মরুভূমির মাঝখানে গড়ে ওঠা মিশরের নতুন প্রশাসনিক রাজধানীর সঙ্গে কায়রোকে যুক্ত করতে চালু হয়েছে আফ্রিকার প্রথম চালকবিহীন মনোরেল নেটওয়ার্ক। যানজটের জন্য কুখ্যাত কায়রোর পরিবহণ ব্যবস্থায় এই প্রকল্প নতুন যুগের সূচনা করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ইস্ট নাইল রুট চালু
গত মে মাসে প্রথমবারের মতো যাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয় কায়রো মনোরেলের ‘ইস্ট নাইল’ রুট। এটি ৫৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং কায়রোর নাসর সিটির আন্তর্জাতিক স্টেডিয়াম এলাকা থেকে নতুন প্রশাসনিক রাজধানী পর্যন্ত বিস্তৃত। এই রুটটি সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক মনোরেল নেটওয়ার্কের প্রথম ধাপ।
প্রকল্পটি পুরোপুরি সম্পন্ন হলে এটি বিশ্বের দীর্ঘতম চালকবিহীন মনোরেল নেটওয়ার্কে পরিণত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বর্তমানে চীনের চংকিং মনোরেল নেটওয়ার্ক বিশ্বের দীর্ঘতম মনোরেল হিসেবে পরিচিত।
ওয়েস্ট নাইল রুটের কাজ চলমান
এছাড়া ৪৩ দশমিক ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘ওয়েস্ট নাইল’ রুটের নির্মাণকাজ চলছে। এটি গ্রেটার কায়রো অঞ্চলের স্যাটেলাইট শহর সিক্সথ অব অক্টোবর সিটি থেকে গিজা পর্যন্ত সংযোগ স্থাপন করবে। দুই রুট মিলিয়ে নেটওয়ার্কটির মোট দৈর্ঘ্য হবে ১০০ দশমিক ৩ কিলোমিটার।
প্রতিদিন প্রায় পাঁচ লাখ যাত্রী এই মনোরেল ব্যবহার করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। নেটওয়ার্কটি মোট ৬৮টি ট্রেন নিয়ে গঠিত এবং ঘণ্টায় প্রতি দিকে প্রায় ৪৫ হাজার যাত্রী পরিবহণ করতে পারবে। ট্রেনগুলো ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৮০ কিলোমিটার গতিতে চলবে এবং কংক্রিটের উঁচু বিমের ওপর দিয়ে কায়রোর ব্যস্ত সড়কের ওপর দিয়ে চলাচল করবে।
ভাড়া নির্ধারণ ও বিনামূল্যে যাত্রা
৬ মে থেকে জনসাধারণের জন্য চালু হওয়া মনোরেলে প্রথম তিন দিন বিনামূল্যে যাতায়াতের সুযোগ দেওয়া হয়। পরে চারটি ভাড়ার অঞ্চলের ভিত্তিতে টিকিটের মূল্য নির্ধারণ করা হয়। পুরো ইস্ট নাইল রুটে একমুখী যাত্রার জন্য ভাড়া রাখা হয়েছে ৮০ মিসরীয় পাউন্ড। এছাড়া ১৮০টি ভ্রমণের জন্য ত্রৈমাসিক পাসের মূল্য অঞ্চলভেদে ১ হাজার ৮০০ থেকে ৭ হাজার ২০০ মিসরীয় পাউন্ড পর্যন্ত।
যানজট সমস্যার সমাধান
কায়রোর ভঙ্গুর সড়ক অবকাঠামো ও তীব্র যানজট দীর্ঘদিন ধরে নগরবাসীর জন্য বড় সমস্যা হয়ে রয়েছে। শহরের বিদ্যমান তিনটি মেট্রো লাইন বছরে প্রায় ৫০ কোটি যাত্রী বহন করে, যা ব্যবস্থাটির ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছে। এই পরিস্থিতিতে ২০১৯ সালে প্রায় ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের চুক্তির মাধ্যমে নতুন মনোরেল নেটওয়ার্ক নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় ফরাসি রেল পরিবহণ প্রতিষ্ঠান আলস্টমকে।
নির্মাণ ও অর্থায়ন
কায়রোভিত্তিক ওরাসকম কনস্ট্রাকশন এবং আরব কন্ট্রাক্টরসের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে আলস্টম। প্রতিষ্ঠানটি ইংল্যান্ডের ডার্বি কারখানায় ২৭২টি মনোরেল কোচ তৈরি করেছে। প্রকল্পের অর্থায়নের একটি অংশ দিয়েছে যুক্তরাজ্যের রপ্তানি ঋণ সংস্থা ইউকে এক্সপোর্ট ফাইন্যান্স।
আলস্টম জানিয়েছে, এই মনোরেল কম শব্দদূষণ সৃষ্টি করে এবং ব্রেকিংয়ের সময় উৎপন্ন শক্তির ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম। ফলে জ্বালানি খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে।
প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন
নেটওয়ার্কটি পরিচালনায় ব্যবহার করা হয়েছে আলস্টমের ‘ইনোভিয়া’ প্রযুক্তি, যা ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর এবং লস অ্যাঞ্জেলেসের অনুরূপ প্রকল্পেও ব্যবহৃত হয়েছে। উন্নত রেডিও যোগাযোগভিত্তিক সিগন্যালিং ব্যবস্থার মাধ্যমে ট্রেনের অবস্থান নির্ধারণ করা হয়। ফলে ট্রেন চালানো, থামানো, দরজা নিয়ন্ত্রণ এমনকি জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার কাজও মানবচালক ছাড়াই সম্পন্ন করা সম্ভব।
তবে ইস্ট নাইল রুটের ২২টি স্টেশনের মধ্যে এখনো ছয়টি চালু হয়নি। এছাড়া প্রকল্পটি ২০২৩ সালে উদ্বোধনের কথা থাকলেও বিভিন্ন কারণে বিলম্বের মুখে পড়ে।
বিতর্ক ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
মিসরে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাপক অবকাঠামো বিনিয়োগ নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশটি প্রায় ১ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন মিসরীয় পাউন্ড অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় করেছে। একই সময়ে দেশটির বৈদেশিক ঋণ ১৬৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছে।
সমালোচকদের কেউ কেউ মনে করেন, নতুন প্রশাসনিক রাজধানী এখনো পুরোপুরি গড়ে না ওঠায় মনোরেলটি কায়রোর অধিকাংশ শ্রমজীবী মানুষের যাতায়াত সময় কমাতে তেমন বড় ভূমিকা রাখতে পারবে না। তবে সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন রাজধানীতে ভবিষ্যতে ৬৫ লাখ মানুষ বসবাস করবে এবং প্রায় ২০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
আলস্টমের বক্তব্য
আলস্টমের মিশর শাখার ব্যবস্থাপনা পরিচালক রামি সালাহ এলদিন বলেন, ‘ইস্ট নাইল মনোরেল মিশরের ভিশন ২০৩০-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এটি স্মার্ট, টেকসই এবং ভবিষ্যতমুখী নগর পরিবহণ ব্যবস্থার দিকে দেশের অগ্রযাত্রার প্রতীক।’ তিনি জানান, প্রকল্পে কর্মরত জনবলের ৯৮ শতাংশই মিসরীয়।
আলস্টমের মতে, কায়রো মনোরেল দ্রুত নগরায়ণের মুখে থাকা আফ্রিকার অন্যান্য শহরের জন্যও একটি উদাহরণ হতে পারে। মরক্কো, আইভরি কোস্ট, আলজেরিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকাতেও প্রতিষ্ঠানটি একই ধরনের পরিবহণ প্রকল্পে কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য, আফ্রিকাজুড়ে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব গণপরিবহনের চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে এবং ভবিষ্যতে এই প্রবণতা আরও জোরালো হবে।



