকটোনিক প্লেটগুলো যখন একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খায়, তখন পৃথিবী কেঁপে ওঠে। কিন্তু আজ থেকে অনেক বছর আগে যখন বিজ্ঞানের ধারণাগুলো এত উন্নত ছিল না, তখন মানুষ ভাবত অন্য কথা। তারা মনে করত, মানুষ কোনো বড় পাপ করলে ঈশ্বর রেগে গিয়ে শাস্তি হিসেবে এই ভূমিকম্প দেন। ১৮১১ আর ১৮১২ সালের দিকে আমেরিকার নিউ ম্যাড্রিড নামের এক জায়গায় এক ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়েছিল। তখন মানুষের মনে এই কুসংস্কার আর ভয় আরও অনেক বেড়ে গিয়েছিল।

প্রথম বড় ধাক্কা

সে সময়ের মানুষের গল্প থেকে জানা যায়, ১৮১১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ভোরে, যখন আকাশ কেবল একটু একটু ফরসা হচ্ছে, ঠিক তখন হঠাৎ পুরো এলাকা এক তীব্র ঝাঁকুনিতে কেঁপে ওঠে। আর এটাই ছিল সেই ভয়ংকর ঐতিহাসিক ভূমিকম্পের প্রথম বড় ধাক্কা।

যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরির নিউ ম্যাড্রিড এলাকার পুরোনো লেখা থেকে সেই রাতের বর্ণনা পাওয়া যায়। সেখানে লেখা হয়, হঠাৎ করেই এক প্রচণ্ড ভূমিকম্পের ধাক্কা। সেই সঙ্গে শুরু হয় এক ভয়ংকর আওয়াজ। মনে হচ্ছিল অনেক দূর থেকে বজ্রপাতের গর্জন ভেসে আসছে, কিন্তু সেই শব্দ ছিল আরও বেশি কর্কশ আর কাঁপানো। সব মিলিয়ে সেখানে এক সত্যিকারের ভয়াবহ পরিবেশ তৈরি হয়। মিসিসিপি নদীর পানির স্রোতও কয়েক মিনিটের জন্য উল্টো দিকে বইতে শুরু করেছিল।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তীব্রতার পরিমাপ

১৮১১ ও ১৮১২ সালের এই নিউ ম্যাড্রিড ভূমিকম্পের সময় কিন্তু আজকের রিখটার স্কেল বা ভূমিকম্প মাপার আধুনিক কোনো প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হয়নি। কারণ, এই স্কেলগুলো তৈরি হয়েছে সেই ঘটনারও এক শতাব্দীর বেশি সময় পর। তবে ১৯৭৩ সালে বিখ্যাত ভূকম্পবিদ অটো নাটলি প্রাচীন সব তথ্য-উপাত্ত খতিয়ে দেখে একটি গাণিতিক হিসাব বের করেন। তার সেই হিসাব অনুযায়ী, ১৮১১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের প্রথম বড় ভূকম্পনটির তীব্রতা ছিল রিখটার স্কেলে প্রায় ৭.২।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরির নিউ ম্যাড্রিড এলাকার পুরোনো লেখা থেকে সেই রাতের বর্ণনা পাওয়া যায়প্রতীকী ছবিযদিও সেই সময়ে ওই এলাকায় ছোটখাটো মৃদু ভূমিকম্প প্রায় প্রতিদিনই হতো। ১৮১৪ সাল পর্যন্ত এই ধারা চলেছিল। কিন্তু এত বড় ও বিধ্বংসী ভূমিকম্প ছিল খুবই বিরল। আর এই কারণেই প্রথম ধাক্কাটি স্থানীয় বাসিন্দাদের মনে তীব্র আতঙ্ক ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছিল। ভয়ংকর এই দুর্যোগ কিন্তু সেখানেই থেমে থাকেনি। এর পর ১৮১২ সালের ২৩ জানুয়ারি এবং ৭ ফেব্রুয়ারি আরও দুটি বড় ভূমিকম্প আঘাত হানে। যার তীব্রতা ছিল ৭.১ ও ৭.৪।

বিজ্ঞানী অটো নাটলি পরবর্তী সময়ে ১৯৮৩ সালে আরও গবেষণা করেন। তিনি এই তিনটি প্রধান ভূমিকম্পের তীব্রতা যথাক্রমে ৮.৫, ৮.৪ এবং ৮.৮ পর্যন্ত হতে পারে বলে অনুমান করেছিলেন। বিজ্ঞানীর এই পরের হিসাবটি যদি সত্যি হয়ে থাকে, তবে ১৮১২ সালের ৭ ফেব্রুয়ারির সেই ভূমিকম্পটি হবে উত্তর আমেরিকা মহাদেশের ইতিহাসে এ পর্যন্ত রেকর্ড করা সবচেয়ে শক্তিশালী ও ভয়াবহ ভূমিকম্প।

ক্ষয়ক্ষতি ও প্রভাব

আজ থেকে দুই শতক আগে ওই অঞ্চল বেশ জনবিরল ছিল। ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল থেকে প্রায় ১৫০ মাইল উত্তরে অবস্থিত সবচেয়ে কাছের শহর সেন্ট লুইসের জনসংখ্যা তখন ছিল মাত্র ৫ হাজার ৭০০ জন। কিন্তু এলাকাটি ফাঁকা হওয়া সত্ত্বেও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল ব্যাপক। মিসিসিপি নদীর পূর্ব পারের প্রায় ১২৫ মাইল দীর্ঘ খাড়া পাহাড় ও গাছপালা ধসে সরাসরি নদীর বুকে আছড়ে পড়েছিল। আর নিউ ম্যাড্রিড নামের ছোট শহরটি তো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। ভূমিকম্পের তীব্র ঝাঁকুনিতে কাঠের তৈরি বাড়িঘরগুলো ভেঙে পড়ছিল। প্রাণ বাঁচাতে মানুষ ঘর ছেড়ে খোলা মাঠে তাঁবু খাটিয়ে বসবাস শুরু করেছিল।

ভূমিকম্পের ফলে নদীর মাঝে তৈরি হওয়া মাটির বাঁধটি ভেঙে বা পাশ কাটিয়ে নিজের স্বাভাবিক পথে ফিরে যেতে নদীটির কয়েক দিন সময় লেগেছিলপ্রতীকী ছবিশেষ ভূমিকম্পটির সময় মিসিসিপি নদীতে থাকা নৌকার মাঝিরা এক অদ্ভুত ও ভয়ংকর দৃশ্য দেখেছিলেন। নদীর পানি কিছু কিছু জায়গায় উল্টো দিকে বইতে শুরু করেছিল। বিজ্ঞানীরা একে বলেন ফ্লুভিয়াল সুনামি (Fluvial Tsunami)। আসলে মাটির নিচের টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়ার কারণে নদীর তলদেশের মাটি হঠাৎ খাড়া হয়ে ওপরে উঠে গিয়েছিল। এতে নদীতে একধরনের প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি হয় ও পানির স্বাভাবিক গতি থমকে গিয়ে সাময়িকভাবে উল্টো দিকে বইতে বাধ্য হয়।

ভূমিকম্পের ফলে নদীর মাঝে তৈরি হওয়া মাটির বাঁধটি ভেঙে বা পাশ কাটিয়ে নিজের স্বাভাবিক পথে ফিরে যেতে নদীটির কয়েক দিন সময় লেগেছিল। এখানেই শেষ নয়, এই ভয়ংকর ভূমিকম্পের ফলে নদীর দ্বীপগুলো পানির নিচে তলিয়ে যায়। অন্যদিকে মাটির ধসে তৈরি হওয়া নতুন নিচু জায়গাগুলোতে পানি ঢুকে গিয়ে একদম নতুন কিছু হ্রদের জন্ম দেয়। অর্থাৎ ভূমিকম্পের ফলে মিসিসিপি নদীর কিছু অংশের গতিপথ ও তীর বদলে যায়, তবে নদীর সামগ্রিক উত্তর-দক্ষিণমুখী প্রবাহ অপরিবর্তিত থাকে।

তবে সে যুগে ওই এলাকায় মানুষের বসবাস কম থাকায় এত বড় দুর্যোগেও মৃত্যুর সংখ্যা তুলনামূলক অনেক কম ছিল। সরকারি হিসাবে প্রায় হাজার মানুষের মৃত্যুর কথা বলা হলেও আসল সংখ্যাটি হয়তো আরও বেশি। কারণ, সে সময়ের সমাজব্যবস্থার বৈষম্যের কারণে স্থানীয় আদিবাসী আমেরিকান ও দাসদের মৃত্যুর সঠিক কোনো হিসাব সরকারি নথিপত্রে রাখা হয়নি।